প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৪১
দু বছর ধরে নিস্তব্ধ ঐতিহ্যবাহী রকেট স্টিমার অফিস
হারিয়ে গেছে শতবর্ষের নৌভ্রমণের রোমাঞ্চ, ফিরবে কি সেই দিন?

এক সময় চাঁদপুর নদীবন্দরের প্রাণ ছিলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী রকেট স্টিমার। ভারতের আসাম ও কলকাতার মধ্যে সংক্ষিপ্ত যাতায়াতে চাঁদপুর-গোয়ালন্দ রকেট স্টিমার সার্ভিস বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ পর্যন্ত বহাল ছিলো। তারপর অর্ধ শতাব্দী কালেরও বেশি সময় ধরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের কাছে রকেট স্টিমার সার্ভিস হয়ে ওঠে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও আরামদায়ক নৌভ্রমণের মাধ্যম। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে টানা দু বছর ধরে চাঁদপুর রুটে রকেট স্টিমারের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেনো থমকে গেছে।
|আরো খবর
একসময় এমভি বাঙালি, এমভি মধুমতী, পিএস মাসুদ, পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচসহ বিভিন্ন নামের স্টিমার চাঁদপুর হয়ে বরিশাল, ঝালকাঠি, কাউখালী, হুলারহাট, মোড়লগঞ্জ ও খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত চলাচল করতো। প্রতিদিন শত শত যাত্রী এই স্টিমারে ভ্রমণ করতো।
বিশেষ করে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের যাত্রীরা চাঁদপুরে নেমে ট্রেনে সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতো। স্টিমার ও রেলপথের সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো বহু মানুষের ভ্রমণের নির্ভরযোগ্য ভরসা।
রকেট স্টিমারে ভ্রমণ ছিলো শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়, এটি ছিলো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। বিস্তীর্ণ নদী, শীতল বাতাস, নদীর বুকে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, চরাঞ্চলের অপরূপ দৃশ্য আর স্টিমারের ধীরগতির ছন্দে প্রায় একশো মাইলের দীর্ঘ নদীপথে যাতায়াত ছিলো ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এক অনন্য আনন্দ। অনেকেই আজও সেই স্মৃতিময় যাত্রাকে নস্টালজিয়ার সঙ্গে স্মরণ করেন।
চাঁদপুর অঞ্চলের বিআইডব্লিউটিসির প্রান্তিক সহকারী ও ইনচার্জ মো. সোহানুর রহমান সোহান মুঠোফোনে জানান, পদ্মা সেতু হওয়ার পর এই রুটে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ে। ফলে ২০২৪ সাল থেকে চাঁদপুর রুটে রকেট স্টিমারের চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে চাঁদপুর রকেট স্টিমার ঘাটে বিআইডব্লিউটিসির অফিস চালু রয়েছে। সেখানে একজন প্রান্তিক সহকারী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তারা সরকারি অফিস, মালামাল এবং বিআইডব্লিউটিসির মালিকানাধীন জমিজমা ও স্থাপনা দেখভাল করছেন।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রীদের অনেকে মনে করেন, অন্তত চাঁদপুর-ঢাকা রুটে দিনে এক বা দুটি স্টিমার চালু করা গেলে যাত্রীদের জন্যে নিরাপদ, আরামদায়ক ও ঐতিহ্যবাহী নৌভ্রমণের একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের ঐতিহাসিক নৌঐতিহ্যও সংরক্ষিত থাকবে।
দু বছর ধরে বন্ধ থাকা চাঁদপুরের রকেট স্টিমার ঘাট আজও যেন অতীতের গৌরবময় দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর বুকে সেই পরিচিত স্টিমারের হুইসেল, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ধীরগতির যাত্রা ফিরে আসবে কি না—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চাঁদপুরবাসী ও নদীপথপ্রেমীদের মনে।








