প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০০
শোকে-সংগ্রামে বাঙালির আগস্ট
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
আগস্ট বাঙালির জাতির পিতাকে সিঁড়ির শয্যায় শয়ান দিলেও বিশ্বনেতাদের বুকের ভেতরে মুজিব চির জাগরুক। মুজিবের জানাজায় হয়তো সামরিক জান্তার কারণে লোকসমাগম হতে পারেনি, কিন্তু বিশ্ব নেতাদের কাছে মুজিব এক অনন্য জাদুকরি নেতা। মুজিবের সাহসের সপ্রংশ ভক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির ভাষ্যে মুজিব বিশ্বের সর্বকালের সাহসী নেতাদের একজন। তিনি বলেন, ‘আই স্যালুট দ্য ব্রেইভ লিডার অব অল টাইমস্’। বঙ্গবন্ধুর এই সাহস ও বিচক্ষণতার কারণেই ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মনে করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের চেয়েও সফল নেতা ছিলেন। সকল নেতার মধ্যে সম্মোহনী শক্তি নেই। যার এই শক্তি আছে তিনিই হয়ে ওঠেন জাদুকরি নেতা। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বঙ্গবন্ধুকে এরকম এক সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন দূরদর্শী নেতা হিসেবেই দেখেন। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম যিনি স্বপ্নকে না ঘুমানোর উদ্দীপকরূপে বর্ণনা করেছেন, তাঁর কাছে বঙ্গবন্ধু এক ঐশ্বরিক আগুন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বরে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন শেষে মন্তব্য বইয়ে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবজাতির জন্যে ছিলেন অনুপ্রেরণার বাতিঘর। ভুটানের তরুণ প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন শেষে রাজনীতিতে নেমে বিজয়ী হয়েছেন, তাঁর কথায় বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালির বন্ধু নন, তিনি ভুটানেরও বন্ধু। দু হাজার সতের সালের ঊনিশ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন করে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নেতা হিসেবে স্বীকার করে বলেন, এ কারণেই মৃত্যুর চল্লিশ বছরের বেশি সময় পরও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা হয়।
|আরো খবর
জার্মানির সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান উলফ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, বঙ্গবন্ধু অতিদ্রুত স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। শ্রীলঙ্কান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।’ ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও স্ম্রাজ্যবাদবিরোধী শীর্ষস্থানীয় সংগ্রামী ফেনার ব্রুকওয়ে বলেছেন, ‘সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুম্বা, কাস্ত্রো ও আয়েন্দের সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চরিত হবে। তাঁকে হত্যা করা ছিলো মানবহত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ।’ ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত বঙ্গবন্ধুকে আপসহীন সংগ্রামী নেতা এবং কুসুমকোমল হৃদয়বান বলে শ্রদ্ধা জানান। নোবেল বিজয়ী উইলিব্রান্টের মতে, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’ ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। তাই তিনি অমর।’ বাঙালি জাতির পিতার প্রয়াণের খবর শুনে ইংলিশ এমপি জেমস লামন্ড বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশই শুধু এতিম হয়নি বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে। পশ্চিম জার্মানির প্রিন্ট মিডিয়া শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সাথে তুলনা করে লিখেছিলো, জনগণ তার কাছে এতো প্রিয় ছিলো যে, লুইয়ের মতো তিনি এ দাবি করতে পারেন, আমিই রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বন্ধ কিউবার বিপ্লবী নায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করে বলেন, আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। মার্কিনী পত্রিকা নিউজ উইক একাত্তরের এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে পোয়েট অব পলিটিক্স বলে উল্লেখ করেছে। ইউনেস্কো তথা জাতিসংঘ বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু বলে মুজিব জন্মশতবর্ষে স্বীকার করে নিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু বাঙালির কাছে মুজিব ভাই, মিয়া ভাই, বঙ্গবন্ধুই শুধু নন, তিনি আসলে বাংলাদেশের মানচিত্র। তাঁর বুক মানেই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। বঙ্গবন্ধু বিশ্বে এক ও অদ্বিতীয়।