প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৮
ধারাবাহিক উপন্যাস-৩৩
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘ভাই যখন বলেই ফেলেছেন তাহলে ভাইয়ের বাড়িতে থাকতে সমস্যা কোথায়? ভাইয়ের পেনশনের টাকায় না হয় চারটে ডালভাত জুটে যাবে। আমাদের ট্রেনের আরও ঘণ্টাখানেক বাকি আছে আমার মনে হয় দেরি করা ঠিক হবে না।’
মহিলা কেমন যেন আমতা আমতা করে কিছুক্ষণ পর রাজি হয়ে যায় আর রাজি না হয়েও উপায় নেই। যে জীবনটা কাটাচ্ছে তাতে ভরসার মানুষ পাওয়া দুষ্কর তাছাড়া তার একটা আশ্রয় দরকার যেখানে তার স্বামী সুরক্ষিত থাকতে পারে তার মৃত্যুর পর। উনারা দুজনে চলে যাওয়ার পর সারোয়ার, অনিমেষ বলে উঠেÑ
‘দাদা ভেবেচিন্তে বলেছেন তো?’
‘(মুচকি হেসে) ভাবার কী আছে উনাদের জায়গায় আমরা হলে কী করতাম? ঈশ্বর দয়াময় হয়তো তাদের নসিবে আমার সহযোগীতা ছিল বলেই পাবে তাছাড়া আমি হেরে গেলে তোমরা আছ না!’
কথাটা বলার সাথে সাথে সারোয়ার আর অনিমেষ একটা প্রশান্তির হাসি হেসে চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলা একটা ছোট ব্যগ নিয়ে হাজির হন স্বামীসহ। আমরা যথরীতি ফিরে আসি নিজ শহরে এবং অপেক্ষার পালা শেষে নিকুঞ্জ নিকেতন ফিরে পায় আমাদের। বাসায় এসে তাদের একটা রুমে সেট করার জন্য মনমোহনকে বলে দেই। নীচতলায় কোনার রুমটা দেওয়া হয় তাদের। চায়ের পর্ব শেষে আমরা সকলে সকলের কাছ থেকে বিদায় নেব এমন সময় পিটারের মুখটা কেমন যেন মলিন। না চাইতেও যেন যেতে হবে তার বাড়িতে যেখানে সে নিজেই নিজের আপনজনদের কাছে অপরিচিত। তার বিষয়ে কক্সবাজার যাওয়ার আগেই ভেবে রেখেছিলাম তাই আমার পাশের রুমটা যাওয়ার আগে বলে রাখি ঝাড় দিয়ে পরিপাটি করে রাখতে। মনমোহন সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে দেখি। আমরা সকলে নিকুঞ্জ নিকেতনের গেইটে দাঁড়ানো আর বিদায় লগনে ভোরে দেখা হবে পার্কে সেই আশ্বাস দিয়ে বিদায় নিবে এমন সময় পিটার মাথা নুঁইয়ে ফিরে দাঁড়াল যাওয়ার জন্য।
‘পিটার বাসায় কী তোমার জিনিসপত্র বেশি?’
‘কেন দাদা?’
‘বলছিলাম আমার দাবার একজন পার্টনার প্রয়োজন। তোমাকে তো প্রতিদিন কল করে আনাতে পারব না তাই একেবারে চলে আস নিকুঞ্জ নিকেতনে।’
কথাটার জন্য পিটার যেন অপ্রস্তুত ছিল। চকিত নয়নে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চলে গিয়েও থেমে যায় সারোয়ার আর অনিমেষ। সারোয়ারের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস কারণ সেও চাইছিল পিটার তার আপনজনদের কাছ থেকে ফিরে আসুক যেখানে তার মূল্যায়ন নেই তারই সন্তানদের কাছে। বের হয়ে আসুক এই অসুস্থ্য পরিবেশ থেকে। পিটার শুধু তাকিয়ে আছে আর তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।
‘মনমোহনকে কী তোমার সাথে দিব?’
‘দাদা আপনার সমস্যা হবে না?’
‘কী হবে সেটা আমি বুঝব এখন যেটা বলেছি সেটার উত্তর দাও?’
‘না লাগবে না আমি নিজেই পারব সবকিছু গুছিয়ে নিতে। আমার মালামাল তেমন কিছু নেই যা আছে সব ওদের দিয়ে আসব।’
‘তাই করো, অযথা জিনিসপত্র এনে বোঝা বাড়িয়ে লাভ নেই বরং তোমার নিত্য ব্যবহার্য আর যা কিছু আছে প্রয়োজনীয় শুধু সেগুলো নিয়ে চলে আস।’
‘আজ রাত হয়ে গেছে কাল সকালে সবকিছু নিয়ে চলে আসবে। এখন এসো সকলে একসাথে ডিনারটা করে নেই।’
পরদিন যথারীতি আমাদের দেখা হয় পার্কে। এক রাউন্ড দেওয়ার পর জমে যায় আড্ডা আর কক্সবাজারের স্মৃতিচারণ। সবে মাত্র ফিরেছি তাই কক্সবাজারের গন্ধ গায়ে থাকবে হয়তো পুরো মাস জুড়ে। পিটার আসেনি আজ। সারোয়ারকে বলা হয় পিটারের বাসায় গিয়ে জিনিসপত্র গোছানোতে সহযোগীতা করতে। সে অনায়াসে রাজি হয়ে যায় আর বিদায় নেয় পিটারের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। বেলা বারোটায় পিটার আর সারোয়ার আসে বাসায় কিছু মালামাল নিয়ে। পিটারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল যে রুম সেখানে তার মালামালগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। পিটার যদিও হাসিখুশি কিন্তু সারোয়ার গম্ভীর হয়ে বসে আছে।
‘কী হয়েছে সারোয়ার এত গম্ভীর কেন? ওখান থেকে ফিরতে কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি?’
‘দাদা আপনি কী বিষয়গুলো আঁচ করতে পেরেছিলেন?’
‘কী হয়েছে সেটা বলে ফেল আগে?’
‘মনমোহন বাবু আপনি পিটারের জিনিসগুলো রুমে নিয়ে রাখুন তো আর পিটার তুমি তোমার রুমটা গুছিয়ে নাও।’
‘আমি একটু বসি তোমাদের সাথে?’
‘না তোমার বসা লাগবে না আগে গিয়ে রুম গোছাও তারপর বসে আরাম করবে, মন খারাপ করে লাভ নেই আগে যাও।’
‘কী হয়েছে সারোয়ার খুলে বল তো দেখি?’
‘গতকাল রাতে পিটার বাসায় ফিরলে তার ছেলে ও বউ বেশ ঝামেলা করে। কথাগুলো পিটারের নাতনির কাছ থেকে জানতে পারলাম। সকালে নাশতাটাও অফার করেনি তারা। কক্সবাজার থেকে যেগুলো নাতনির জন্য কিনেছিল তা দেওয়ার পর তার ছেলের বউ সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পিটার বাক্স গোছগাছ করেছে বলে আবার ফিরে এসে বলেÑআবার কতদিনের জন্য নাটক করবেন। একবারে চলে গেলেই তো পারেন। কথাটা শোনার পর পিটার নড়েচড়ে বসে তারপর জিনিসগুলো নিয়ে সোজা চলে আসে। পথে একটা চায়ের দোকানে বসে হালকা নাশতা করি এই আর কী?’
[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]








