প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ১১:২৪
কেন প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন...

শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক পরিবর্তন এবং নৈতিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যতো উন্নত, সে দেশ ততো উন্নত। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্যে নয়, জাতীয় উন্নয়নের জন্যেও অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান উপাদান। Human Capital Theory অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটে, গবেষণা বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্য কমে ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তাই শিক্ষার উন্নয়ন মানেই জাতীয় উন্নয়ন।
বাংলাদেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রমাণ করে শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয় নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষার মানের অবনতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং নির্ভরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি, দক্ষতার অভাব—এসব সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর জন্যে একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের জন্যে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন অত্যন্ত জরুরি। এই কমিশন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করবে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের সাথে তাল রেখে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও দক্ষতায় এগিয়ে নিতে যদি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনই পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বড়ো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে। এখানে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অপরাধ বাড়বে ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেমে যাবে। অতএব, যতো দ্রুত সম্ভব একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে এ সকল সমস্যার সমাধান ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও যুগোপযোগী ‘স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন' গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ক'টি স্তরে বিভক্ত, যেগুলো হলো প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন UNESCO, UNICEF এবং World Bank-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেলেও মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ব্যর্থতাগুলো অন্বেষণ করলে দেখা যায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোটাই মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে পরবর্তী জীবনে। Bangladesh Bureau of Statistics-এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। এর কারণ হলো, শিক্ষা ব্যবস্থা
দক্ষতাভিত্তিক নয়। শিক্ষার মানের অবনতির প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক, পুরোনো পাঠক্রম, গবেষণার অভাব, বড়ো ক্লাস, দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি ও কোচিং নির্ভর শিক্ষা হওয়ায় প্রকৃত শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। এছাড়াও আমাদের শিক্ষায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাই শিক্ষা কারিকুলামে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আলাদা সাবজেক্ট হিসেবে নৈতিক শিক্ষা (Moral Education) অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কথায় আছে 'কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাশঠাশ'। তাই খুব ছোট বেলা থেকে শিশুদের মধ্যে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে। অপরদিকে বাজেট বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাজেট আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম।
আবার কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানকার শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতার পেছনে ক'টি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব, শিক্ষা নীতির সঠিক বাস্তবায়নের অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, গবেষণার অভাব ও শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতি কাঠামোগতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট করেছে। উন্নত দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ যে সকল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাংলাদেশ অনুকরণ করছে, সেই দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে মুখস্থ শিক্ষা নেই। এসব শিক্ষা ব্যবস্থা গবেষণা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর। এসব দেশে রয়েছে উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বড়ো বাজেট। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড়ো পার্থক্য রয়েছে।
উপরোক্ত কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এতো বড়ো যে, ছোটখাট সংস্কার দিয়ে এ সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্যে জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন প্রয়োজন, যার কাঠামো গঠিত হবে শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, শিক্ষা উদ্যোক্তা, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষা প্রশাসক প্রমুখদের সমন্বয়ে। নবগঠিত শিক্ষা কমিশনের কাজ হবে—
শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ, দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি, পাঠক্রম সংস্কার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়, গবেষণা উন্নয়ন ও শিক্ষা নীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ।
শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ/শিক্ষা সংস্কারের নীতিমালা : আমার গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে শিক্ষা কমিশনের যে সকল কাজ করতে হবে : ১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু; ২. পাঠক্রম আধুনিকীকরণ (আইটি শিক্ষা, গবেষণা শিক্ষা, সমস্যা সমাধান শিক্ষা); ৩. কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ; ৪. উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ; ৫. শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি; ৬.বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি; ৭. একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন।
উপরোক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা : ১. শিক্ষা সংস্কার আইন প্রণয়ন; ২. নতুন পাঠক্রম চালু; ৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক; ৪. কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ; ৫. গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি; ৬. শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত; ৭. শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি।
উপসংহার : বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার মান উন্নত হয়নি। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না, গবেষণা কার্যক্রম সীমিত, যে পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের জন্যে একটি বড়ো বাধা।
এই সমস্যা সমাধানের জন্যে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং
বিশেষজ্ঞভিত্তিক ‘স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন’ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশনই পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে। একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশনই পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে এবং একটি দক্ষ, শিক্ষিত, নৈতিক ও উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে।
রেফারেন্স ;
১. UNESCO–Global Education Report
২. UNICEF– Bangladesh Education Report
৩. World Bank– Education Sector Review
৪. Bangladesh Bureau of Statistics– Labour Force Survey
৫. BANBEIS– Education Statistics Report
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট ও পরিচালক, পরিচালনা পর্ষদ, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।





