মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৭

সম্পদ নয়, সম্পর্কই শেষ বয়সের প্রকৃত আশ্রয়

হাসান আলী
সম্পদ নয়, সম্পর্কই শেষ বয়সের প্রকৃত আশ্রয়

মানুষের জীবনে সম্পদের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাসস্থান, চিকিৎসা, খাদ্য, নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্যেই অর্থ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রবীণ বয়সে, যখন আয় কমে আসে বা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সঞ্চিত সম্পদ অনেকটাই ভরসা জোগায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সম্পদ কি একাই মানুষের বার্ধক্যকে নিরাপদ ও শান্তিময় করতে পারে? বাস্তবতা বলছে, না। প্রবীণ বয়সে সম্পদের পাশাপাশি—বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন আন্তরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা ও মানবিক সংযোগ।

যৌবনে মানুষ সম্পদ অর্জনের পেছনে নিরলস পরিশ্রম করে। সন্তানের ভবিষ্যৎ, নিজের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর জন্য অর্থকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো কখনো এই সম্পদ রক্ষার চিন্তা কিংবা সম্পদ বণ্টন নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা সম্পর্কের ভাঙ্গন ডেকে আনে। ভাইয়ে ভাইয়ে দূরত্ব, সন্তানের সঙ্গে মনোমালিন্য, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সন্দেহ—এসবের কেন্দ্রে অনেক সময় সম্পদই থাকে। শেষ বয়সে এসে যখন মানুষ সম্পর্কের উষ্ণতা খোঁজেন, তখন দেখেন চারপাশে কেবল দেয়াল, নেই আপনজনের স্পর্শ।

প্রবীণ বয়সে সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো—কেউ পাশে থাকুক, কথা শুনুক, সময় দিক। একটি আন্তরিক আলাপ, একটি সহানুভূতির হাত, একটি খোঁজ নেওয়া—এগুলো কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে কেনা যায় না। সম্পদ হয়তো ভালো হাসপাতালের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু অসুস্থতার রাতে যে সান্ত্বনা দরকার, তা আসে প্রিয়জনের কণ্ঠ থেকে। অর্থ দিয়ে পরিচর্যাকারী পাওয়া যায়, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে পাওয়া যায় আপনজন।

অনেক প্রবীণই সম্পদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত কঠোর হয়ে পড়েন। সন্দেহ করেন, “কে আমার সম্পদের দিকে তাকিয়ে আছে?” এই সন্দেহ ধীরে ধীরে সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলে। আবার উল্টো দিকেও সমস্যা আছে—কেউ কেউ সব সম্পদ জীবিত অবস্থায় দিয়ে দিয়ে নিজের অবস্থান দুর্বল করে ফেলেন, পরে অবহেলার শিকার হন। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য। সম্পদের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি সম্পর্কের সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্ক রক্ষার মূল চাবিকাঠি হলো বিশ্বাস ও যোগাযোগ। প্রবীণ বয়সে খোলামেলা আলোচনা খুব প্রয়োজন—সন্তানদের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে বললে ভুল বোঝাবুঝি কমে।

গোপনীয়তা বা একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক সময় সন্দেহ ও দূরত্ব বাড়ায়। পরিবারে স্বচ্ছতা থাকলে সম্পদ নিয়ে বিরোধ কম হয়, সম্পর্কও অটুট থাকে।

আমাদের সমাজে একটি বাস্তবতা হলো—সম্পদ থাকলে অনেকেই কাছে আসে, না থাকলে দূরে সরে যায়। কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক চেনা যায় দুঃসময়ে। প্রবীণ বয়সে তাই সম্পর্কের মান যাচাই হয় স্বাভাবিকভাবেই। যে সন্তান বা আত্মীয় নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকে, তার মূল্য কোনো অর্থে পরিমাপ করা যায় না। আবার প্রবীণদেরও উচিত সম্পর্ককে কেবল সম্পদ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করা। ভালোবাসা আদায় করা যায় না—তা অর্জন করতে হয় আচরণ ও মানবিকতায়।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—স্বনির্ভরতা। সম্পদ থাকলে প্রবীণ ব্যক্তি কিছুটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তার আত্মসম্মান রক্ষা করে। কিন্তু সেই স্বনির্ভরতা যেন সম্পর্ক ভাঙার কারণ না হয়। আত্মসম্মান ও সম্পর্ক—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রজ্ঞার পরিচয়।

সবশেষে বলা যায়, সম্পদ জীবনের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু সম্পর্ক জীবনের অর্থ দেয়। শেষ বয়সে মানুষ ফিরে তাকায়—কে পাশে ছিলো, কে খোঁজ নিয়েছে, কে ভালোবেসেছে। তখন ব্যাংক হিসাব নয়, স্মৃতির হিসাবটাই বড়ো হয়ে উঠে।

প্রিয় বন্ধু, প্রবীণ কল্যাণের কাজ করতে গিয়ে আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন—একজন একাকী ধনী প্রবীণের চেয়ে একজন স্বল্পসচ্ছল কিন্তু সম্পর্কসমৃদ্ধ প্রবীণ অনেক বেশি মানসিকভাবে শান্ত থাকেন। তাই আমাদের বার্তা হোক—সম্পদ সঞ্চয় করুন, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট করে নয়। সম্পদ রক্ষা করুন, কিন্তু ভালোবাসার বিনিময়ে নয়। কারণ শেষ বয়সে মানুষ আশ্রয় খোঁজে হৃদয়ে—সম্পদের বাক্সে নয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়