মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:৩৭

বনের পশু নয়, মনের পশুর কুরবানি হোক

মো. মেহেদী হাসান সোহেল
বনের পশু নয়, মনের পশুর কুরবানি হোক

চারিদিকে আজ পশুর হাটের কোলাহল, কোটি টাকার পশুর রাজত্ব। ধারালো ছুরির নিচে পশুর নিথর দেহ বিলীন হয়ে যায়, আর আমরা তৃপ্তির শ্বাস ফেলে ভাবিÑকুরবানি তো সফল! কিন্তু এই রক্তাক্ত সার্থকতা আমাদের বিবেককে এক মুহূর্তের জন্যও কি থমকে দঁাড় করায় না? সমাজটার দিকে তাকালে আজ গা শিউরে ওঠে। হাটের চতুষ্পদ জন্তুগুলো ঠিকই জবাই হচ্ছে, কিন্তু সমাজের বুকে মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো হিংস্র, কামাতুর আর লম্পট ‘মনের পশু’গুলো আজো জ্যান্ত রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বোন রামিসা ধর্ষণের মতো যে লোমহর্ষক ও বর্বর পৈশাচিকতা আমরা দেখলাম, তা প্রমাণ করেÑআমরা বনের পশুকে কুরবানি পারলেও, মনের ভেতরের জানোয়ারটাকে বহাল তবিয়তে বঁাচিয়ে রেখেছি।

এই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দঁাড়িয়েই

আমার লেখা ত্যাগের ঈদ কবিতার একটি অংশ তুলে ধরছি,

“রক্ত,মাংস কিংবা পশুর নিথর দেহখানি,

আল্লাহর কাছে তো আর কিছুই পেঁৗছাইনি।

ত্বাকওয়াকে ধর দীপ্ত করে মন ও প্রাণ,

ভুলে যাস না ওহে নবীপ্রেমিক মুসলমান।”

আমার এই চরণের মূল সত্য স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন,

“আল্লাহর কাছে পেঁৗছায় না ওগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তঁার কাছে পেঁৗছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।” (সূরা হজ, আয়াত: ৩৭)

কুরবানি কোনো আভিজাত্য বা গোশত খাওয়ার উৎসব নয়; এটি অন্তরে আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া জাগ্রত করার এক মহোত্তম সাধনা। মন ও প্রাণে যদি সেই তাকওয়ার আলো দীপ্ত না হয়, তবে পশুর ওই নিথর দেহখানি আল্লাহর দরবারে শুধু এক টুকরো গোশতের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদা অন্তরের এই পশুবৃত্তিকে দমন করার তাগিদ দিয়েছেন। সহীহ বুখারীর হাদিসে এসেছে:

“জেনে রাখো! শরীরের মধ্যে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যদি তা সংশোধন হয়ে যায়, তবে পুরো শরীরই সংশোধন হয়ে যায়। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো, তা হলো ক্বলব বা অন্তর।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫২)

আজ রামিসাদের যে নির্মম সম্ভ্রমহানি করা হচ্ছে, তার মূল কারণÑআমরা পশুর গলায় ছুরি চালালেও আমাদের অন্তরের সেই ‘ক্বলব’ বা কলিজাকে পশুমুক্ত করতে পারিনি। অথচ প্রকৃত মুসলমান তো সে-ই, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে।

আমরা আজ নিজেদের ‘নবীপ্রেমিক মুসলমান’ বলে দাবি করি, অথচ বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে আল্লাহর রাসূল (সা.) অত্যন্ত আকুল হয়ে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেনÑ “তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো”Ñতা আমরা ভুলে বসে আছি। বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় মেতে উঠে নবীপ্রেমের আসল দাবি ভুলে গেলে চলবে না। হাটের পশুর রক্তে রাস্তা রাঙানোর আগে, আমাদের নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তির রক্ত ঝরাতে হবে।

পশু কুরবানি শরিয়তের একটি পবিত্র ও ওয়াজিব বিধান, যা সামথর্যবানদের অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু সেই বাহ্যিক ইবাদত তখনই আল্লাহর দরবারে সার্থক ও কবুল হবে, যখন আমাদের সমাজ থেকে পশুবৃত্তি দূর হবে, যখন রামিসাদের মতো আর কোনো বোনকে মানুষের রূপধারী পশুদের লালসার শিকার হতে হবে না। আসুন, এই কুরবানিতে হাটের পশুর সাথে সাথে আমাদের মনের অহংকার, লম্পটতা ও পশুবৃত্তিকে চিরতরে জবেহ করি। তবেই সমাজ শান্তিময় হবে, তবেই আমাদের কুরবানি সফল হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়