প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(দ্বাদশ পর্ব) তুষার ধবল মস্কো ছাড়া পেরেস্ত্রোইকার পরবর্তী খণ্ডিত সোভিয়েত ইউনিয়নের এতদিন পরে আর কোন ছবি আমার চোখে বা স্মৃতিতে ভাসে না। তবে তুষার কাতর মস্কোর একটা শীর্ণ চপল নদীকে মনে আছে। এ নদীর স্থানীয় নাম হলো মস্কোভা। নদীটা দৈর্ঘ্যে পাঁচশ’ কিলোমিটারের বেশি এবং প্রস্থে দেড়শো মিটার ছাড়ানো। তিন থেকে পাঁচ মিটার গভীরতা নিয়ে নদীটি চপল চরণ বেণীবাঁধা কিশোরীর মতো ছুটে চলে মস্কোর ভেতর দিয়ে। কিন্তু শহরের ভেতর দিয়ে তার যেটুকু ছুটে গেছে তাতে তাকে আমার গ্রামের নাপিতখালী খালের মতোই শীর্ণা মনে হয়েছে। রাশানরা প্রকৃতিপ্রেমী বলেই হয়তো কোন স্থানে নদীটির টুঁটি চেপে ধরেনি, তার দেহে ভূমিদস্যুদের এতোটুকু আঁচড় লাগেনি। বরং তার পাড় বাঁধিয়ে দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে পর্যটকদের এবং নগরবাসীদের। শহরের বুক চিরে ছুটে চলা মস্কোভা নদীতে ছোট ছোট নৌযান যেন নদীর সাথে কথা বলতে বলতে আলাপনে মত্ত হয়ে ছুটে চলে। কিন্তু এই হৃদয় হরণ চপল চরণ তরল হরিণীকে ডিসেম্বরে কেউ নদী বলে ধারণা করার জো নেই, যদি না সে আগে থেকে নদীর সাথে পরিচিত না থাকে। নদীর বুকে ছুটে চলা জলধারা ডিসেম্বরের নির্মম শীতে জমে পাথর হয়ে যায়। তাকে দেখে তখন আমাদের বড় শহরের বড় নালার মতো মনে হয়। জমাট বরফের বুকটাকে মনে হয় আইস স্কেটিংয়ের সরু মঞ্চ। মস্কোভা নদী বিদেশ-বিভূঁইয়ে আমাকে মনে করিয়ে দিলো আমার গ্রামের সলাজ কর্ণফুলি আর নগরের রোজগেরে নদীটাকে। তাকে দেখে আমার সত্যি সত্যিই মধুকবির আবেগের যৌক্তিকতা অনুভূত হলো। মনে হলো, এই অথর্ব অচল বরফের নদীও বুঝি আমার সেই শৈশবসখা, আমার সেই কৈশোরের প্রেম, প্রণয়ী নদীটির জলপত্র এনেছে বয়ে। কিন্তু তুষার ধবল, শীতের শাপে জমে যাওয়া নদী তবুও তার আন্তরিকতার উষ্ণতায় আমাকে সম্ভাষণ করেছে স্বজনের সৌহার্দ্য নিয়ে।
মায়ের আঁচলে যার মমতা বাঁধা, বাবার শাসনে যার স্নেহসুধা মাখা, মস্কোর ধবলী তুষার কি আর তাকে বেঁধে রাখতে পারে রূপকথার জাদুমন্ত্র ঝেড়ে! তাই বাতাস আমার জন্যে নিয়ে এলো প্রত্যাবর্তনের বাণী। কিন্তু সে প্রত্যাবর্তন সোজা মস্কোভা থেকে কর্ণফুলির তীরে নয়, তাকে দম নিতে হলো বালিভরা মরুতটে। আরব্য শেখের বেলাভূমি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানপোতে আমাকে নামতে হলো প্রত্যাবর্তনের মাঝপথে। সেখানে বড়দা ষোলো বছর ধরে আছেন পরিবার নিয়ে জীবন ও জীবিকার নিত্য সমাগমে। তার পাঠানো পৃষ্ঠপোষকতার ঘোষণায় আমার পরবর্তী গন্তব্য হলো খলিফা শেখ জায়েদণ্ডএর হাতে গড়া আবুধাবী নগরীতে। বিমান হতে নেমে বড়দার ড্রাইভিং দক্ষতায় আমি অবাক হয়ে দেখি পথের দুধারের সৌন্দর্য আর খাঁ খাঁ সীমান্তের নিঃসঙ্গতা। রাশিয়ায় গিয়ে পড়েছিলাম ভাষা সংকটে। অর্থাৎ তারা ইংরেজি জেনে-বুঝেও আমার সাথে রাশান ভাষাতেই কথা বলে যাচ্ছিলো। পরে বুঝলাম, এটা তাদের কৌশল, নিজেদের ভাষাকে শেখার অপরিহার্যতা বুঝাতে তারা রুশ ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতো না। নিজেদের ভাষা বিদেশিদের শিখিয়ে তারা একদিকে যেমন রুশ ভাষাভাষী লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতো তেমনি ভাষা শিখিয়ে কিছু বৈদেশিক মুদ্রাও নিজেদের কোষাগারে জমা করতো।
কিন্তু তেল ও বালির দেশ আবুধাবীতে এসে বিমানবন্দরে পড়লাম নিজের পরিচয় সংকটে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমার পাসপোর্ট দেখার পরও আমাকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপ কি পাস কোই ডলার হ্যায়?’ তার হিন্দি কথা শোনার পর আমার মেজাজ গেলো সপ্তমে চড়ে। আয়নার ওপার থেকে আমার বড়দা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে হাত দেখালেন। আমি কিছু বলার আগেই জোব্বাধারী আরব আমাকে ইশারা করলো চলে যেতে। আমার জ্বালা জুড়ানোর আগেই ইমিগ্রেশন পার হয়ে আসতে হলো বিধায় মনের মধ্যে একটা খচ্ খচ্ রয়ে গেলো। ব্যাটারে কড়া একটা জবাব দেওয়া হলো না। মনে মনে ঠিক করেছিলাম, তাকে বলবো, বাংলায় জিজ্ঞেস করেন। তাহলে তার চক্ষু চড়ক গাছ হতো। ইমিগ্রেশন পার হয়ে বড়বৌদি আর মেয়েদের ফুলের শুভেচ্ছায় স্বাগত হয়ে মনে প্রশান্তি ফিরে এলো। নিজের ঘরে চলে এলাম। পথে আসতে আসতে আরেকটা সুখ আমাকে আনন্দিত করলো। তা হলো পথের দুধারে বিপণী বিতানগুলোর বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের ভাষা। ইংরেজি-আরবীর পাশাপাশি কিছু কিছু দোকানে আরও দুটো ভাষায় সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম। একটা হলো বাংলা আর একটা হলো রুশ ভাষা। আমি এখন গড়গড় করে রুশ ভাষা পড়তে পারছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি এখানে আছি হাজার বছর ধরে। জীবনানন্দ তখন মাথায় জেগে উঠেছে। আর বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড দেখে আমি অবাক হলাম। বড়দা বললেন, এই এলাকায় চাটগেঁয়ে প্রবাসী বেশি। তাই এখানকার সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার আছে। এখানকার রাস্তার নাম আরবীয়রা নিজেদের ভাষায় বললেও বাঙালিরা নিজেরা নিজেদের দেওয়া নামে ডাকে। যেমন : ইলেক্ট্রা রোডকে বাঙালিরা নাম দিয়েছে খাজুরতলা। একজন আরেকজনকে বলে, চলো খাজুরতলা যাই। বলে না, চলো ইলেক্ট্রা রোড যাই। আবার এখানে একটা বড় বিল্ডিং আছে, যাকে চাটগেঁয়েরা নাম দিয়েছে আধা দুনিয়া। এই আধা দুনিয়ায় বাঙালিরাই সংখ্যায় অধিক। নতুন কোনো বাঙালি দেশ থেকে আবুধাবী এলে এবং তাকে কেউ বিমান বন্দরে নিতে না এলে পাকিস্তানি ট্যাক্সি ড্রাইভাররা তাকে এনে আধা দুনিয়াতে রেখে যায়। জানে, এখানে ফেলে রেখে গেলে একটা হিল্লে তার হবেই। আমার কাছে মনে হলো, এখানকার ইলেক্ট্রা রোড বুঝি আমাদের নিউমার্কেট এলাকা। আমার বড়দার বাসা ফিলিপ্স-এর বিল্ডিংয়ের উল্টো দিকে। এখানে আবার বাসার জন্যে তিন বছরের ভাড়া অগ্রিম প্রদান করতে হয়। আবুধাবীতে ঐ সময় আমার বড়দা ছাড়াও আমার ছোট মামা, আমার বাবার মাসতুতো ভাই এবং আমার সেজ বোনের হাজবেন্ডও ছিলেন। আরও থাকতো আমার বড়বৌদির ছোট ভাই প্রদ্যুৎ, আমার গ্রামের সংলগ্ন বাড়ির কাকাসহ আরও চেনাজানা অনেকেই। আমি মাসখানেক আবুধাবী ছিলাম। থেকে বুঝলাম, এখানের জীবন হচ্ছে টাকা কামাও, রাতে শপিং মলে যাও এবং বড় হোটেলে খাবার খাও। আমার বড়দার একটা স্বভাব ছিলো, অনেকটাই আমার বাবার স্বভাবের মতো। বাইরে বের হলে মানুষের সাথে পরিচয়-প্রসঙ্গ করা। তাদের দুজনের সাথে কোথাও যেতে বের হলে সময়মত পৌঁছা যেতো না। কেননা, পথে চলতে চলতে তাঁরা যেমন অনেকের কুশলাদি জানতে চাইতেন, তেমনি তাদেরকেও আটকে একটু ভাবের বিনিময় করতেন অনেকেই। ফলে অনিবার্যভাবে যারা সাথে থাকে তারা অধৈর্য হয়ে যেতে হয়। আমার বড়দা নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন। তিনি আবুধাবী বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তারা ছাব্বিশে মার্চের অনুষ্ঠান করবেন এবং এ উপলক্ষে আমার কাছে প্রকাশিতব্য স্মরণিকার নাম চাইলেন। আমি বললাম, আপনাদের স্মরণিকাকে নাম দেন, ‘দ্রোহ’। নামটা তাদের সবারই পছন্দ হলো।
বড়দার কাছে যাওয়ার পর তিনি আমার পোশাক-পরিচ্ছদ আমূল পাল্টে দিলেন। দোকানে নিয়ে গিয়ে ওই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে জুতো কিনে দিলেন। কিন্তু আমার পলওয়েল মার্কেট থেকে কেনা বরফ মাড়ানোর জুতো জোড়ার জন্যে খুবই মন খারাপ হলো। আবধাবীতে এখন একদিন এক একজনের বাসায় নেমনতন্ন। এতো এতো পদের সুস্বাদু খাবার খেতে খেতে আমার অবস্থা হয়ে গেলো গড়ানো পিপার মতো। প্রত্যেক বাসায় খাওয়ানোর পর একটা শার্ট উপহার দিয়েছে। প্রায় কুড়িটা শার্ট উপহার পেয়েছি। তারা আবার সপ্তাহের একদিন কিটি পার্টি করতো। আমি এরকম চারটি কিটি পার্টি পেয়েছি। এক একজন গৃহিণী এক একটা পদ রেঁধে নিয়ে যেতেন যার যার বাসা হতে। কোনো একটা পার্কে ডাইনিং ক্লোদ বিছিয়ে সবাই বসে যেতো। বাচ্চারা সবাই দৌড়-ঝাঁপ দিতো আর পুরুষেরা কার্ড খেলে, আড্ডা মেরে সময় পার করতো। নারীরা নিজেদের মধ্যে মেয়েলি গল্পে বিভোর থাকতো। একবার দুবাই জুমেইরা বিচে গেলাম। বড়বৌদি-বড়দাসহ। ঢোকার পথে সাইনবোর্ডে দেখতে পেলাম রুশ ভাষায় বিজ্ঞপ্তি লেখা। অনুসন্ধানে বুঝলাম, এখানে গরমের ছুটিতে রুশ নারীরা এসে আরবী শেখদের মনোরঞ্জন করিয়ে ডলার কামাই করে নিয়ে যায়। তাদের জন্যেই এই রুশ ভাষায় বিজ্ঞাপনী-বিলবোর্ড ও নোটিশবোর্ড। বুঝলাম, একাধিক বিদেশি ভাষা লিখতে ও পড়তে পারার কী সুবিধা। জুমেইরা বিচে ঢুকে আমিতো চোখ আর তুলতে পারি না। দুই অগ্রজ আমাকে সাথে নিয়ে গেছেন। বিচে সবাই সানবাথে ব্যস্ত। বিদেশিনী নারীরা, কী এশীয় কী ইউরোপীয়, তারা অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গে সূর্যে রোদকেলি করছে। আমি সমুদ্র দেখবো নাকি উটের পিঠে চড়ে সমুদ্রতটে বেড়াবো নাকি আড়চোখে ঐসব বয়সমুগ্ধ দৃশ্যাবলি দেখবো? জুমেইরা বিচ আগে ‘শিকাগো বিচ’ নামেও পরিচিত ছিলো। এটা ঊনিশশো ষাটের দশকের দিকে হবে হয়তো। তখন পশ্চিমা পর্যটকরা এসে এদিকেই থাকতো বেশির ভাগ। জুমেইরা বিচ হলো মূলত সাদা বালির বেলাভূমি। পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী এই বিচ। এটি দুবাইয়ের জুমেইরা নামের জেলায় অবস্থিত। জেলার নামে বিচের নামকরণ করা হয়েছে। জেলাটি আধুনিকায়নের আগে এখানে খেজুর পাতায় নির্মিত পঁয়তাল্লিশটি কুঁড়েঘর ছিলো। এগুলোকে আরিশ নামে ডাকা হতো। এই এলাকাতেই পারস্য উপসাগরের বুকে জেগে আছে জুমেইরা পাম আইল্যান্ড। সমুদ্রতটে উট নিয়ে ঘুরছে আরব্য মালিকেরা। উদ্দেশ্য হলো পর্যটকদের ডলার কিংবা দিরহামের মূল্যে পিঠে চড়ানো। বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে একসময় পেটে ছুঁচো দৌড়ুতে লাগলো। সমুদ্রবর্তী একটা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে সবুজ ঘাসের মায়াবী দেহবল্লরীতে জেগে ওঠা এক টুকরো লনে বসে ছবি তুললাম। আমার পরণে ছিলো আড়ংয়ের একটা হাফ হাতা শার্ট, যাতে পিঠে উড়ে যাচ্ছে একটা ঘুড়ি আর তার লেজ আমার বুকে লুটোপুটি খাচ্ছে। আমাকে ঘুড়ি নিয়ে ঘুরতে দেখে কোনো এক পশ্চিমা রমণী হেসে দিলেন অনাবিলভাবে। তার সেই হাসি ছড়িয়ে গেলো আমাদের দুই মেয়ে আর বড়বৌদির প্রশান্তি জাগানো মুখমণ্ডলে। সেই শার্টপড়া চোখে চশমা আঁটা ছবি দেখে আজ নিজেকে মনে হয়, আমিও কি হিমুর স্রষ্টার মতো দেখতে নই?
যাদের প্রযত্নে আমার মধ্যপ্রাচ্যে আহার ও বিহার, তাদের পরিচয় এসব কিছু দিতেই হয়। আমার বড়দা গালফ ঈগল কন্ট্রাক্টিং-এর প্রজেক্ট প্রকৌশলী আর আমার বড়বৌদি গৃহিণী। বড়বৌদি ময়মনসিংহের দেওয়ানগঞ্জে বেড়ে উঠেছেন। কেননা আমার তাউই মশাই দেওয়ানগঞ্জ চিনিকলের সুপারভাইজার। আমাদের পরিবারের দুটো মেয়ে, আমার বাবা-মার নয়নমণি, আমার বড়দার হৃদয়জুড়ে থাকা জীবনের আনন্দ। বড়জন অর্পা আর ছোটজন অ্যানি। যতদিন আবুধাবী ছিলাম ততদিন অর্পার কাছে আরবী ভাষায় পঠন ও লেখন শিখি। সে আমার হাতেখড়িমাতা। এই মেয়েটা হওয়ার পরে তার জন্যে আমি আমার এলাকার দর্জি শতরূপা টেইলার্সের শিবুদাকে বলেছিলাম, আমার হাতের মুঠোর সমান একটা হ্যাট বানিয়ে দিতে। যেদিন সে দোলনায় চড়বে সেদিন তার পবিত্রায়িত কামানো মাথায় এই হ্যাটের শোভা বর্ধিত হবে। অ্যানি হয়েছে আবুধাবীতে। সে সময় ছোটমামা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমাকে হাতের নাগালে পেয়ে খুব খুশি হলেন আমার সেজো বোনের স্বামী। সকালে নাশতাসহ তিনি হাজির। তারপর কথার ঝাঁপি খুলে বসলেন অলস সকালের কলসে গল্পের রসদ যুগিয়ে। একদিন বড়দা নিয়ে গেলেন সারজাহ। সারজাহতে তার প্রজেক্টের সাইট আছে। পাশাপাশি সারজায় আছেন তপন রায়। তিনি আবার আমাদের এলাকার বিখ্যাত ভবন পিকে সেন সাত তলার স্বত্বাধিকারীর মেয়ের জামাই। পিকে সেন সাততলা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ভবন, যা ঐ অঞ্চল তথা আলকরণে প্রথম সাততলা ভবন। এটা অনেক দূর হতে দেখা যেতো। চুন-সুরকি নির্মিত এই ভবনের উঁচুতম তলায় আছে শিবমন্দির। এই ভবনে বড় বড় চল্লিশটি কক্ষ আছে। পিকে সেন এর নাম হতে এর নাম হয়েছে প্রসন্ন ধাম। প্রসন্ন কুমার সেনের মেয়ের জামাই হলেন তপন রায়। তার বাসায় আমরা সসেজ খেলাম। পাতলা পাতলা করে কাটা সসেজ স্যুপে ডোবানো। টুথ পিক দিয়ে এই সব স্লাইসড্ সসেজ খেলাম। সারজায় আমার বড়দার কলেজ জীবনের বন্ধু অসীমদা ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ছেলে। তার সাথেও দেখা হলো। একটা মজার ঘটনা হলো, তার ছোটভাইয়ের ডাক নাম কেবলা। আবার তার ভ্রাতৃবধূর ডাকনামও কেবলি। এটা কিন্তু কাকতালীয়। দুবাইতে আমাদের শৈশবের একজন প্রতিবেশি প্রবাসী ছিলো। তার নাম মোর্শেদ। তার সাথে দেখা হলো। ফলের দোকানের ম্যানেজার। ছোটবেলায় শবে বরাতের রাতে তাদের বাসার হালুয়া আর চালের রুটি আমরা অনেক খেয়েছি। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কাচে ঘেরা টানেল দিয়ে আমরা পুরাণ দুবাই থেকে নতুন দুবাইতে গেলাম। আঠারশ শতকের দিকে দুবাই ছিল একটি ধীবর পল্লি। আঠারশ বাইশ সালের দিকে এ ধীবর পল্লি ধীরে ধীরে পরিণত হয় শহরে।
আবুধাবীতে সবই ভালো লাগলো, কিন্তু যেদিন ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট খেলা দেখতে পারছিলাম না সেদিন খুব মন খারাপ হলো। তখন সনৎ জয়সূরিয়ার গনগনে মধ্যগগণ। তার হাতে উইলো হয়ে উঠে নিমিষেই তরবারী। এমন সময় যদি ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখা না যায় তবে তো জীবনে সবই বৃথা। শচীন আমার প্রিয় খেলোয়াড়। আমার আকার-আকৃতির সাথে শচীনের মিল আছে অনেক দিক থেকেই। শচীন ক্রিকেট খেলে না, শচীন আসলে সবাইকে ক্রিকেটে বুঁদ করে রাখে। তার মাটি কামড়ানো ভি-শটগুলো আমার জন্যে সব সময় লোভনীয় দৃশ্য ছিলো। আমার আকুলি-বিকুলি দেখে বড়দা আমাকে নিয়ে গেলেন সমীরণদার বাসায়। কোন কারণে তার বাসায় স্টার স্পোর্টসের চ্যানেল ছিলো। আমি আর প্রদ্যুৎ অর্থাৎ বড়দার শ্যালক মিলে পুরো খেলাটা দেখে তারপর বাসায় আসলাম। ক্রিকেট নিয়ে তখনো আরবীয়দের ততটা মাতামাতি লক্ষ্য করি নাই। আবুধাবিতে ডাঃ জাফর সাদিক নামে আমার দাদাদের একজন ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ছিলেন। তার সাথে দাদা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তার সাথে আলাপের পর বড়দা চাইলেন আমি যেন তাদের মিনিস্ট্রি অব হেলথের পরীক্ষাটা দেই। কিন্তু সময়ের ঘাটতিতে সেই পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। আমার দেশে ফেরার সময় হয়ে গেছে। দেশে ফেরার দুদিন আগে আমাকে তারা নিয়ে গেলেন এক দিরহামণ্ডদুই দিরহামের দোকানে। আমি বাবার জন্যে ছোট একটা টুইন ওয়ান কিনে চলে আসি। বড়বৌদি অবশ্য আমার দিদিদের জন্যে কিছু কাপড়-চোপড় কিনে দেন।
আমার ফ্লাইট দুবাই থেকে ঢাকা। রাতে ফ্লাইট বলে দুপুরের দিকে বড়দা নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন। টিকেট কনফার্মড না। পৌঁছলে নিশ্চিত করা হবে। যেতে যেতে বড়দা বললো, তুই কথা বলতে থাকবি, থামবি না। কারণ কী? কারণ হলো, দীর্ঘপথে গাড়ি চালাতে গিয়ে ঘুম এসে যেতে পারে। চোখ লেগে আসলে অসুবিধা। তাই কথা বলে বলে ঘুম তাড়ানোর কৌশল বের করতে হলো। মাঝে বেশ কয়েকবার পেট্রোল পাম্পে থেমে কফি খেতে হলো। দুবাই এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখি, লোকে লোকারণ্য। যে ফ্লাইটে আমি যাওয়ার কথা সেটায় কোনো একটা কনফারেন্সে প্রতিনিধি দল যাবে। এজন্যে আমাদের আগে থেকে বুকিং দেয়া কয়েকজনকে পরের ফ্লাইটে আসতে হবে। কিন্তু আমি কাউন্টারে যে ছিলো তার সাথে একটা কৌশল করলাম। বললাম, আগামীকাল আমার ওয়েডিং। সো আমার কোনো বিকল্প নেই। কাচঘেরা জানালায় আমার বড়ভাই কিছু শুনছে না, শুধু বুঝলেন, আমি কোনো একটা উপায় বের করেছি। আমার কৌশলে কাজ হলো। আমার সিটটা ওকে হয়ে গেলো এবং আমি মরুভূমির মরূদ্যান ছেড়ে রওনা দিলাম বঙ্গোপসাগরের বঙ্গভূমির উদ্দেশ্যে। রাতে এলাম বলে আমার আর কিছু খেয়াল নেই, ঘুম কেড়ে নিয়েছে সকল ভ্রমণসুখ। সকালে এসে নামলাম ঢাকার বিশৃঙ্খল বিমানবন্দরে, যেখানে নারী কাস্টমস্ কর্মকর্তার অকারণ লোভের শিকার হয়ে হারালাম মস্কো হতে বহন করে আনা কয়েকটি নান্দনিক পাথর যা আমার বোনেরা পেলে খুশি হতো নিশ্চয়ই। (চলবে)