রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪২

বরফের অভিমান

ড. আব্দুস সাত্তার
বরফের অভিমান

তুষারঝড় থেমে গেছে অনেক দিন। বাড়ির আঙ্গিনায় বরফ জমে আছে স্তব্ধ হয়ে সাদা, নির্বাক, অবিচল। হালকা রোদ পড়েছে তার গায়ে, বাতাসও বইছে নরম করে, তবু বরফগুলো গলতে চায় না। যেন ইচ্ছা করেই জমে আছে। প্রকৃতির সঙ্গে তার অভিমান। প্রকৃতি চায় সে জল হয়ে মিশে যাক, বাষ্প হয়ে উড়ে যাকÑনিয়মের মতো। কিন্তু বরফের মন সায় দেয় না। প্রকৃতি থেকে জন্ম নিয়ে আবার প্রকৃতিতেই মিশে যাওয়া তার কাছে আজ মনবিরুদ্ধ। কারণ সে মানুষের প্রেমে পড়ে গেছে।

সে চায় না হারিয়ে যেতে। সে চায় এই আঙিনায়, এই আলোছায়ার ভেতর, নিজের মতো করেই জমে থাকতে। হ্যাঁ, কিছুটা গলছে সেÑরোদের ছোঁয়ায়, বাতাসের আদরে। ছোট ছোট জলবিন্দু হয়ে মাটিতে মিশছে। কিন্তু সবটা নয়। বাকিটা সে শক্ত করেই ধরে রেখেছে নিজেকে। তার মনে হয়, পুরোপুরি গলে গেলে তার অস্তিত্ব, তার অনুভবÑসব মুছে যাবে। মানুষের প্রেম তাকে শিখিয়েছে, কিছু অনুভূতি মুছে ফেলাই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।

এই আঙিনার পাশের ঘরটায় একজন মানুষ থাকে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে প্রতিদিন বরফের দিকে তাকায়। তার চোখেও একরকম জমাট ভাব। সে তার হারানো প্রেমিকার কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে আছে। সেই কষ্টটাও বরফের মতোÑশক্ত, ঠান্ডা, নড়াচড়াহীন। কেউ জানে না, সে কষ্ট কত গভীরে জমে আছে।

সে মানুষটি সমাজে মিশে যায়, সংসারের দায়িত্ব পালন করে, মানুষের সঙ্গে হাসে-কথা বলে। চারপাশের উষ্ণতায় তার বুকের বরফ কিছুটা নরম হয়। বন্ধুর হাসি, পরিবারের ব্যস্ততা, দৈনন্দিন জীবনের চাপÑসব মিলিয়ে কষ্টটা একটু হালকা লাগে। কিন্তু একেবারে যায় না। যেমন আঙিনার বরফ হালকা রোদে একটু গলে, কিন্তু পুরোটা নয়। বরফ গলা জলের মতোই যেন মানুষটার দুফোটা চোখের নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। ব্যস্ততার শুকনো রুমালে মুছেই যেন তবু চলতে হয় প্রতিদিন প্রতিক্ষণ।

রাতে ঘরে ফিরে সে বোঝে, এই কষ্টগুলো এখন তার আপন। একসময় সে এগুলো দূরে সরাতে চেয়েছিল। ভেবেছিল, ভুলে গেলে বাঁচা সহজ হবে। কিন্তু পারেনি। ধীরে ধীরে সে শিখেছেÑসব কষ্ট ভুলে যেতে নেই। কিছু কষ্ট মানুষকে মানুষ করে রাখে।

আঙিনার বরফ আর মানুষের বুকের বরফÑদুজনেই টিকে আছে নিজেদের মতো করে। প্রকৃতি, সমাজ, সময়Ñসবাই চায় তারা গলে যাক, বদলে যাক। কিন্তু তারা জানে, সম্পূর্ণ গলে গেলে আর তারা থাকবে না।

ভোরের আলো বাড়ে। বরফ একটু একটু করে জল ছাড়ে। মানুষটি জানালা বন্ধ করে কাজে বেরিয়ে যায়। কেউ কাউকে কিছু বলে না। তবু তারা বোঝেÑসব অনুভূতি মুছে যাওয়ার জন্য নয়। কিছু অনুভূতি জমে থাকাই বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ।

ড. আব্দুস সাত্তার : লেখক ও সাংবাদিক, ওয়াশিংটন ডিসি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়