প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৩
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও সহায়ক সুবিধা নিশ্চিত করতে শিক্ষকের ভূমিকা

প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই স্তরে একটি শিশু কীভাবে শেখে, কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে প্রশ্ন করতে শেখে এবং জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেÑতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সাফল্য। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিশ্চিত করলেই মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণ, সহায়ক সুবিধা এবং একটি নিরাপদ, আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজন সবচেয়ে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন শিক্ষকই। একটি শিশু কোন বিষয়ে আগ্রহী, কোথায় তার সমস্যা হচ্ছে, কোন পদ্ধতিতে সে সহজে শিখছে কিংবা কী ধরনের সহায়তা তার প্রয়োজন এসব বিষয়ে শিক্ষকই সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
শিক্ষা উপকরণ কেন প্রয়োজন?
শিশুর শেখার ধরন প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে ভিন্ন। তারা শুধু শুনে বা বই পড়ে নয়, বরং দেখে, স্পর্শ করে, প্রশ্ন করে, খেলতে খেলতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বেশি কার্যকরভাবে শেখে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার শিক্ষাকে সহজ, আনন্দময় ও অর্থবহ করে। শিক্ষা উপকরণ বলতে শুধু বাজার থেকে কেনা দামি সামগ্রীকে বোঝায় না। ছবি, চার্ট, ফ্ল্যাশকার্ড, শব্দকার্ড, সংখ্যা কার্ড, গল্পের বই, মানচিত্র, মডেল, খেলনা, জ্যামিতিক আকৃতি, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত উপকরণ এমনকি শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীও কার্যকর শিক্ষা উপকরণ হতে পারে। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা, প্রাথমিক গণিত, বিজ্ঞান ও পরিবেশবিষয়ক ধারণা গঠনে এসব উপকরণের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন সংখ্যাকে শুধু বইয়ের পাতায় দেখে না, বরং হাতে-কলমে বিভিন্ন বস্তু গুনে, তখন তার কাছে সংখ্যার ধারণাটি অনেক বেশি বাস্তব ও বোধগম্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষককে আগে বুঝতে হবে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন
সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শেখে না। কারও ভাষাগত দক্ষতা ভালো, কিন্তু গণিতে দুর্বল; কেউ দ্রুত পড়তে পারে, আবার কেউ অক্ষর ও শব্দ চিনতেই বেশি সময় নেয়। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর দৃষ্টি, শ্রবণ, চলাচল বা শেখার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তাই একজন কার্যকর শিক্ষককে প্রথমেই শিক্ষার্থীর শিখন-চাহিদা চিহ্নিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, প্রশ্নোত্তর, শ্রেণিকাজ, বাড়ির কাজ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষক সহজেই বুঝতে পারেন কোন শিক্ষার্থীর কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। শুধু ‘দুর্বল শিক্ষার্থী’ হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। বরং কেন সে পিছিয়ে আছে এবং তাকে এগিয়ে নিতে কী ধরনের পদ্ধতি ও উপকরণ প্রয়োজনÑসেটিই হওয়া উচিত শিক্ষকের মূল বিবেচনা।
সীমিত সম্পদেও সম্ভব সৃজনশীল শিক্ষা
আমাদের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু উপকরণের স্বল্পতা যেন সৃজনশীল শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। একজন দক্ষ শিক্ষক স্থানীয় ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়েও কার্যকর শিক্ষা উপকরণ তৈরি করতে পারেন। কাগজ, কার্টন, বোতলের ঢাকনা, কাঠি, দড়ি, পাতা, বীজ, পাথরসহ নিরাপদ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে গণিত, ভাষা, বিজ্ঞান ও পরিবেশবিষয়ক অসংখ্য উপকরণ তৈরি করা সম্ভব। এতে বিদ্যালয়ের ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও উপকরণ তৈরির কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। আর শিক্ষার্থীরা যখন নিজের হাতে একটি শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে, তখন সেটি শুধু একটি বস্তু থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে তার নিজের শেখার অংশ।
শ্রেণিকক্ষও হতে পারে একটি ‘শিক্ষা উপকরণ’
শিক্ষার পরিবেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ। শ্রেণিকক্ষকে শুধু বেঞ্চ-টেবিল ও বোর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষক চাইলে সেটিকে একটি জীবন্ত শেখার পরিবেশে পরিণত করতে পারেন। শ্রেণিকক্ষে শব্দের দেয়াল, সংখ্যা চার্ট, বইয়ের কর্নার, গণিত কর্নার, বিজ্ঞান কর্নার, মানচিত্র, শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি, লেখা ও বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ প্রদর্শন করা যেতে পারে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে উপকরণ ঝুলিয়ে রাখলেই কাজ শেষ নয়। এগুলোকে নিয়মিত পাঠদান ও অনুশীলনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষা উপকরণ যেন প্রদর্শনীর সামগ্রী না হয়ে ওঠে; বরং শিক্ষার্থীর হাতে হাতে ব্যবহৃত হয়।
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে
প্রাথমিক স্তরে পড়ার দক্ষতা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়; ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্যও অপরিহার্য। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, ছড়া, ছবি ও বয়স উপযোগী অন্যান্য বই পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীর ভাষা ও চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বড় লাইব্রেরি থাকা সবসময় সম্ভব না হলেও একটি ছোট বইয়ের কর্নার গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষক সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় বই পড়ার জন্য রাখতে পারেন। শিক্ষার্থীরা কী পড়েছে, কী বুঝেছে কিংবা কোন অংশটি তাদের ভালো লেগেছে এসব নিয়ে আলোচনা করলে পাঠাভ্যাস আরও শক্তিশালী হবে।
প্রযুক্তি হোক সহায়ক, বিকল্প নয়
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করার সুযোগ তৈরি করেছে। বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকলে শিক্ষক বয়স ও পাঠের উপযোগী অডিও, ভিডিও, ছবি, অ্যানিমেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারেন।
তবে প্রযুক্তিকে শিক্ষক বা পাঠ্যবইয়ের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রযুক্তি হবে শেখার সহায়ক মাধ্যম। বাস্তব অভিজ্ঞতা, হাতে-কলমে কাজ, আলোচনা ও সহযোগিতামূলক শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এর সুফল সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিশুর জন্য শেখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়। শ্রবণ, দৃষ্টি, চলাচল, ভাষা কিংবা শেখার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী উপকরণ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রয়োজনে বসার ব্যবস্থা পরিবর্তন, বড় অক্ষরের উপকরণ, ছবি, অডিও, সহপাঠী সহায়তা কিংবা অন্যান্য উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো শিশুকে তার সীমাবদ্ধতার কারণে যেন অবহেলা বা বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে না হয়।
শিক্ষা মানে শুধু বই নয়
শিক্ষার্থীর শেখার জন্য বই ও শিক্ষা উপকরণের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্ন শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং নিরাপদ বিদ্যালয় পরিবেশ। একটি শিশু যদি অস্বাস্থ্যকর বা অনিরাপদ পরিবেশে থাকে, তাহলে তার মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, নিরাপদ পানি ব্যবহার, হাত ধোয়া এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও সচেতন করতে হবে।
অভিভাবক ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন
শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সহায়ক সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু শিক্ষকের একার নয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় কমিউনিটিরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীর বিশেষ প্রয়োজন থাকলে শিক্ষক অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। বিদ্যালয়ে কোনো উপকরণের ঘাটতি থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন। স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন সম্পদ ও সহযোগিতাকেও নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপকরণ থাকলেই হবে না, ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে
আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে অনেক সময় বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। কোনো উপকরণ আলমারিতে তুলে রাখার জন্য নয়; শিক্ষার্থীর শেখার কাজে ব্যবহারের জন্য।
তাই শিক্ষককে পাঠ পরিকল্পনার সঙ্গে শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার যুক্ত করতে হবে। কোন পাঠে কোন উপকরণ ব্যবহার হবে, শিক্ষার্থীরা কীভাবে সেটি ব্যবহার করবে এবং এর মাধ্যমে কী শিখবে এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীকে উপকরণ তৈরির অংশীদার করা
শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করবে এমন ধারণার পরিবর্তে তাদের উপকরণ তৈরির কাজেও সম্পৃক্ত করা দরকার। শব্দকার্ড তৈরি, ছবি সংগ্রহ, সংখ্যা কার্ড বানানো, গণিতের মডেল তৈরি কিংবা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষণীয় দেয়াল সাজানোর মতো কাজে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করানো যেতে পারে। এতে তাদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সহযোগিতা, সমস্যা সমাধান ও দায়িত্ববোধ বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।
শেষ কথা
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো, পাঠ্যক্রম, পাঠ্যবই ও শিক্ষা উপকরণ সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন। তবে এসব সম্পদকে শিক্ষার্থীর শেখার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকের। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর প্রয়োজন বোঝেন, উপকরণ নির্বাচন করেন, প্রয়োজন হলে নিজেই উপকরণ তৈরি করেন, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে সহায়তা করেন, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং শ্রেণিকক্ষকে একটি আনন্দময় শেখার কেন্দ্রে পরিণত করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুর হাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, চোখের সামনে উপযুক্ত শেখার সুযোগ এবং মনে নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
শিক্ষা উপকরণ শুধু শিক্ষকের সহায়ক নয় এটি শিশুর শেখার সেতু। আর সেই সেতুকে যথাযথভাবে নির্মাণ ও ব্যবহার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগর হলেন শিক্ষক।
ফরিদুল ইসলাম : চিন্তক, শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক।







