শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৪, ০০:০০

স্মৃতিতে অম্লান

বিমল কান্তি দাশ
স্মৃতিতে অম্লান

৬২০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ব্যাবিলনের রাজা ছিলেন স¤্রাট দ্বিতীয় নেবুচাঁদ নেজার। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অবিবাহিত ছিলেন। প্রজাদের একান্ত ইচ্ছায় তিনি পারস্যের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের মেডিয়া নামক রাজ্যের রাজকুমারী আমিতিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যাবিলনের রাজধানী বাগদাদ তখন ছিলো মানবসভ্যতার তীর্থভূমি। সৃষ্টি তত্ত্বের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পুরুষ এবং প্রকৃতির প্রেম সত্যিই এক মহাজাগতিক বন্ধন, যা প্রাকৃতিক চুম্বকীয় আবেশকেও হার মানায়। যেমন রাজকুমারী আমিতিসের অপরূপ সৌন্দর্য-চুম্বকত্বে বিমোহিত হয়ে তৎকালীন পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্যবিদ (ঝপঁষঢ়ঃঁৎরংঃ)দের সমাহার ঘটায়ে প্রাণাধিক প্রিয় জীবন সঙ্গীর মনের প্রফুল্লতার জন্যে তৈরি করে ফেললেন ৭৫৪০০৪০০ আয়তনের একটি ঝুলন্ত বাগান, যা আজও ব্যাবিলনের অত্যাশ্চর্য ঝুলন্ত শূন্য উদ্যান নামে পরিচিত। সেই শূন্য উদ্যানে প্রতিদিন আট হাজার গ্যালন পানি ইউফ্রেটিস নদী থেকে রোজ পাম্প করে ওপরে তোলার পদ্ধতি আজও ডিজিটাল যুগের বিজ্ঞানীদের কাছে এক অপার বিস্ময় মাত্র (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৩ মে, ২০২৪)।

ভার্যা প্রেমে বিমোহিত এবং বিগলিত হয়ে ব্যাবিলন স¤্রাট নেবুচাঁদ নেজার যে এক অনুপম সুন্দর ভাস্কর্যে পঁচাত্তর ফুট উপরে সৃষ্ট ঝুলন্ত উদ্যানের মতো অলৌকিক স্থাপনা করেন, যুগ-যুগান্তর অবধি তাঁকে জনমনে অমর করে রাখবে। তাঁরই মতাদর্শে দীক্ষিত ভারতের মোগল স¤্রাট শাহজাহান তার হেরেমের অনুপম সুন্দরী আর্জুমান্দ বানুকে অন্দর মহলের কান্তা হিসেবে চিহ্নিত করে দাম্পত্য জীবন শুরু করেছিলেন। একসময় আর্জুমান্দ বানু চলে গেলেন পরপারে। তারই অপর নাম ছিলো মমতাজ। স্ত্রী বিয়োগান্তক বেদনা স¤্রাটকে দিশেহারা করে দিয়েছিলো। স¤্রাট শোকে বিহ্বল হয়ে ২১ হাজার শ্রমিকের ২২ বছরের সাধনায় আগ্রার যমুনা নদীর তীরে স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে মমতাজ মহল নামে একটি রাজকীয় সমাধি নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও পৃথিবীর আশ্চর্যতম স্মৃতিসৌধগুলোর অন্যতম।

কর্মই মানুষকে মানুষের মাঝে চিরঞ্জীব করে রাখে আবার কুকর্ম চিরদিন ঘৃণিত করে রাখে। আমাদের বর্তমান সমাজে এমন অনেক বিত্তবান আছেন, যাদের কর্মের সফলতা অনেক, কিন্তু সার্থকতা নেই। যেমন পকেটমারও তার কাজের সফলতা পায় আর কর্মবীর তার কর্মের সার্থকতা পায়, যা মানব মনে চিরঞ্জীব। হুগলির হাজী মুহাম্মদ মহসীন এবং মির্জাপুরের আর. পি. সাহা এমন অনেক জনহিতকর কর্ম করেছেন, যা মানব হৃদয়ে অমরত্বের খুঁটি হিসেবে উপ্ত হয়ে আছে।

মানবজাতি অমৃতের সন্তান। আপন আপন কর্মে মরণের পরে কেউ বা সমাজে ঘোষিত হয় আবার কেউ বা দোষে আচ্ছাদিত হয়। প্রত্যেকে জীবদ্দশায় রেখে যাওয়া স্বীয় শিল্প দ্বারা সমাজে অমরত্ব অর্জন করে অথবা সমাজে ধিকৃত হয়।

কণ্ঠশিল্পে স্বকীয়তায় যারা মানব মনে অমরত্ব অর্জন করেছেন তাঁরা হলেন : লতামুঙ্গেশকর, মান্না দে, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আব্দুল আলীম, মোহাম্মদ রফি, জগন্ময় মিত্র, ভূপেন হাজারিকা প্রমুখ। গানের কথা শিল্পে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছেন যাঁরা, তাঁরা হলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, এস. ডি. বর্মন প্রমুখ। অভিনয়শিল্পে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিবর্গ হলেন : সুচিত্রা সেন, উত্তম কুমার, দিলীপ কুমার, মধুবালা, মীনা কুমারী, নার্গিস প্রমুখ। লতামুঙ্গেশকরের মোহনীয় ঐশ্বর্যমণ্ডিত কণ্ঠে ছত্রিশটি বিভিন্ন ভাষায় যেসব গান উচ্চারিত হয়েছে তা তাঁকে মানব মনে চিরঞ্জীব করে রাখবে। প্রায় আট হাজার গানের মধ্যে কোন্টি অমূল্য তা নির্ণয়ের চেষ্টা প-শ্রমমাত্র। স¤্রাট শাহজাহানের আহরিত বিপুল ধন-রত্নের আকর্ষণীয় রত্নটি বের করাও অত্যন্ত কঠিন ছিলো। হেরেমণ্ডপ্রীতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী আন্তঃকোন্দল এবং চরম অপরিণামদর্শিতা মুঘল স¤্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করে দিয়েছিলো।

সসীম মানুষের অসীম গগনচুম্বী প্রত্যাশা মানুষকে করেছে চঞ্চল অপরিণামদর্শী এবং অমানবিক আচরণে অভ্যস্ত। এতে জন্মেছে জাতীয় সর্বস্তরে কুৎসিত চারিত্রিক অবক্ষয়, যা চিরন্তনী মানবিক আবেদন গৌণ করে তাৎক্ষণিক অমানবিক আবেদনকে মুখ্য করে ফেলেছে। অতি প্রত্যুষের ঘন কালো প্রদোষ তিমির-বিদারী স্বচ্ছ আলোকবর্তিকাময় ভানুর উদয়ের অপেক্ষায় থাকাটা খুবই সঙ্গত। কারণ প্রাকৃতিক নিয়মে আঁধারের পরে আলো, দুঃখের পর সুখ, কান্নার পর হাসি, অস্বস্তির পরে স্বস্তি চক্র ক্রমিকভাবে আবর্তিত হয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে। ক্ষমতায় আসার পূর্বে স্থানীয় সরকার থেকে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সবাই জনসেবার অঙ্গীকার করে। কেউ বা উদ্গ্রীব থাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাগিদে, কেউ বা উদ্গ্রীব কর্মীদের সন্তুষ্টির ব্যাপারে। এ যুগে ক্ষমতা হলো একটি উৎকৃষ্ট দ্রাবক। চরিত্র হলো দ্রাব্য আর ঐশ্বর্য হলো দ্রবণ। এ দ্রবণ সমস্পৃক্তার অতীত।

স্বাস্থ্য খাতের সফল চিকিৎসকগণ মানব মনের গহীন স্তরে জায়গা করে নেন। যেমন ভারতের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবী শেঠীকে অনেকেই বলেন যে, তিনি ‘ঘবীঃ ঃড় মড়ফ’ একজন ব্যক্তি। সেই চিকিৎসা খাত বাংলাদেশে একটা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি।

মরণ ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এমন সব সরকারি খরিদ করা মেশিনপত্র বাক্সবন্দি হয়ে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকাবস্থায় রোগীদেরকে অসহায় হয়ে ছুটতে হয় প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অথবা দেশের বাইরে (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৩ জুন, ২০২৪)।

বাংলাদেশের জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সর্বত্রই যেনো অবৈধ সিন্ডিকেটের জয়জয়কারপূর্ণ দুর্দমনীয় সংঘটন। কোনো এক অদৃশ্য অজ্ঞাত মদদে দেশের সর্বত্র এই সিন্ডিকেট ক্রিয়াশীল। একদা কোনো একসময় মধ্য আমেরিকার একটি দেশ ‘এলসালভাদর’-এ অরাজকতাপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান ছিলো। কিন্তু প্রশাসনিক বিচক্ষণতায় সেই অচল অবস্থা মূলোৎপাটিত হয়ে আজ বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে ‘এলসালভাদরে’র নাম জ্বলজ্বল করছে। আমরা বাংলাদেশটা নিয়ে হতাশাগ্রস্ত নই। সময়ের প্রয়োজনে অরুণোদয়ের শুভ সকালের অপেক্ষায় প্রহর গুণছি।

বিমল কান্তি দাশ : কবি ও প্রাবন্ধিক; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক, বলাখাল যোগেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়