প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:৪১
সহকর্মীর জন্যে গভীর শোক ও সমবেদনা

কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের শূন্যতা নয়, একটি কর্মস্থলের প্রাণচাঞ্চল্যকেও চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। কিছু বিদায় এতোটাই আকস্মিক, এতোটাই বেদনাবিধুর যে, মন কিছুতেই তা মেনে নিতে চায় না। দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের দক্ষ কর্মী, চঁাদপুর শহর প্রতিনিধি ও কম্পিউটার অপারেটর মো. মোস্তফা কামাল খান সুজনের অকালমৃত্যু তেমনই এক হৃদয়বিদারক শোকগাথা। যে মানুষটি ১৮ অক্টোবর রাতেও হাসিমুখে অফিসের কাজ শেষ করে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, পরদিন সকালে তঁার নিথর দেহ ফিরে আসার সংবাদ যেন সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আহা, কে জানত, সেটিই হবে সহকর্মীদের সঙ্গে তঁার শেষ দেখা, শেষ কথা, শেষ হাসি!
|আরো খবর
মাত্র ৪৩ বছরের জীবনে সুজন ছিলেন কর্মঠ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় তঁার শ্রমের ছাপ থাকতো, অথচ সেই পাতার আড়ালে থাকা মানুষটিকে হয়তো পাঠকেরা চিনতেন না। সংবাদপত্রের প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশের পেছনে যেমন সংবাদকর্মীদের মেধা ও শ্রম থাকে, তেমনি থাকে সুজনের মতো দক্ষ কর্মীদের নিরলস অবদান। আজ সেই কর্মঠ হাত দুটি থেমে গেছে, কম্পিউটারের পরিচিত কি-বোর্ডে আর পড়বে না তঁার আঙুলের স্পর্শ, পত্রিকার পাতা সাজানোর ব্যস্ততায় আর মুখর হবে না তঁার কর্মক্ষেত্র। অফিসের পরিচিত চেয়ারটি হয়তো পড়ে থাকবে, কিন্তু সেখানে আর ফিরে আসবেন না সেই চিরচেনা মানুষটি। এই শূন্যতা কোনো নিয়োগ দিয়ে পূরণ করা গেলেও স্মৃতির শূন্যতা পূরণ হবে কী দিয়ে?
সুজনের মৃত্যুর সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, তঁার চলে যাওয়ার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। রাতভর অস্থিরতা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথন, ‘আমার কেমন যেন লাগছে, ভালো লাগছে না’Ñতঁার এই কথাগুলো এখন স্বজনদের হৃদয়ে হয়তো বারবার ফিরে আসবে। যে স্ত্রী গভীর রাতে স্বামীর মাথায় তেল-পানি দিয়ে তঁাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সকালে তিনিই কি কল্পনা করতে পেরেছিলেন, সেই ঘুম আর কখনো ভাঙবে না? যে সন্তানদের জন্য বাবা ছিলেন নির্ভরতার ছায়া, তাদের জীবনে আজ নেমে এসেছে পিতৃহীনতার নির্মম অন্ধকার। দুই মেয়ে ও এক ছেলের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টি হঠাৎ করেই হারিয়ে গেলো। মায়ের বুক থেকে সরে গেল সন্তানের স্নেহমাখা উপস্থিতি, ভাইদের জীবন থেকে মুছে গেলো প্রিয় ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠস্বর। এই শোকের গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
একজন মানুষের মৃত্যুতে তঁার কর্মজীবনের অবসান ঘটে, কিন্তু তঁার রেখে যাওয়া স্মৃতি, ভালোবাসা ও অবদান থেকে যায়। চঁাদপুর প্রেসক্লাব ও দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠ পরিবারের শোক প্রকাশ, সহকর্মীদের শেষ বিদায় এবং স্মৃতিচারণ সেই সত্যেরই প্রমাণ। মানুষ সুজনকে মনে রাখবে তঁার দক্ষতা, আন্তরিকতা, কর্মনিষ্ঠা ও সহকর্মীসুলভ আচরণের জন্য। সংবাদপত্রের ব্যস্ত কর্মপরিবেশে যঁারা নেপথ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করেন, তঁাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তঁাদের প্রতি মানবিক দায়িত্ববোধও এ মৃত্যু আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমরা জানি, মৃত্যুর অমোঘ বিধান কেউ এড়াতে পারে না। তবু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া বড় কঠিন, কিছু শূন্যতা দীর্ঘদিন বুকের ভেতর হাহাকার হয়ে বাজে। সুজনের বিদায় তেমনই এক বেদনার নাম। তঁার স্ত্রী, তিন অবুঝ সন্তান, মা, ভাইবোন ও স্বজনদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। বিশেষ করে পিতৃহারা শিশুদের ভবিষ্যৎ যেন তঁার স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। শোক শুধু অশ্রুপাতের বিষয় নয়; শোকাহত পরিবারের পাশে দঁাড়ানো, তাদের দুঃসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াও আমাদের কর্তব্য।
হে প্রিয় সহকর্মী সুজন, আপনি আর অফিসে ফিরবেন নাÑএ কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। আপনার চেনা হাসি, কর্মব্যস্ত উপস্থিতি আর আন্তরিক কথাগুলো এখন থেকে কেবল স্মৃতির পাতায় বেঁচে থাকবে। আপনি চলে গেছেন, কিন্তু আপনার শ্রমের চিহ্ন রয়ে গেছে দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের প্রতিটি স্মৃতিময় অধ্যায়ে। মহান আল্লাহ আপনার জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন, কবরকে শান্তিময় করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অসহনীয় বেদনা সইবার শক্তি দিন।
বিদায়, প্রিয় সহকর্মী। আপনার জন্য আমাদের গভীর শোক, অশেষ ভালোবাসা ও অন্তহীন সমবেদনা। আপনার অনুপস্থিতি থাকবে, কিন্তু আপনার স্মৃতি কখনো হারিয়ে যাবে না।








