মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৭

মেধাবী নাকি মানবিক মানুষের প্রয়োজন বেশি?

হাসান আলী
মেধাবী নাকি মানবিক মানুষের প্রয়োজন বেশি?

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতা আর দক্ষতার জোরে সমাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। চারদিকে আমরা দেখি মেধাবী মানুষ—বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ—যারা নতুন নতুন উদ্ভাবন করে জীবনকে সহজ করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু মেধাবী মানুষ কি একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারে? নাকি মানবিক মানুষই আসল ভরসা?

মেধা মানুষের বড়ো শক্তি। মেধা মানুষকে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দেয়, নতুন চিন্তা তৈরি করতে সাহায্য করে। সভ্যতার ইতিহাসে যাঁরা বিপ্লব ঘটিয়েছেন—নিউটন, আইনস্টাইন, টমাস এডিসন—তাঁরা সবাই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। আধুনিক চিকিৎসা, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবই মেধাবী মানুষের অবদান। যদি কেবল দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়েই পৃথিবী চলতো, তাহলে হয়তো মানবজাতি অনেক আগেই সব সমস্যার সমাধান পেয়ে যেতো।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, মেধা যদি মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। একই বিজ্ঞান দিয়ে যেমন রোগ নিরাময় হয়, তেমনি সেই বিজ্ঞান দিয়েই তৈরি হয় ভয়াবহ অস্ত্র। একই প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করে, আবার সেই প্রযুক্তিই মানুষকে বেকার ও নিঃসঙ্গ করে তোলে। এখানে প্রশ্ন আসে—মেধা কার জন্য, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে?

এই জায়গাতেই মানবিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। মানবিক মানুষ কেবল নিজের কথা ভাবে না, অন্যের কষ্ট অনুভব করে। মানবিকতা মানুষকে সহানুভূতিশীল, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল করে তোলে। একজন মানবিক ডাক্তার শুধু রোগ সারান না, রোগীর ভেতরের ভয়ও বোঝেন। একজন মানবিক শিক্ষক কেবল পড়ান না, ছাত্রের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন। একজন মানবিক প্রশাসক কেবল আইন প্রয়োগ করেন না, মানুষের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখেন।

বিশেষ করে প্রবীণদের জীবন আমাদের এই সত্যটা আরও স্পষ্ট করে শেখায়। প্রবীণ বয়সে মানুষ যখন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সহানুভূতি ও ভালোবাসা। এখানে মেধা নয়, মানবিকতাই মুখ্য। একটি আধুনিক হাসপাতাল যতোই উন্নত হোক, যদি সেখানে নার্স ও চিকিৎসকের আচরণ রুক্ষ হয়, তবে সেই সেবা মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে না। আবার সাধারণ একটি গ্রাম্য সেবাকেন্দ্রও মানবিক আচরণের মাধ্যমে মানুষের বড়ো আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের সমাজে আজ অনেক মেধাবী মানুষ আছে, কিন্তু মানবিক মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কমে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। আমরা দেখি, কেউ বড়ো পদে, বড়ো টাকায়, বড়ো ক্ষমতায় পৌঁছে গেলে অনেক সময় সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভুলে যায়। অথচ প্রকৃত মহত্ত্ব আসে তখনই, যখন মেধার সঙ্গে মানবিকতা যুক্ত হয়।

আসলে মেধা আর মানবিকতা একে অপরের বিরোধী নয়। বরং সেরা মানুষ সে-ই, যিনি দুটোকেই ধারণ করেন। একজন বিজ্ঞানী যদি মানবিক হন, তবে তিনি এমন গবেষণা করবেন যা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে। একজন ব্যবসায়ী যদি মানবিক হন, তবে তিনি শুধু লাভ নয়, কর্মীদের জীবনমানের কথাও ভাববেন। একজন রাজনীতিক যদি মানবিক হন, তবে ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, জনগণের সেবা করবেন।

তবে যদি বেছে নিতে হয়—মেধাবী না মানবিক—তাহলে মানবিক মানুষকেই বেশি প্রয়োজন। কারণ মানবিকতা ছাড়া মেধা অন্ধ হয়ে যেতে পারে। মানবিকতা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। মেধা আমাদের বলে কীভাবে কিছু করা যায়, আর মানবিকতা আমাদের বলে কেন করা উচিত।

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো সংকট প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং সহানুভূতির অভাব। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, পরিবেশ ধ্বংস, সামাজিক বৈষম্য—এসব সমস্যার পেছনে মেধার ঘাটতি নেই, আছে মানবিকতার ঘাটতি। মানুষ যদি অন্য মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করতো, তাহলে এই পৃথিবী অনেক সুন্দর হতো।

সবশেষে বলা যায়, মেধা আমাদের শক্তিশালী করে, কিন্তু মানবিকতা আমাদের মানুষ করে তোলে। একটি সত্যিকারের সুন্দর সমাজ গড়তে হলে আমাদের দরকার মানবিক মেধাবী মানুষ—যাঁরা শুধু জানেনই না, ভালোবাসতেও জানেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়