রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩০

অবিনাশী একুশ : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও মেঘনা পাড়ের দ্রোহ

ভাষার অধিকার থেকে গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা-একুশের শাশ্বত শিক্ষা

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
ভাষার অধিকার থেকে গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা-একুশের শাশ্বত শিক্ষা

২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-এটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিনাশী চেতনার নাম। এই দিনটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে হয়, কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষায় বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। ঢাকার রাজপথে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরের বুকের রক্ত শুধু একটি দাবি প্রতিষ্ঠা করেনি, তা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়—ভাষাই মানুষের অস্তিত্ব, আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। ভাষাকে অস্বীকার করা মানেই একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করা। সে কারণেই একুশ ছিলো শুধু ভাষার আন্দোলন নয়, এটি ছিলো শোষণ, বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত গণপ্রতিরোধ।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো মর্যাদা নেই। করাচি থেকে দম্ভভরে ঘোষণা দেওয়া হয়—‘উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। অথচ রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিলো বাংলাভাষী। এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়, ছিলো গভীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বহিঃপ্রকাশ।

এই ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজ ১৯৪৮ সাল থেকেই আন্দোলনে নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা শহর ও মফস্বলে। ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে। ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও ছাত্ররা রাজপথে নামে। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। তরুণ ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। পাকিস্তানি রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে—ভাষার প্রশ্নে বাঙালি আপসহীন।

ঢাকার সেই রক্তঝরা ঘটনার ঢেউ দ্রুতই আছড়ে পড়ে মেঘনা পাড়ের তৎকালীন মহকুমা শহর চাঁদপুরে। ২১শে ফেব্রুয়ারির বিকেলেই খবর পৌঁছে যায় এই জনপদে। পরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি পালবাজার এলাকা থেকে বের হয় বিশাল বিক্ষোভ মিছিল। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, আদালতের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তৎকালীন মহকুমা শহরগুলোর মধ্যে চাঁদপুরের এই প্রতিবাদ ছিলো সংগঠিত ও ব্যাপকরূপে।

চাঁদপুরে ভাষা আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া ছিলো না, এটি ছিলো সুপরিকল্পিত ও নেতৃত্বনির্ভর। ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে এ.টি.এম. সামসুল হক, ডা. এম. এ. গফুর, বিমলাংশু রায়, শাহ আমান উল্লাহ, সুজাত আলী মুন্সী ও আবুল কাশেম চৌধুরীর মতো নেতারা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দেন। তাঁদের অনেকেই গ্রেপ্তার ও কারাবরণের শিকার হন। তবু আন্দোলনের গতি থামেনি, বরং তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

চাঁদপুর কলেজ এবং হাসান আলী হাই স্কুল ছিলো চাঁদপুরের ভাষা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই কর্মসূচি নির্ধারণ, লিফলেট বিতরণ, গোপন বৈঠক এবং ছাত্রসমাবেশ পরিচালিত হতো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শিক্ষার কেন্দ্র ছিলো না, এগুলো পরিণত হয়েছিলো প্রতিবাদের দুর্গে।

চাঁদপুরের ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চাঁদপুর শহরের মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা মিছিলে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের নজর এড়িয়ে বার্তা বহন ও সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের এই ভূমিকা প্রমাণ করে—একুশ ছিলো সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই যুক্ত ছিলেন।

টানা আন্দোলনের ফল হিসেবে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। এই অর্জনের পেছনে ঢাকা ছাড়াও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলা শহরের অব্যাহত প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি ছিলো একটি বড়ো রাজনৈতিক বিজয়, কিন্তু এটি ছিলো কেবল শুরু। একুশের চেতনা থেকেই পরবর্তীতে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়। ইতিহাসের এই সরল রেখায় একুশই প্রথম ও সবচেয়ে দৃঢ় বিন্দু।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর টঘঊঝঈঙ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ বিশ্বের ১৯৩টি দেশে এই দিনটি ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার অধিকারের প্রতীক হিসেবে পালিত হচ্ছে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষের জন্যে এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বাঙালি জাতির ভাষার জন্যে আত্মত্যাগ আজ বিশ্বব্যাপী অধিকার আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।

একুশ আমাদের একটি চিরন্তন শিক্ষা দিয়ে গেছে—মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থাকতে হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার যে সংগ্রাম আজও চলমান, তার নৈতিক ভিত্তি একুশেই নিহিত। আজ যখন নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন একুশ আমাদের বিবেকের আয়না হয়ে দাঁড়ায়।

একুশ কোনো আনুষ্ঠানিক শোক পালনের দিন নয়। এটি শক্তির উৎস, আত্মমর্যাদার শপথ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্ত্র নয়, প্রয়োজন দৃঢ় বিশ্বাস, ঐক্য ও নৈতিক সাহস। একুশ মানেই মাথা নত না করার শিক্ষা।

শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়