মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৫

সাঁতারে আমার সোনালী দিনগুলোর কথা এখনও মনে পড়ে

একজন সাবেক কৃতী সাঁতারু হিসেবে স্থানীয়ভাবে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না

----------------------------ফাতেমা বেগম

গোলাম মোস্তফা
একজন সাবেক কৃতী সাঁতারু হিসেবে স্থানীয়ভাবে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না

জন্মসূত্রে চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার চর মাছুয়া গ্রামের মেয়ে ফাতেমা বেগম। এক সময় চাঁদপুরের হয়ে দেশব্যাপী সাড়া জাগানো এক নারী সাঁতারু । ছোটবেলা থেকেই চাঁদপুর শহরে বসবাস করে আসছেন। বাবার চাকুরির সুবাদে এই শহরে বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ এই শহরের অন্যতম সেরা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লেডী প্রতিমা মিত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৯২ সালে পারিবারিকভাবে লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের পোদ্দার বাজার এলাকার চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা খোরশেদ আলমের সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু মায়ার টানে আর সাঁতারের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে বিয়ের পরও এই শহর ছেড়ে যাননি। স্বামীকে নিয়ে এই শহরে আজও বসবাস করে আসছেন।

জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতিমান সাবেক সাঁতারু ফাতেমা বেগমের সাথে চাঁদপুর কণ্ঠের ক্রীড়াকণ্ঠের পক্ষ থেকে কথা হয় সম্প্রতি। কিছু প্রশ্নের জবাব দেন তিনি সাবলীলভাবে। নিচে তা হুবহু তুলে ধরা হলো--

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনি একজন সাঁতারু ছিলেন। সাঁতারে আপনার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের কথা মনে পড়ে কি? সেগুলো কী কী?

ফাতেমা বেগম : জীবনের প্রথমভাগেই যতো অর্জন। সেই অর্জনে তৎকালীন সময়ে আমি সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছি।

অতএব এই সাড়া জাগানো অর্জন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারবো না।

জীবনের প্রথম প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লেডী প্রতিমা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তৎকালীন সময়ে পর্যায়ক্রমে মহকুমা, শিক্ষা বোর্ড, জেলা পর্যায়ে, তারপর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি।

সালটি ১৯৭৯ সাল। জাতীয় পর্যায়ে বয়সভিত্তিক সাঁতারে আমি এককভাবে পাঁচটি গোল্ড মেডেল পাই। এরপর ১৯৮০ সালে একই ধরনের জাতীয় পর্যায়ের সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনটি গোল্ড মেডেল ও দুটি ব্রোঞ্জ অর্জন করি। পুনরায় ১৯৮১ সালে তিনটি গোল্ড মেডেল, ২টি রৌপ্য এবং একটি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করি। পরপর তিন বছর জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে আমি কৃতিত্ব অর্জন করি। কৃতিত্ব অর্জনের এ ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সময়ে দেশের বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় আমাকে নিয়ে বেশ ক’টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সোনালী সেই দিনগুলো কিন্তু এখনও মনে পড়ে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, একজন সাবেক কৃতী সাঁতারু হিসেবে স্থানীয়ভাবে সেই মূল্যায়নটুকু করা হয় না ।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার সাথে যাঁরা সাঁতারে কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, তারা কে কে? কোথায় আছে জানেন কি?

ফাতেমা বেগম : দেখুন, বর্তমান প্রেক্ষাপট আর আমাদের সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। তাছাড়া আমরা হলাম নারী। আমাদের জন্যে কতো রকমের প্রতিবন্ধকতা থাকতো। ছেলেদের মতো আমাদের যোগাযোগের অবস্থাও ছিলো না। লেখাপড়াশেষে বিয়ে-শাদী-সংসার সবকিছু মিলে সেভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া চাঁদপুরে ঐ সময়ে এ রকম নারী সাঁতারু ছিলো না। আমার সাথে ছিলো শুধু চাঁদপুর শহরের গুয়াখোলা কুন্ডু বাড়ির বাসিন্দা বেবী পাল। সেও জাতীয় পর্যায়ে যতোবারেই অংশগ্রহণ করেছে, ততোবারই স্বর্ণ পদক না পেলেও ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে কৃতিত্ব অর্জন করে সুনাম অর্জন করেছে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার সময়ে কিংবা পরে চাঁদপুরের কোনো মেয়ে কি সাঁতারে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে কোনো কৃতিত্ব অর্জন করেছে বলে আপনার জানা আছে?

ফাতেমা বেগম : আমার পর জাতীয় পর্যায়ে সাঁতার প্রতিযোগিতায় কোনো নারী এমন কৃতিত্ব অর্জনের রেকর্ড আমার জানা নেই। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এমন কৃতিত্ব অর্জনের বিষয় বর্তমানে সাঁতারের একজন ট্রেইনার হিসেবেও আমার চোখে পড়ে নি।

ক্রীড়াকণ্ঠ : মেয়েদের সাঁতার শিখতে বা শেখাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা হয় কি? যদি হয় তাহলে সেটা কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হয়?

ফাতেমা বেগম : আশির দশকেই আমাদের দেশে মেয়েরা পড়ালেখার জন্যে অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হতো। খেলাধুলা তো দূরের কথা। একেবারেই নগণ্য সংখ্যক মেয়ে সাধারণত ঐ সময় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। তারপর আস্তে আস্তে সেগুলো কাটিয়ে উঠে এখন নারীরা সমাজের নানা বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

অতএব নারীরা আজকে সমাজে এই অবস্থায় আসতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : চাঁদপুরের সাঁতারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কী ধারণা? আপনাদের সময়ের মতো কি সাঁতার চলছে, না খারাপ অবস্থা?

ফাতেমা বেগম : শুধু চাঁদপুরেই নয়, সারাদেশেই খেলাধুলার ক্ষেত্রে প্রতিভাধরদের বিশাল শূন্যতা রয়েছে। সাঁতার তো দূরের কথা, কোনো ধরনের ক্রীড়া ব্যবস্থাই পরিপূর্ণভাবে নেই। পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবহেতু সারাদেশেই ক্রীড়াঙ্গনে ঝিমিয়ে পড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে। আধুনিকতার যুগে নতুন প্রজন্মকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে নানা ধরনের খেলাধুলার মধ্যে ব্যস্ত রাখা উচিত। চাঁদপুরের সাঁতারের এক সময় সারাদেশে ব্যাপক সুনাম ছিলো। আমরা যখন জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় যেতাম, তখন দেখতাম চাঁদপুরকে নিয়ে সবাই আতঙ্কে থাকতো। আর এখন চাঁদপুরের সাঁতারের সেই জৌলুস নেই। মূলত চাঁদপুরে ওই সময় যারা এই সাঁতারের আয়োজনে ছিলো, তাদের মধ্যে একটা স্পীড ছিলো। আয়োজন করার জন্যে নানা উদ্যোগ ছিলো এবং সাঁতারের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে সব সময় যোগাযোগ থাকতো। অর্থাৎ ঐ সময়ের নেতৃত্ব বা ক্রীড়া সংগঠকরা নিজেদের স্বার্থের দিকে তাকাতো না। এখন সেই ধরনের নেতৃত্ব বা ক্রীড়া সংগঠক নেই, প্রশাসনের আন্তরিকতা নেই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। পৃষ্ঠপোষকতায় যারা থাকার কথা তাদেরআন্তরিকতার অভাবের কারণেই সাঁতারের এই করুণ হাল।

উল্লেখিত কারণগুলোর জন্যেই চাঁদপুরের সাঁতারের চরম বিপর্যয় চলছে।

আমি মনে করি, চাঁদপুরের সাঁতারের করুণ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সকলকে আন্তরিক হতে হবে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : বিশ্বখ্যাত সাঁতারু আ. মালেক ও অরুন নন্দীর মতো সাঁতারু কি আর চাঁদপুরে জন্মাবে না?

ফাতেমা বেগম : আমি পূর্বে সাঁতারের করুণ অবস্থার কিছু কারণ উল্লেখ করেছি।

এই সঙ্কটগুলো কাটিয়ে নতুন প্রজন্মকে সাঁতারের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সাঁতারের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি চাঁদপুরের অরুন নন্দী সুইমিং পুলকে আধুনিকায়ন করে নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযোগী করে তুলতে হবে। তাহলে চাঁদপুরের সাঁতারের অতীত ঐতিহ্য ফিরে আসবে এবং সাঁতারু আব্দুল মালেক ও অরুন কুমার নন্দীর মতো দূরপাল্লার সাঁতারু সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। নচেৎ সম্ভব নয়।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আমাদের উপরের প্রশ্নমালার বাইরে আপনার কোনো বক্তব্য থাকলে বলতে পারেন।

ফাতেমা বেগম : একজন সাঁতারু হিসেবে আমার বক্তব্য হচ্ছে : চাঁদপুরের সাঁতারের যে অতীত ঐতিহ্য রয়েছে সেটিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। আব্দুল মালেক ও অরুন কুমার নন্দীর মতো সাঁতারুদের স্মৃতি বিজড়িত এই শহরকে সাঁতারের জেলায় রূপান্তরিত করতে হবে। এজন্যে সকলকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। সাঁতারকে বাঁচাতে সকলে এগিয়ে আসুন, নতুন প্রজন্মকে সাঁতারের প্রতি আগ্রহী করে তুলুন।

১৯৭৯ সালে দেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় সাঁতারু ফাতেমা বেগমকে নিয়ে লেখা একটি ফিচার।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়