প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০২
খেলার মাঠ নাকি ভাসমান দোকানের হাট?
ঐতিহ্য হারাচ্ছে চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ

এক সময়ের খেলাধুলা, মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ আর ঐতিহ্যবাহী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার স্থান চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। নানা ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী এই মাঠটি এখন হকার, চটপটি-ফুচকা বিক্রেতা, কাপড় বিক্রেতা এবং ভ্যান গাড়িতে পোশাক বিক্রেতাদের দখলে। ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি বছরের পর বছর ধরে কার্যত পরিণত হয়েছে এক অনানুষ্ঠানিক ‘হাট-বাজারে’, যা শহরবাসীর মনে জন্ম দিয়েছে গভীর হতাশা ও প্রশ্ন।
|আরো খবর
গত কয়েক বছর ধরে দেখা গেছে, প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত অবধি মাঠের দুপাশ দখল নেয় শত শত অস্থায়ী ব্যবসায়ী। কাপড় বিক্রেতা, খেলনা বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের সব ধরনের দোকান এখন মাঠের ভেতরেও চলে এসেছে। এতে একদিকে যেমন শিশু-কিশোরদের জন্যে খেলার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, তেমনি ঐতিহ্যবাহী সভা-সমাবেশ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও কঠিন হয়ে পড়েছে। খেলার মাঠের এই হাট-বাজার হয়ে যাওয়া দৃশ্যটি শহরবাসীর কাছে একটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক বিষয়।
চাঁদপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই খেলার মাঠটি বিদ্যালয় ও আশেপাশের শিশু-কিশোরদের প্রধান খেলার স্থান ছিলো। বিভিন্ন মেলা, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা ও অন্যান্য কৃষি এবং বৃক্ষ মেলার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে মাঠের অধিকাংশ স্থান দখল করে বসেছেন অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতের এই সংস্কৃতি মাঠের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ায় একদিকে যেমন খেলার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের চলাচলের পথও সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। হকারদের দখলের কারণে খেলার পরিবেশ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ায় চাঁদপুরবাসীর মনে তীব্র হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে দখলের এমন দৃশ্য। এটি কি খেলার মাঠ হিসেবে নিজের পরিচয় ধরে রাখতে পারবে, নাকি শেষমেশ পরিণত হবে একটি স্থায়ী বাজারে, এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে শহরবাসীর মুখে।
কেবল খেলার পরিবেশই নয়, হকারদের লাগামহীন দখলদারিত্বের কারণে হাসান আলী সরকারি উচ্ট বিদ্যালয় মাঠ তার চারপাশের প্রাকৃতিক শোভাও হারিয়েছে। মাঠের সীমানায় বা পাশে লাগানো বিভিন্ন প্রজাতির ছোট চারাগাছগুলো বড় হয়ে উঠতে পারেনি। অস্থায়ী দোকান স্থাপন, দোকানের সরঞ্জাম রাখা এবং যাতায়াতের সুবিধার জন্যে বিক্রেতারা নিয়মিতভাবে সেই চারাগাছ বা নতুন গজিয়ে ওঠা গাছগুলো ভেঙ্গে ফেলে বা উপড়ে ফেলে দেয়। ফলে, দীর্ঘকাল ধরে মাঠটি সবুজের ছায়া এবং প্রাকৃতিক বেষ্টনী থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। একটি খেলার মাঠের জন্যে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোও হকারদের এই আগ্রাসী কার্যকলাপের শিকার।
তবে আশার কথা হলো এই যে, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থাকা এই মাঠের সংস্কারের জন্যে একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জানা যায়, প্রায় তিন মাস পূর্বে চাঁদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিনের মাধ্যমে হাসান আলী মাঠসহ অন্যান্য ৮টি স্কুলের মাঠ সংস্কারের জন্য ৩৫ লাখ টাকার একটি বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়। এই সংস্কার কাজের উদ্দেশ্য, মাঠকে হকারমুক্ত করে একে আবারও খেলাধুলার উপযোগী করে তোলা এবং এর চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করে স্থায়ী স্থাপনা বা হকারদের প্রবেশ বন্ধ করা।
মাঠ সংস্কারের এই উদ্যোগ এখন আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশলের সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, মাঠের বরাদ্দের প্রাক্কলন করে আমরা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে অনুমতি হয়ে আসলে আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করবো। আশা করছি, এ সপ্তাহের মধ্যেই সেই অনুমতি চলে আসবে।
মাঠটি দ্রুত হকারমুক্ত করে এবং সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার মাধ্যমে এটি আবার তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং প্রকৃত খেলার মাঠ হিসেবে রূপ নিবে এই প্রত্যাশায় রয়েছে চাঁদপুরের সর্বস্তরের মানুষ ও ক্রীড়াপ্রেমীরা।








