প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:৩৫
হজ্জ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং মুসলিম উম্মাহর এক মহান ঈমানী সফর

হজ্জ ইসলামের মৌলিক ইবাদতের একটি। এটি শুধু একটি সফর নয় বরং বান্দার আত্মশুদ্ধি, তাওবা, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রশিক্ষণ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলিম ভাই-বোন একই পোশাকে, একই কণ্ঠে “লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক” ধ্বনি তুলে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে থাকে। এতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
আল আযহার ইউনিভার্সিটির গ্র্যান্ড ইমাম ড. আহমদ তাইয়্যেব হাফি: বলেন,“হজ্জ হলো এক মহান ঈমানী সফর, যা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির সীমা অতিক্রম করে। এর উদ্দেশ্য কেবল সফর বা আনন্দ নয় বরং আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করা এবং হাজ্জীর প্রতিটি পদক্ষেপে পবিত্র নিদর্শনসমূহের মহিমা অনুভব করা”
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর মানুষের উপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ্জ করা ফরজ, যারা সেখানে পেঁৗছার সামথর্য রাখে” হজ্জের প্রতিটি ধাপে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা। ইহরাম থেকে শুরু করে বিদায়ী তাওয়াফ পর্যন্ত হজ্জের প্রতিটি কাজ আপন কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকল, সে নবজাতক শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে”
হজ্জ মুসলমানকে কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিক্ষা দেয় না বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহভীতি, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও মানবতার শিক্ষা দেয়। ধনী-গরিব, আরব-অনারব, সাদা-কালো। সকল প্রকার বিভেদ ভুলে সবাই একই পোশাকে আল্লাহর সামনে দঁাড়ানোর শিক্ষা দেয়। এটি মানবজাতির সাম্য ও ইসলামে সার্বজনীনতার প্রতিচ্ছবি।
আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর জন্য হজ্জের শিক্ষা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হজ্জ আমাদেরকে শিখায় অহংকার নয়, বিনয়। বিভেদ নয়, ঐক্য। গুনাহ নয়, তাকওয়া। মোটকথা: আখিরাতমুখী জীবনই প্রকৃত সফলতার পথ।
হজ্জের ধারাবাহিক এ কার্যক্রমকেই বলা হয় মানাসিকে হজ্জ তথা হজ্জের নীতিমালা। যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা তোমাদের হজ্জের বিধানসমূহ আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো”। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, হজ্জের প্রতিটি আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করাই মুসলমানের কর্তব্য। হজ্জের মানাসিকসমূহ ধাপে ধাপে তুলে ধরছি,
১. ইহরাম : হজ্জের প্রথম ধাপ হলো ইহরাম বঁাধা। নির্ধারিত মীকাত থেকে নিয়ত ও তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করতে হয়। আর ইহরাম মানুষকে দুনিয়াবি অহংকার ত্যাগ ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
২. তাওয়াফুল কুদূম : মক্কায় পেঁৗছে কাবা শরীফকে সাতবার তাওয়াফ করাই তাওয়াফে কুদুম। এটি আল্লাহর ঘরের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রতীক।
৩. সাঈ : সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানোকে সাঈ বলে। এটি হযরত হাজেরা (আ.) এর ত্যাগ ও আল্লাহর উপর ভরসার স্মৃতি বহন করে এবং আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন সমূহের একটি।
৪. মিনায় অবস্থান : ৮ জিলহজ্জ মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। এখানে হাজীরা অধিক পরিমাণে ইবাদত, দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকেন।
৫. আরাফায় অবস্থান : ৯ জিলহজ্জ আরাফার ময়দানে অবস্থান হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন সমূহের একটি। এদিন আল্লাহর রহমত ব্যাপকভাবে বর্ষিত হয়।
৬. মুযদালিফায় রাত্রিযাপন : আরাফা থেকে ফিরে হাজীরা মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করেন এবং জামারাতে নিক্ষেপের জন্য কংকর সংগ্রহ করেন।
৭. জামারাতে কংকর নিক্ষেপ : শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে কংকর নিক্ষেপ করা এটি নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।
৮. কুরবানি : সামর্থ্যবান হাজীদের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। এটি হযরত ইবরাহিম (আ.) এঁর ত্যাগের স্মৃতি বহন করে।
৯. হলক বা কসর : পুরুষেরা মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করবেন এবং নারীরা সামান্য চুল কাটবেন।
১০. তাওয়াফুল ইফাদা : এটি হজ্জের ফরজ তাওয়াফ। কুরবানি ও হলকের পর এটি আদায় করতে হয়।
১১. আইয়ামে তাশরীকে রমি : ১১, ১২ এবং কখনো ১৩ জিলহজ্জ তিন জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা হয়।
১২. তাওয়াফুল বিদা : মক্কাতুল মুকাররমা ত্যাগের পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন “কেউ যেন শেষ কাজ হিসেবে কাবা তাওয়াফ ব্যতিত ফিরে না যায়” হজ্জের প্রতিটি ধাপ মানুষকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে পরিচালিত করে।
হজ্জ শেষে মদীনা শরীফ সফর দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণের চাবিকাঠি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মুবারক জিয়ারত করা মুসলমানদের হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা, আদব ও ঈমানী আবেগের এক অনন্য প্রকাশ। যদিও রওজা মুবারক জিয়ারত হজ্জের ফরজ বা ওয়াজিব কোনো বিষয় নয়, তবুও যুগ যুগ ধরে উলামায়ে কিরাম এটিকে অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ ও বরকতময় আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, “আর তারা যদি নিজেদের উপর জুলুম করার পর আপনার কাছে আসে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবে তারা অবশ্যই আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু পাবে”
উলামায়ে কিরাম এ আয়াত থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার ফযিলত ও আদবের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব” আরেক বর্ণনায় এসেছে, “যে ব্যক্তি হজ্জ করার পর আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করল” মদীনা শরীফ শুধু একটি শহর নয় বরং এটি প্রেম, আদব, রহমত ও নূরের নগরী। এখানেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর রওজা মুবারক, সাহাবায়ে কিরামের স্মৃতি এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষিত আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মদীনা তাদের জন্য উত্তম,যদি তারা তা জানতো”। রওজা জিয়ারতের সময় অত্যন্ত আদব ও বিনয়ের সাথে সালাম পেশ করা উচিত। উচ্চস্বরে কথা বলা, হৈচৈ করা বা বেয়াদবি করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠের উপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু করো না”। ইসলামী শরীয়াহ্ এ আদব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর ওফাতের পরও বহাল রেখেছে। তাই হজ্জ শেষে রওজা মুবারক জিয়ারত মুসলিমদের ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আল্লাহর প্রিয় হাবীব।
কাজী শামছুদ্দিন : শিক্ষার্থী, আল-আযহার ইউনিভার্সিটি, মিশর।








