প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০
খালিদের ঈদ আনন্দ

-অনেক কষ্ট হচ্ছে! আম্মু, রোজা ভেঙ্গে ফেলি। রোজা রাখতে পারবো না!
-বাবা! একটু ধৈর্য ধরো, কিছুক্ষণ পরই ইফতারের সময় হবে।
-কিছু সময় বলে বলে তো বেলা ফুরিয়ে দিচ্ছেন। আর কত সময়ের কথা বলবেন!
-এখন সত্য বলছি, বিশ্বাস রাখো তোমার আম্মুর প্রতি।
কথা মতোই আজান হলো। খালিদ ঠাণ্ডা শরবত পান করে প্রশান্তির সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। সেদিনের ইফতার যেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্দেগীর প্রাণ। প্রতিদিন তারাবির সময় হলে তার আব্বুর সাথে মসজিদে চলে যায়। শুধুই কি তারাবিহ? ফজরের ওয়াক্ত ও আব্বুর হাত ধরে পায়ে হেঁটে হেঁটে সালাত আদায় করতে আল্লাহর ঘরের দিকে রওনা হয়। কিন্তু রোজার দিকে সে খুবই কাঁচা। শেষ রাতে উঠে সাহরি খায় রোজার নিয়ত করে কিন্তু পরে রোজা ভেঙ্গে ফেলে। খালিদের আব্বু আম্মু তাকে অনেক সাপোর্ট করে। সে চেষ্টা চালিয়ে নেয়।
দুই দিন পর এক শুভদিন। আনন্দের দিন। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন। প্রত্যেক মুসলমান এ দিনের তরে কিছু না কিছু ব্যস্ত সময় পার করে। ছোট্ট খালিদও ব্যস্ত সামনের ঈদ নিয়ে। নতুন জামা কিনবে নামাজ পড়বে তার সমবয়সী ছেলেদের সাথে ঘোরাঘুরি করবে আরো কত কিছু যে-করবে তা নিয়ে ভাবনার দুনিয়ায় ব্যস্ত।
-খালিদ বাবা! কোন জামা পরে ঈদের সালাত আদায় করতে চাও?
-জুব্বা, পায়জামা, টুপি, রুমাল এগুলো!
-এসব কেন? তোমার বন্ধুরা সবাই দামি ভালো ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, জুতা পরবে আর তুমি অল্প টাকার পাঞ্জাবি, পায়জামা, টুপি পরবে সেটা তোমার কাছে লজ্জাজনক হবে না?
-আব্বু! লজ্জা লাগবে তাদের ভালো লাগবে আমার। আল্লাহ তায়ালা ঐ বন্ধুদের উপর হেদায়েতের আলো জ্বালিয়ে দেননি এটা এদের লজ্জা আমাকে প্রভু দ্বীনের সঠিক পথে চলার তাওফিক দিয়েছেন তা আমার শ্রেষ্ঠ ভাগ্য।
খালিদের আব্বু-আম্মু কথার দ্বারা পরীক্ষা করেছিলো কিন্তু তার উত্তর শুনে অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলো। ছোট ছেলের মুখে কিভাবে আল্লাহ ওয়ালাদের মতো দামি দামি কথা আসে? তারা খুবই আনন্দিত হয়।
নতুন জামা, নতুন জুতা কিনে সে অনেক খুশি। আগামীকাল ঈদুল ফিতর। সব বন্ধুদের সাথে নতুন জামা পরে দেখা করবে। ভাবতে ভাবতে মুখে চাঁদের হাসি উঠলো।
ফজরের নামাজে তাড়াতাড়ি ছুটছে মসজিদের প্রাঙ্গণে। একটু দেরি হয়েছে তাই। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব ঈদের দিনের সুন্নাত নিয়ে কিছু বয়ান করলেন। সবশেষে বাড়ি ফিরছে তার আব্বুর হাত ধরে। পথে একটা ছেলেকে দেখতে পাওয়া যায়। খালিদের সমবয়সী এক ছোট্ট ছেলে। শরীরে শুধু একটা হাফ প্যান্ট পরা আর সম্পূর্ণ খালি। ওর আব্বুর নজর পড়ে নাই কিন্তু খালিদের নজর পড়েছে। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
কতই না কষ্টের ভিতরে দিন অতিবাহিত করছে! কিভাবে জীবন-যাপন করে? কিভাবে সময় পার করে? ঈদের আনন্দ তারা কি বুঝতে পারে? এটাই কি তাদের ঈদুল ফিতর উদযাপন?
বাসায় গিয়েও এসব কথা ভাবতে থাকে। এখন আর না ভেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। আলমারি থেকে নতুন জামা নিয়ে একা একা বাসা থেকে বের হয়। সেই পথশিশুর কাছে যায়। নতুন জামাটি তার হাতে তুলে দেয়। পকেটে কিছু টাকা ছিল তা সবই দিয়ে দেয়। পথশিশুর মুখে আনন্দের হাসি ফুটছিলো খালিদও মুচকি হেসে ছেলেটাকে বিদায় দিলো এবং নিজের জন্য দোয়া চাইলো।
বাসায় পৌঁছানোর পর খালিদের আব্বু-আম্মু জেনে যায়। সে বলতে চায়নি তবে কোনো এক কারণে তারা জেনে যায়।
-খালিদ! জামাটা অন্য কাউকে দান করেছে। এখন কী পরে ঈদের সালাত আদায় করবে?
-কেন আম্মু? আর কোনো জামা নেই আমার?
-আছে কিন্তু ঈদ তো নতুন জামা দিয়ে পালন করে।
-আম্মু! নতুন জামা নিয়ে ঈদ হয় না! ঈদ হয় আল্লাহ তায়ালার কাছে নতুন করে প্রিয় হবার। আল্লাহর কাছে পুরস্কার পাবার। ঈদ শুধু আমারই না এসব পথশিশুদেরও ঈদ। তাদেরও খুশি। তাদের গরিব চেহারায় হাসি থাকলে আল্লাহ তায়ালাও আমার প্রতি হাসি দিবেন। আমার পুরাতন জামা দিয়েই আজকে আমি খুশি থাকবো।
খালিদের কথা শুনে তার আব্বু-আম্মুর চোখে পানি চলে এলো। ছোট্ট বাচ্চার মুখে এমন কথা কিভাবে আসতে পারে? আমি ভাগ্যপতি আল্লাহ তায়ালা আমাকে এক নেক সন্তান দান করেছেন।
ঈদ পুরাতন জামা দিয়েই কেটে গেলো। খালিদ আনন্দের সাথেই দিন উদযাপন করেছে।
যেসব বন্ধুরা খালিদকে নিয়ে ট্রল করতো তার সুন্নতি পোশাক নিয়ে হাসি-তামাশা করতো এখন ঐ বন্ধুরা খালিদকে নিয়ে গর্ব করে। তারাও খালিদের মতো টুপি পাঞ্জাবি পরিধান করা শুরু করেছে। সে বর্তমানে এলাকার বাচ্চা ছেলেদের আইডল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।