প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৮
একুশ আমাদের আত্মমর্যাদার স্মারক

ভাষার আবিষ্কার মানুষের জীবনে সবচেয়ে সেরা আবিষ্কার। মুখে ভাষা না থাকলে মানুষের এতো সহজ ও সভ্য হওয়ার সুযোগ ছিলো না। মুখে ভাষা আছে বলেই মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে শুনতে পায়, হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। ভাষাহীন মানুষের কথা আজকাল কল্পনা করাও দুরূহ। এক এক ভাষা এক এক সংস্কৃতির ধারক ও পরিচায়ক। তেমনি আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ভাষা হলো সতত প্রবহমান নদীর মতোই বাঙ্ময়। কোনো জাতিকে দুর্বল করতে হলে আগে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে হয়। তেইশ বছর ধরে বাঙালিকে শোষণ ও অত্যাচারে নিপীড়িত করে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চেয়েছিলো আমাদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখতে। তারই প্রথম পদক্ষেপ হলো আমাদের মুখের ভাষা তথা মায়ের ভাষার সম্মান কেড়ে নেওয়া,আমাদেরকে শাশ্বত বাঙালিয়ানা হতে দূরে রাখা। ঊনিশশো সাতচল্লিশে বৃটিশের শাসন হতে মুক্তি পেয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাক-ভারত সৃষ্টি হওয়ার একবছরের মাথায় উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা শুরু হলো। অথচ তখন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ছাপ্পান্ন শতাংশের মাতৃভাষা ছিলো বাংলা। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঊনিশশো আটচল্লিশের আন্দোলন পূর্ণতা পায় ঊনিশশো বাহান্নে। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠে মাতৃভাষা দিবস। একুশের মহান শহীদদের সেই পুণ্য বলিদানে আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেয়ে ধন্য হয়েছি। শুধু তাই নয়, ঊনিশশো নিরানব্বই সালের পর আমাদের মহান একুশে পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান। এ আমাদের জন্যে বিরল পাওয়া। আজ মহান একুশের ভোরে দাঁড়িয়ে সেইসব বীর ভাষা শহীদদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই। তাঁরাই আমাদের শিখিয়ে গেছেন, একুশ মানে মাথা নত না করা।
ভাষা আন্দোলনের চুয়াত্তর বছর পার করে আজ আমরা নতুন এক ভোরে উপনীত। গত দেড় বছরের অস্থির সময়কে পার করে স্বস্তির এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের গণতন্ত্র। মবের শিকার হয়ে গত দেড় বছর দেশটা কার্যত কোমায় ছিলো বলা যায়। আজ নতুন সরকারের আমলে একুশের চেতনাকে আরও শাণিত ও প্রাণিত করে বিকশিত করার অভিপ্রায় আমাদের সকলের। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও মর্যাদা যেমন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব আছে তেমনি বাংলা ভাষার ইতরীকরণকেও ঠেকানোর প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচারিত নাটকে ভাষার প্রমিত ব্যবহারের প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা লক্ষণীয়। কথায় কথায় ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যেটার প্রমিত ও উপযুক্ত বাংলা আছে সেটাকে ইচ্ছে করেই বাংলা-ইংরেজি বা বাংলা-হিন্দি/উর্দু মিলিয়ে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে ভাষা নিজে যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি নষ্ট হচ্ছে আজকের প্রজন্ম। চাচা-মামাকে আংকেল না ডাকলে আজ ভাত হজম হয় না অনেকের। রোমান হরফে বাংলা লিখে বাংলার মান-মর্যাদা সবই নষ্ট করা হচ্ছে। এ ধারা বেশিদিন চলতে দেওয়া যায় না। আমেরিকা-রাশিয়ার লোকেরা বলতে পারলেও সজ্ঞানে তারা বিদেশি ভাষা বর্জন করে এবং নিজেদের ভাষাকে প্রচার করার সুযোগ নেয়। আর আমরা সুযোগ পেলেই ইংরেজি ফুটাই, হিন্দি-উর্দুর মিশেল বানাই। আমাদের সংস্কৃতিকে অপমানকারী এসব চর্চাকে দূরে ঠেলে প্রমিত ভাষার চর্চাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবেই আমরা শাশ্বত বাঙালি হয়ে উঠতে পারবো। এটা ভুললে চলবে না, একুশ আমাদের আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি, একুশ আমাদের আত্মমর্যাদার স্বাক্ষর।
সবাইকে মহান একুশের শুভেচ্ছা। একুশ আমাদের শোণিতে বহমান থাক অনন্তকাল।





