প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯
ধারাবাহিক স্মৃতিকথা
বড়বেলার স্কুলজীবন হীরামনি

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকলাম। খুব সুন্দর পরিবেশ। একজন কৃষি প্রকৌশলী আমাদেরকে ঘুরে ঘুরে মিউজিয়াম দেখাচ্ছেন আর বর্ণনা দিচ্ছেন সব উপকরণ ও সেইসব উপকরণের ব্যবহার পদ্ধতি। কোরিয়া কিভাবে তাদের কৃষিতে ব্যপকভাবে উন্নতি সাধন করেছে সেই সম্পর্কে একটি ভিডিও দেখতে পেলাম। মিউজিয়ামের বিশাল রুমটিতে ঢুকে মনে হলো ঠিক একই রকম রুমে আগেও আমি প্রবেশ করেছি। মনে পড়লো ঠিকঠাক। সেজং সিটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে যে হল করা হয়েছে, সেজং অ্যাডভার্টাইজিং হল, সেই হল আর এই বিশাল রুমের প্রবেশপথ ও শুরুর দিকে বেশ খাণিকটা জায়গা একই আদলে করা। এসব দেখছি আর নৃ-র কথা মনে পড়ছে। মনোযোগ হারাচ্ছি নিজের কাজে। হুমায়ুন আহমেদ-এর একটি গল্পের বইয়ে পড়েছিলাম “প্রেমে পড়া অতি তুচ্ছ ও স্বাভাবিক একটি জৈবিক বিষয়”। মনে হলো আমি এই অতি তুচ্ছ বিষয়টির কবলে পড়ে গেলাম না ত। জীবনে তঁার সাথে আবার কখনো দেখা হবে কী না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে দেখা না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এসব যখন ভাবছি তখন মিউজিয়াম ঘুরা প্রায় অর্ধেক শেষ। তবে মাথায় এসব বিষয় ঘুরপাক খাওয়ায় ভালো করে সব কিছু উপভোগ করতে পারছিলাম না। যাই হউক মিউজিয়ামে মনোযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করলাম। অতি আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ১৭০০ বছর আগের পুরনো কিছু যন্ত্রপাতিও দেখতে পেলাম। খেয়াল করে দেখলাম কিছু ধানের চারা রাখা আছে, এগুলো প্লাস্টিকের, কিন্তু এগুলো যে নকল বুঝা প্রায় অসম্ভব। আমি খুব তীক্ষ্ণভাবে সব দেখছি, বেশ ভালো লাগছে। হঠাৎ করে দেখলাম ফুলের মতো কিছু একটা জিনিস। দারুণ সুন্দর। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম এগুলো পাটের তৈরি জুতা। জুতাকেও এমন ফুলের মতো করে নান্দনিকতার সাথে সাজিয়ে রাখা যায় না দেখলে বিশ্বাস হতো না আমার। আরেকটা জিনিস প্রায় সব ধরনের জায়গায় দেখা যায় সেটা হলো ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা ফিঙ্ড করে রাখা। ক্যামেরার সামনে গিয়ে দঁাড়ালে ছবি উঠে যায়, সেই ছবির আবার প্রিন্ট কপিও সাথে সাথে পাওয়া যায়। এখানেও ক্যামেরা রাখা। ছবি তুললাম। সেই ছবি অবশ্য প্রিন্ট করে নিই নি তবে পাশের রুমে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখে বেশ ভালো লাগলো। মিউজিয়াম ঘুরা শেষ। এবার আমাদের এক ঘন্টা সময় দেয়া হলো, ফ্রি টাইম। এই সময়ে নিজে নিজে ঘুরে দেখা যাবে, কফি খাওয়া যাবে, নিজেদের ফোন ক্যামেরায় ছবি তোলা যাবে ইত্যাদি।
আমি কফির স্মেল খুব পছন্দ করি কিন্তু কফি খেতে ভালো লাগে না আমার। ভ্যালেন্টিনা বললো, চলো কফি খেয়ে আসি। আমিও ভাবলাম, যাওয়া যাক। এরই মধ্যে মনে হলো কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। এদিক ওদিক তাকালাম। আমি ঠিক শুনেছি, নুয়েলা আমার নাম ধরে ডাকছে। নুয়েলার দেশ উগান্ডা। ও আমাকে এতো সুন্দর করে হীররা বলে ডাকে, আমার দারুণ লাগে। তবে বেশিরভাগ সময় সেঙ্ িহীররা ডাকে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন ডাকছো? সে বললো, আমার সাথে ছবি তোলার জন্য অন্যরা অপেক্ষা করছে। আমরা সবাই একসাথে ছবি তুললাম। কিন্তু গ্রুপের একজন জিজ্ঞেস করলো আমাকে অন্যদিনের মতো হাস্যোজ্জ্বল লাগছে না। আমি বললাম, ঠিক বলেছো, আজ আমার মন ভালো না। কিছু ভালো লাগছে না। এলেঙ্ আমার স্প্যানিশ বন্ধু আমাদের কথোপকথন শুনেছে। মনে হলো এই কথা শোনার পর থেকে সে আমার যত্ন নিচ্ছে, তবে আমাকে বুঝতে দিচ্ছে না।
ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল মিউজিয়াম অব কোরিয়া-র একটা অংশে পোকামাকড় সংগ্রহশালা বা ইনসেক্টারিয়াম আছে। এটি একটি জাদুঘর বা প্রদর্শনী কেন্দ্র যেখানে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়কে সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রদর্শন করা হয়। এটি একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, যেখানে পোকামাকড়ের জীববৈচিত্র্য, আচরণ, জীবনচক্র এবং পরিবেশে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাওয়া যায়। ওটা দুতলায়। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দুতলায় উঠে গেলাম। ছোটো ছোটো বাচ্চারা পোকাগুলোয় হাত বুলাচ্ছে। আমি কখনো এরকম পোকায় হাত দিই নি। ভয় লাগে নাকি ঘিন্না লাগে ঠিক বুঝতে পারি না। প্রজাপতিও আছে। একটা রুমে পুরো তিন ওয়াল জুড়ে পোকামাকড়ের বিভিন্ন ভিডিও দেখার অসাধারণ ব্যবস্থা। প্রকৃতির বিভিন্ন জায়গায় পোকামাকড় কিভাবে অবস্থান করে তার অসাধারণ সুন্দর মনোরম ভিডিও দেখে বেশ ভালো লাগছিলো। মনে হলো নুয়েলাকে কে ডেকে নিয়ে আসি। ও নিচতলায় বাগানে একটি বেঞ্চে বসা। ভাবলাম ওকে ডেকে এনে পোকামাকড় দেখাই। ও আসলো, একসাথে আবার সব দেখলাম, আমাকে একটা পোকায় হাত দেয়ার সাহসও দিলো। নুয়েলাও আমার মতো একজন মা। ওর তিনটি ছেলে আছে, আমার যেমন আছে দুটি মেয়ে। আমরা একসাথে কফি খেতে গেলাম। দুইটা কফির অর্ডার করলাম। বিল দেয়ার জন্য আমাদের দুইজনের কার্ড বের করলাম, কাউন্টারে থাকা ভদ্রমহিলা আমার কার্ডটি গ্রহণ করলেন ও ওখান থেকে বিল পরিশোধ করার ব্যবস্থা করলেন। একসাথে কফি খাচ্ছি আর জীবনের নানা বিষয়াদি নিয়ে গল্প করছি। আমি কথা বলতে গেলে আমার বাচ্চা আর স্বামীর কথা না চাইতেও বলে ফেলি। মাঝে মাঝে অস্বস্তি লাগে। মানুষজন বিরক্ত হচ্ছে কী না এই ভেবে। কফি খাওয়া শেষ আর এদিকে কেডিআই স্কুলে ফেরত আসার জন্য আমাদের বাসেরও সময় হয়ে গেছে।
মিউজিয়াম থেকে বাসের দিকে যাচ্ছি। যেতে যেতে খুব সুন্দর একটা জায়গা চোখে পড়লো। গরুর গাড়ি দেখে চলে গেলাম ছবি তুলতে। সবার শেষে গিয়ে উঠলাম বাসে। বাসে উঠে দেখি আমার পাশের সীটে বসে আছে ফেইথ। আমার ভালো বন্ধু সে। তার নামটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। আর সত্যিই সে বিশ্বাসযোগ্য। সে আগে অন্য সীটে বসেছিলো। আমার পাশে এসে বসেছে গান শোনার জন্য। আমি অনেক গান শুনি এটা সে জানে। আমরা একসাথে গান শুনতে শুনতে আর গল্প করতে করতে স্কুলের দিকে ফিরছি। এর মধ্যে আবার দুইজনেই মোবাইলে বই এর পি ডরমিটরি এসিস্ট্যান্ট ফ পড়া শুরু করলাম। বই পড়ছি আর বাসের জানালা দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে স্কুলে পেঁৗছে গেলাম। স্কুল থেকে আমাদেরকে ডিনার বক্স দিলো। কিন্তু রাতে কিছু খেতে ইচ্ছে করে নি। তাই আমার আরেক বন্ধু গ্লোরিয়াকে কল করে বললাম ডাইনিং এ আসো, একসাথে খাই। সে আসলো, দুজনে মিলে খেলাম।
কেডিআইএস ইয়োগা ক্লাব-এ ইয়োগা করার অভিজ্ঞতা আমার জন্য এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের মতো। বন্ধুদের সাথে যখন আমি প্রথমবারের মতো সেশনে যোগ দিয়েছিলাম, আমার শরীর এবং মনের মধ্যে এক অদ্ভুত মিলন ঘটতে শুরু করেছিলো। আমাদের ইন্সট্রাক্টর, স্মার্ট মেয়ে বার্নাডেট। ওর দেশ মালাওয়ি। অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং প্রশিক্ষণে নিপুণ একটি মেয়ে। তার নির্দেশনায় আমরা বিভিন্ন যোগাসন অভ্যাস করছি, এবং প্রতিটি মুহূর্তে তার শান্ত এবং উৎসাহব্যঞ্জক কথা আমাদের আরও ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করছে। ইয়োগা পজিশনগুলো কিছুটা কঠিন মনে হলেও, একে অপরকে উৎসাহিত করে আমরা সবাই তা পার করতে শুরু করি। আমি লক্ষ্য করলাম, ইয়োগার মাধ্যমে শুধু শরীরের শক্তি বাড়ানো নয়, বরং মানসিক প্রশান্তি এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির সঞ্চয়ও ঘটছিল। আমাদের ক্লাবের বন্ধুরা একে অপরকে সাহায্য করার দরুণ আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়েছে। আমি বার্নাডেটকে বাংলাদেশ থেকে আনা একটি বিশেষ গয়না উপহার হিসেবে দিলাম। এটি ছিল আমার ছোট্ট উপহার, যার মাধ্যমে আমি তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম। তার মুখে হাসি দেখে, আমি বুঝতে পারলাম, তার জন্য উপহারটি একদম ঠিকঠাক ছিল। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে তুলেছিল এবং ইয়োগার মাধ্যমে শিখেছি, শুধু শরীরকে শক্তিশালী করা নয়, মনকে শান্ত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেজং-এর আকাশে ঝলমলে রোদ। রোদ আমার মনকে চনমনে করে তুলে। হরিণীর মতো সচকিত করে রাখে। জানালা বন্ধ, কিন্তু সোনালী আলোতে ঘর ঝকমক করছে। জানালায় পর্দা হিসেবে ব্লাইন্ড এবং ট্রান্সপারেন্ট এই দুটির অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। তাই রোদের আলোটা অসম্ভব ভালো লেগেছে। প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছি। ভাবছি কী কী করা যায়! আমরা মানুষজন অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, ব্যবসা থেকে ছুটি নিই বেড়াতে যাওয়ার জন্য। নিজের ঘরে একান্তভাবে সময় কাটানোর জন্য কয়জন ছুটি নিই! আমার মাঝে মাঝে নিজের ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছে করে, যে ঘর সুখ দুঃখ, হাসি আনন্দ সব সময়ে চুপচাপ সব কিছু অনুভব করার ও সব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জায়গা করে দেয় অনায়াসে। আজ মনে হচ্ছে কোথাও যাবো না। রোদ ঝলমলে সোনা সোনা রোদ মাখা ঘরটায় বসে থাকবো। তবে লাইব্রেরি থেকে তিনটা বই এনেছিলাম, এগুলো ফেরত দিতে হবে, যদিও আগামী পরশুদিন দিলেও চলবে। তবে ধারে নেয়া যেকোনো জিনিস আমার মাথায় ভীষণ চাপ সৃষ্টি করে।
আমার কোরিয়ান বন্ধু হেজং আমাকে নিয়ে এসেছে “দ্য প্লেজার” নামক কফি শপে। দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং সিটির একটি আধুনিক আর্কিটেকচারাল বিস্ময়, যা এর উচ্চতা এবং আভিজাত্যের কারণে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ৪৯ তলা বিশিষ্ট এই ভবনটি মূলত ব্যবসায়িক এবং বিনোদনমূলক কাজের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ভবনটি সেজং সিটির অন্যতম উঁচু স্থাপত্যকীর্তি এবং এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দনভাবে নির্মিত। এই ভবনের উচ্চতা এবং নকশা এমনভাবে পরিকল্পিত, যা ভবনের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে এক সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করে। ভবনের উপরের তলাগুলো থেকে সেজং সিটির চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়, যা দিনের আলো কিংবা রাতের আলোকিত পরিবেশে অসাধারণ দেখায়। দ্য প্লেজার নামটির অন্তর্নিহিত ধারণাটি ভবনের ভেতরের অত্যাধুনিক সুবিধাসমূহ এবং বিলাসিতার প্রতিফলন। এখানে কনফারেন্স হল, অফিস স্পেস, বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট, রিটেইল শপ এবং বিশ্বমানের কফি স্টোর রয়েছে। বিশেষ করে ভবনের কফি স্টোরগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়, যেখানে দর্শনার্থীরা বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সেজং সিটির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। কফি স্টোরগুলো শুধু গুণগত মানসম্পন্ন কফির জন্য নয়, বরং এর প্রশান্ত পরিবেশ এবং আধুনিক ইন্টেরিয়রের জন্যও প্রশংসিত। এখানে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক কফি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরণের পানীয় এবং খাবারের অপশন পাওয়া যায়, যা ভবনে আসা দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে আরও স্মরণীয় করে তোলে। একটি সেমিস্টার শেষ করে নতুন সেমিস্টার শুরু করতে যাচ্ছি, এই আনন্দ আমরা কফি খেয়ে উদযাপন করলাম। আমাকে ট্রিট দিলো হেজং।
কেডিআই স্কুলে লাইব্রেরির সাথে নামাজ পড়ার জন্য ছোটো আকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য পার্টিশন। ছেলে মেয়ে মিলে একসাথে ২০ জন নামাজ আদায় করতে পারে। টুপি, জায়নামাজ, হিজাব, লংস্কার্ট, আতর, তজবি সব রাখা আছে। আজ শুক্রবার। ভেবেছিলাম নামাজ পড়তে যাবো। কিন্তু ঋতুচক্রের কারণে নামাজ পড়তে যাওয়া হলো না। ভাবছি রুমে বসে একটা ম্যুভি দেখবো। আবার চাইলে স্কুলের স্টুডেন্ট লাউঞ্জ এও চলে যাওয়া যেতে পারে। স্টুডেন্ট লাউঞ্জ এ আরামদায়ক সোফায় শুয়ে শুয়ে বিশাল টিভি স্ক্রিনে ম্যুভি দেখা যায়। তবে এখন না, সন্ধ্যায় যাবো ম্যুভি দেখতে।
হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।
(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)








