মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩

স্কুল মাঠটি যেন এমনই থাকে!

হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ রক্ষায় সচেতন মহলের দাবি

উজ্জ্বল হোসাইন
স্কুল মাঠটি যেন এমনই থাকে!

চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে তার স্বাভাবিক চিত্র হারিয়ে ফেলেছিলো। একসময় যে মাঠ সকাল-বিকাল ক্রিকেট, ফুটবল, দৌড়ঝাঁপ আর নানা ধরনের শরীরচর্চায় মুখর থাকতো, সেখানে গত কয়েক বছর যাবৎ গড়ে উঠে ভ্রাম্যমাণ হকার, খাবার ব্যবসায়ী ও চটপটির দোকানের সারি। বিকেলের দিকে মাঠের পাশ দিয়ে কেউ হাঁটলে বা দাঁড়ালে বোঝার উপায় ছিলো না—এটি আদৌ কোনো উন্মুক্ত খেলার মাঠ নাকি অস্থায়ী খাবারের বাজার।

স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াপ্রেমীদের অভিযোগ, ধীরে ধীরে পুরো মাঠটাই দখলে চলে যাচ্ছিলো ভ্রাম্যমাণ খাদ্য ব্যবসায়ীদের। স্কুল ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা খেলতে নামতে পারতো না, আশপাশের তরুণরা শরীরচর্চার সুযোগ হারিয়েছিলো, এমনকি বয়স্করাও হাঁটার মতো খোলা জায়গা খুঁজে পেতো না। মাঠের ভেতরে স্থাপিত অস্থায়ী চটপটিসহ নানা রকমের দোকান, ময়লা-আবর্জনা ও ভিড়ের কারণে পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছিলো, তেমনি নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি, শহরের সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছিলো।

এই মাঠ দখলের বিষয়টি নিয়ে অতীতে একাধিকবার স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। নাগরিক সমাজ, শিক্ষক-অভিভাবক এবং ক্রীড়া সংগঠনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও আবেদন জানানো হয়েছিলো। তবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় হতাশা বাড়ছিলো। অনেকেই মনে করতেন, মাঠটি বুঝি আর কখনো আগের রূপে ফিরবে না।

অবশেষে বর্তমান জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। শনিবার (১৭ জানুয়ারি ২০২৫) জেলা প্রশাসনের নির্দেশে চাঁদপুর পৌরসভার নেতৃত্বে একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মাঠের ভেতরে থাকা সব ভ্রাম্যমাণ হকার, খাবার ব্যবসায়ী ও চটপটির দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান চালিয়ে মাঠ থেকে আবর্জনা অপসারণ করা হয়। উচ্ছেদের পর পুরো মাঠটি আবার উন্মুক্ত ও খেলার উপযোগী হয়ে উঠে।

উচ্ছেদের দিন বিকেলেই দেখা যায়, দীর্ঘদিন পর মাঠে নামছে শিশু-কিশোররা। কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ ফুটবল, আবার কেউ দৌড়ঝাঁপে মেতে উঠেছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে মাঠে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, বছরের পর বছর আমরা এই দৃশ্য দেখিনি। আজ মনে হচ্ছে মাঠটা আবার আমাদের কাছে ফিরে এসেছে।

তবে উচ্ছেদের পরই সচেতন মহলের কণ্ঠে উঠে এসেছে একটি জোরালো দাবি—মাঠটি যেন এমনই থাকে। তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে কিছুদিন পর আবারও হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা মনে করেন, একবার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠনের একজন প্রতিনিধি সাংবাদিক কামরুল ইসলাম বলেন, খেলার মাঠ শুধু একটি খালি জায়গা নয়, এটি শহরের মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি আবার দোকান বসে, তাহলে নতুন প্রজন্ম খেলাধুলার সুযোগ হারাবে। তিনি মাঠটির চারপাশে সীমানা দেয়াল  নির্মাণ, নির্দিষ্ট প্রবেশপথ এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানান। তিনি আরো জানান, এই মাঠে আমি আমার শৈশব এবং কৈশোরকালে খেলাধুলা করেছি। আমরা ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্ট এই মাঠে আয়োজন করতাম। এ সমস্ত হকারের কারণে মাঠ তো খেলার উপযোগী ছিলো না, বরং এটি বাজারে পরিণত হয়েছিলো। আমাদের একটাই দাবি, এই মাঠে যেন আর কোনো বাজার বসতে না পারে। শিক্ষকরাও একই মত প্রকাশ করেছেন। হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, এই মাঠ আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্যে অত্যন্ত দরকারি। খেলাধুলার মাধ্যমে তারা শৃঙ্খলা, দলগত কাজ ও সুস্থ জীবনধারার শিক্ষা পায়। মাঠ দখল হয়ে থাকলে শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাধাগ্রস্ত হয়।

সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু উচ্ছেদ নয়—মাঠ ব্যবস্থাপনায় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা প্রস্তাব করছেন, মাঠে খেলাধুলার নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ, স্থানীয় ক্রীড়া ক্লাবগুলোর সম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হলে দখল ঠেকানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ হকারদের জন্যে বিকল্প নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণের দাবিও উঠেছে, যাতে জীবিকার প্রশ্নে তারা সমস্যায় না পড়েন এবং খেলার মাঠও সুরক্ষিত থাকে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উচ্ছেদের পর মাঠটি খোলা রাখার বিষয়ে তারা আন্তরিক।  চাঁদপুর পৌরসভার এক কর্মকর্তা জানান, খেলার মাঠ, পৌরসভার সৌন্দর্য রক্ষা ও দখলমুক্ত করা আমাদের দায়িত্ব, আমরা মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ করলেও কিছুদিন পর তারা আবার এখানে এসে জড়ো হয়। আমরা নিয়মিত নজরদারি করবো এবং প্রয়োজনে আবারও ব্যবস্থা নেবো। তিনি স্থানীয় জনগণকেও সহযোগিতার আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে উচ্ছেদের মাধ্যমে চাঁদপুর শহরে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে জেলা প্রশাসন, চাঁদপুর পৌরসভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া সংগঠন ও সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যাতে মাঠটি যেন আবার দখলের কবলে না পড়ে, আবার যেন শিশু-কিশোরদের হাসি আর খেলাধুলায় মুখর থাকে—এটাই এখন চাঁদপুরবাসীর প্রত্যাশা।

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়