মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৪

ইসলামে খেলাধুলার গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা

মুহা. আবু বকর বিন ফারুক
ইসলামে খেলাধুলার গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা

মানুষের জীবন শুধু ইবাদতকেন্দ্রিক নয়, বরং ইবাদতের পাশাপাশি দৈনন্দিন প্রয়োজন, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলাম মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দ্বীন। মানুষ যেমন কাজ করে ক্লান্ত হয়, তেমনি বিনোদন ও বিশ্রামেরও প্রয়োজন অনুভব করে। এই প্রেক্ষাপটে খেলাধুলা মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। ইসলাম খেলাধুলাকে অস্বীকার করেনি, বরং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রেখে এর গুরুত্ব স্বীকার করেছে এবং কিছু নীতিমালা নির্ধারণ করেছে।

খেলাধুলা ও শারীরিক সুস্থতা

ইসলাম সুস্থ শরীরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কারণ সুস্থ শরীর ছাড়া ইবাদত, কর্মসংস্থান, পরিবার পরিচালনা এবং সমাজের দায়িত্ব পালন করা কঠিন। কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর আমানত বহনকারী, আর এই আমানতের অন্যতম অংশ হলো দেহ। দেহকে সুস্থ রাখা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। খেলাধুলা শরীরচর্চার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। দৌড়, সাঁতার, কুস্তি, বল খেলা ইত্যাদির মাধ্যমে শরীর সবল হয়, অলসতা দূর হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শারীরিক শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং শক্তিশালী মুমিনকে দুর্বল মুমিনের তুলনায় উত্তম বলেছেন। এটি স্পষ্ট করে যে, শারীরিক সক্ষমতা ইসলামী দৃষ্টিতে কাম্য। খেলাধুলা ইসলামের পরিপন্থী নয়, বরং তা সুন্নাহসম্মত বিনোদন ও শরীরচর্চার অন্তর্ভুক্ত।

মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক উপকারিতা

খেলাধুলা শুধু শরীরের জন্যে নয়, মন ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় কাজ, পড়াশোনা বা চিন্তায় ব্যস্ত থাকলে মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা এই ক্লান্তি দূর করে, মনকে প্রফুল্ল করে এবং হতাশা কমায়। এছাড়া খেলাধুলা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। দলগত খেলায় সহযোগিতা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ তৈরি হয়। শিশু ও কিশোরদের চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম। তারা খেলাধুলার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আত্মসংযম শিখে। ইসলাম যেহেতু চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দেয়, তাই এই দিক থেকেও খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

আত্মরক্ষা ও উম্মাহর শক্তি

ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট খেলাধুলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছেÑযেমন সাঁতার, তীরন্দাজি ও ঘোড়সওয়ারি। এগুলো শুধু বিনোদন নয়, বরং আত্মরক্ষা, যুদ্ধপ্রস্তুতি ও উম্মাহর শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন মুসলমান শারীরিকভাবে দুর্বল হলে সে নিজেকে, তার পরিবারকে এবং সমাজকে রক্ষা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাই খেলাধুলার মাধ্যমে শক্তি অর্জন ইসলামের একটি বাস্তবসম্মত শিক্ষা।

খেলাধুলার সীমাবদ্ধতা ও শর্তাবলি

যদিও ইসলাম খেলাধুলাকে বৈধ ও উপকারী বলে স্বীকার করেছে, তবে তা সম্পূর্ণ স্বাধীন বা সীমাহীন নয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, খেলাধুলা কখনোই ফরজ ইবাদত ও দায়িত্ব থেকে গাফেল করার কারণ হতে পারে না। নামাজ, রোজা, পিতা-মাতার হক, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব উপেক্ষা করে খেলাধুলায় মগ্ন থাকা ইসলামসম্মত নয়। খেলাধুলা হবে জীবনের সহায়ক, জীবনের লক্ষ্য নয়। দ্বিতীয়ত, খেলাধুলায় অশালীনতা ও নৈতিক অবক্ষয় থাকা চলবে না। বর্তমান যুগে অনেক খেলাধুলা এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যেখানে বেপর্দা, অশালীন পোশাক, অনৈতিক আচরণ ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দেখা যায়। এসব বিষয় ইসলামের লজ্জাশীলতা ও শালীনতার নীতির পরিপন্থী। তৃতীয়ত, খেলাধুলার নামে জুয়া সম্পূর্ণ হারাম। বাজি ধরা, অর্থের বিনিময়ে হার-জিত নির্ধারণ করা বা অন্যের ক্ষতির ওপর নিজের লাভ প্রতিষ্ঠা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দুঃখজনকভাবে আজ অনেক খেলাই জুয়ায় পরিণত হয়েছে, যা খেলাধুলার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ধ্বংস করে দেয়। চতুর্থত, খেলাধুলা যেন অহংকার, শত্রুতা ও হিংসার জন্ম না দেয়। খেলায় জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। কিন্তু হার-জিতকে কেন্দ্র করে গালিগালাজ, মারামারি, প্রতিহিংসা বা বিভেদ সৃষ্টি হলে তা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের পরিপন্থী হয়ে যায়। পঞ্চমত, খেলাধুলায় অতিরিক্ত আসক্তি ও সময়ের অপচয় পরিহার করতে হবে। রাত জেগে খেলা, পড়াশোনা ও কাজ বাদ দিয়ে খেলায় ডুবে থাকা একজন মুসলমানের দায়িত্বশীল জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময় আল্লাহর বড়ো নিয়ামত; এর অপচয় সম্পর্কে ইসলামে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

পরিশেষে বলবো, ইসলামে খেলাধুলা একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধীন। এটি না পুরোপুরি নিষিদ্ধ, না সীমাহীনভাবে অনুমোদিত। শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি, আত্মরক্ষা ও সামাজিক উন্নতির জন্য খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা হতে হবে ইবাদত, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের পরিপন্থী নয়। একজন সচেতন মুসলমান খেলাধুলাকে গ্রহণ করবে সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যম হিসেবে, গাফিলতি, জুয়া ও অনৈতিকতার পথে নয়। ইসলামের এই মধ্যপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রমাণ করেÑইসলাম বাস্তবসম্মত, মানবিক ও কল্যাণমুখী একটি জীবনব্যবস্থা।

লেখক : পরিচালক, দারুসসুন্নাত বিসমিল্লাহ মডেল মাদ্রাসা; মনোহরখাদী, বিষ্ণুপুর, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়