প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ০২:২৬
৪৫ বছরের পথপরিক্রমা: শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন ও তারেক জিয়ার ‘নতুন বাংলাদেশ’!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পঞ্জিকায় মে মাসের শেষ দিনগুলো এক গভীর স্তব্ধতা, আত্মজিজ্ঞাসা ও মনস্তাত্ত্বিক পুনর্জাগরণের বার্তা নিয়ে আসে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে যে মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, তা কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের জাগতির প্রস্থান ছিল না; বরং তা ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব আত্মপরিচয়, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও স্বনির্ভরতার অগ্রযাত্রার ওপর এক সুপরিকল্পিত কুঠারাঘাত। ২০২৬ সালের এই মে মাসে দাঁড়িয়ে আমরা যখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন করছি, তখন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক জগতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে গেছে। দীর্ঘ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সূর্যের আলোয় অবগাহন করছে। ফলে, এবারের শাহাদাৎ বার্ষিকী কেবল অতীতের কোনো আনুষ্ঠানিক রোনাজারি বা শোকগাথা নয়; এটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে এক নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতীকী অঙ্গীকার।
|আরো খবর
স্মৃতির মিনার থেকে বর্তমানের রাষ্ট্র পরিচালনা
একটি রাজনৈতিক দর্শন বা রাষ্ট্রচিন্তা কতটা কালজয়ী, তা প্রমাণিত হয় ইতিহাসের নির্মম অগ্নিপরীক্ষায়। সাড়ে চার দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন এবং ইতিহাসের নির্মম বিকৃতির পরেও জিয়াউর রহমানের নাম এদেশের আপামর জনতার মনস্তত্ত্ব থেকে মুছে ফেলা যায়নি। এ বছর শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী এমন এক অনন্য সন্ধিক্ষণে উদযাপিত হচ্ছে, যেখানে বিগত বছরগুলোতে স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীন মতপ্রকাশের লড়াইয়ে প্রাণ উৎসর্গ করা তরুণ প্রজন্মের রক্তক্ষয়ী আকাঙ্ক্ষা আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। শহীদ জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার হাত ধরে দেশ আজ এক জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার অভিমুখে ধাবমান, যা মূলত শহীদ জিয়ার আদি দর্শনেরই এক আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণ।
পিতার আদর্শে পুত্রের পদचলা: কিছু বাস্তবমুখী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া কেবল বংশগত বা উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, বরং কর্ম ও প্রায়োগিক রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রমাণ করছেন যে তিনি শহীদ জিয়ার 'উৎপাদনমুখী ও সমতাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের' রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরসূরি। বর্তমান সরকারের গৃহীত কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শনেরই প্রতিচ্ছবি:
মেগা স্ট্রাকচার বনাম মানব উন্নয়ন (নতুন অর্থনৈতিক দর্শন): বিগত আমলগুলোতে 'মেগা প্রকল্পের' নামে যে দৃশ্যমান ইট-পাথরের রাজনীতি এবং লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তারেক রহমানের সরকার তা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। তাঁর সরকারের মূল মন্ত্রই হচ্ছে—"মেগা প্রকল্পের আড়ালে লুটপাট নয়, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও মানবসম্পদ সৃষ্টিই আসল কাজ"। ফলে, অনুৎপাদনশীল বড় বড় অবকাঠামোর পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করে শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় সংস্কারে বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে。
একনেকে অনুমোদিত ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ ও জলবায়ু কূটনীতি: বর্তমান সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী ও যুগান্তকারী মেগা পদক্ষেপ হলো একনেক (ECNEC) বৈঠকে বহুল প্রতীক্ষিত 'পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প'-এর চূড়ান্ত অনুমোদন। রাজবাড়ীর পাংশায় বাস্তবায়নাধীন এই মহাপরিকল্পনাটি কেবল একটি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, বরং এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মুক্তির এক অকাট্য বর্ম। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার একতরফা প্রভাব ও উজান থেকে পানির प्रवाह হ্রাসের ফলে দেশের এক-তৃতীয়াংশে যে তীব্র লবণাক্ততা ও মরুকরণ প্রক্রিয়া গ্রাস করছিল, এই ব্যারেজ তা স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করবে। গড়াই ও মধুমতীসহ ২৬টি মরণাপন্ন নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে এটি যেমন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে, তেমনি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় এক নতুন বৈপ্লবিক জোয়ার সৃষ্টি করবে—যা মূলত শহীদ জিয়ার আন্তঃনদী সংযোগ ও স্বনির্ভর কৃষি দর্শনেরই এক আধুনিক মহাপ্রকল্প।
খাল খনন বিপ্লবের পুনর্জাগরণ: সত্তরের দশকের শেষভাগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন 'খাল কাটা বিপ্লব' শুরু করেছিলেন, তখন তিনি শুধু মাটি কাটেননি—তিনি এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আত্মনির্ভরশীল করার এক মহাপরিকল্পনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। চার দশক পর, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই একই সুদূরপ্রসারী দর্শনে দেশব্যাপী ২০,০০০ কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার পুনঃখননের এক বিশাল 'মেগা স্কিম' বাস্তবায়ন করছেন। অতি সম্প্রতি চাঁদপুরের ঘোষেরহাটের মাটিতে দাঁড়িয়ে—যেখানে একদা শহীদ জিয়া নিজে কোদাল হাতে মাটি কেটেছিলেন—সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বহস্তে মাটি কেটে 'বিশ্ব খাল' পুনঃখনন কার্যক্রমের শুভ সূচনা করেছেন। এটি এদেশের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার এক অনন্য স্মারক।
ফ্যামিলি ও প্রান্তিক নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: শহীদ জিয়ার গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্বনির্ভর সমাজ বিনির্মাণের दर्शनকে আরও এক ধাপ আধুনিকায়ন করে বর্তমান সরকার চালু করেছে 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রকল্প। এই কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারের গৃহকর্ত্রী তথা নারীদের হাতে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এটি কেবল সামাজিকভাবে নিম্নবিত্ত পরিবারের ভিতকেই মজবুত করছে না, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে।
'বাংলাদেশ ফার্স্ট' ও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি: বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার মূল ভিত্তি হলো শহীদ জিয়ার অনুসৃত 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি। ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এই জটিল যুগে কোনো ধরনের একপেশে বা দাসত্বমূলক চুক্তি নয়; বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক জায়ান্টদের সাথে নতুন নতুন চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন PayPal) চালুর মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ সমাজ সরাসরি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত হচ্ছে।
কর্মসূচির নতুন মাত্রা: জনকল্যাণ ও আদর্শিক বিশ্লেষণ
এবারের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী বিএনপি যে দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দলটির বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের এক পরিণত রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচলিত শোকাচ্ছন্ন সভার সনাতনী ধারা ভেঙে কর্মসূচিগুলোকে মূলত তিনটি মনস্তাত্ত্বিক স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে:
১. সাংগঠনিক ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ প্রতীক: ৩০ মে ভোরে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশ-বিদেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা। একই সাথে শেরেবাংলা নগরে শহীদ জিয়ার মাজারে ফাতেহা পাঠ ও পুস্পস্তবক অর্পণ, যা দলের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও শ্রদ্ধার এক অবিচ্ছেদ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
২. বৌদ্ধিক চর্চা ও ইতিহাস সংরক্ষণ: কেন্দ্রীয়ভাবে এবং তৃণমূল স্তরে বিশেষ 'আলোচনা সভা' ও সেমিনারের আয়োজন। এর মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষণিকের আবেগ প্রকাশ নয়, বরং শহীদ জিয়ার শাহাদাৎ-পরবর্তী সাড়ে চার দশকের পথপরিক্রমা এবং বর্তমান স্বাধীন রাজনৈতিক আবহে তাঁর '১৯ দফা'র অন্তর্নিহিত দর্শনকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরা।
৩. ব্যাপক জনকল্যাণমুখী সেবা ও প্রান্তিক সংযোগ: দেশের প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে এবং নগরীর প্রতিটি ওয়ান্ডে দরিদ্র, অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা বিতরণের জন্য বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন।
বিশ্লেষণ: এই সেবামূলক কর্মসূচির পরিধি ও গভীরতা প্রমাণ করে যে, বিএনপির রাজনীতি কেবল ক্ষমতার বৃত্তে আবর্তিত নয়। শহীদ জিয়া যেভাবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে মাঠে নেমে কাদা-মাটি মেখে কাজ করতেন, তাঁর দলও ঠিক একইভাবে জনগণের সংকটে পাশে থাকার সেই আদি দর্শনে ফিরে গেছে। এটি মূলত বর্তমান সরকারের জনবান্ধব ও গণমুখী ভাবমূর্তিকে তৃণমূল স্তরে আরও সুদৃঢ় করার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নবায়ন।
নতুন সংগ্রামের সফল পরিণতি
৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে এসে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি হলো—শহীদ জিয়ার আদর্শ আজ ধূলিসাৎ হয়নি, বরং তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে দেশকে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীত থেকে আলোর মহাসড়কে নিয়ে যাচ্ছে। জিয়াউর রহমানের রাজনীতি কখনোই প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা বা বিভাজনের ছিল না; তা ছিল সৃজনশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্যের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া অত্যন্ত সংগত কারণেই সেই প্রতিশোধহীন, মেধাভিত্তিক ও কর্মমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সফল বিকাশ ঘটিয়ে চলেছেন।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে তাই স্মৃতির মিনার থেকে যে বজ্রকণ্ঠ পুনর্ধ্বনিত হচ্ছে, তা হলো—কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং আমরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যে গুণগত ও আমূল সংস্কারের পথে হাঁটছি, তাকে যেকোনো মূল্যে ধরে রাখা। শহীদ জিয়ার চিরন্তন আদর্শকে বুকে ধারণ করে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আপসহীন নেতৃত্বে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণ করাই হোক এবারের শাহাদাৎ বার্ষিকীর প্রকৃত অঙ্গীকার। ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে যে দর্শন ধারণ করতে পারে, তা ৪৫ বছর কেন, শত শত বছরের কালবৈশাখীতেও কখনো ম্লান হয় না; বরং তা আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে পথ দেখায়।
ডিসিকে /এমজেডএইচ
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।








