প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৫
জীব নিজেই প্রাণরূপে করেন নিজের উপাসনা!

প্রাণই শিব। সেই প্রাণরূপ সত্ত্বা জলপানে সজীব হয়, দুধপানে বলিষ্ঠ হয়, ঘৃত ও বিল্বপত্রে চন্দ্রোদয় হয় আর শর্করায় স্মৃতি চাঙ্গা হয় এবং ধ্যানে (উপবাসে) স্থায়িত্ব বা আয়ু বৃদ্ধি হয়।
আমার এমন অভিব্যক্তি নিয়ে অনেকেই বিস্তারিত লেখার জন্যে অনুরোধ করেছেন, তাই লিখছি---
সনাতনী হিন্দুদের প্রতিটি ধর্মীয় আচরণীয় ও পালনীয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত এবং প্রাণীর দেহগত বিষয় বিদ্যমান। কারণ প্রকৃতি হতেই সকল জীবের সৃষ্টি, আবার দেহাবসানে প্রকৃতিতে মিশে যায়। এক কথায় বলা হয় পঞ্চ ভূতের দেহ শেষে পঞ্চ ভূতে যায় মিশে। কিন্তু জীবদেহের মধ্যে কেবলই মানুষ বুদ্ধিমান হওয়ায় সৃষ্টিকে বিভিন্ন রূপে বা শক্তির তারতম্য বিবেচনা করে এক এক দেব ও দেবীর রূপে বিভক্ত করেছেন পছন্দ ও আরাধ্যানুযায়ী।
জীবের প্রাণকেই বিজ্ঞগণ শিবরূপে অভিহিত করেছেন আর প্রাণহীন দেহকে শবরূপে। মাতৃগর্ভে নিষিক্ত হবার পর থেকেই প্রাণে সৃষ্টি এবং এই প্রাণের পুষ্টি ও শক্তি বিধানের জন্যে প্রয়োজন খাদ্যের, আর সেই খাদ্য প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করার পরই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জীব তার রুচি অনুযায়ী গ্রহণ করে থাকে (যে যে খাবারে অভ্যস্ত)।
পানি, দুধ, শর্করা, পত্র এবং তৈল--এই পাঁচটি খাদ্যের উপাদানই সকল খাদ্যের নির্যাস। যা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জীব তার খাদ্য হতে পেয়ে থাকে সরাসরি বা মাধ্যমে। এর কারণ এ সকলের মধ্যে রয়েছে জীবের জীবন ধারণ ও বৃদ্ধির উপাদান। যেমন :
গঙ্গাজল (পানি) : সুখের পাশাপাশি, মোক্ষও লাভ হয়। দুধ (গরু দুধ) : সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং সন্তান ধারণের জন্যে উত্তম, আবার বলকারক।
দই : স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা দূর হয়, জীবনে স্থিতিশীলতা আসে এবং দেহ নিরোগ থাকায় সুখ ও শান্তি বিরাজ করে। মধু (শর্করা) : বহুমূত্র ও যক্ষ্মা রোগ থেকে মুক্তি দেয় এবং কথায় মিষ্টতা আনে, আবার বলকারকও।
আখের রস : সকল ধরণের পার্থিব সুখ এবং সমৃদ্ধি লাভ করা যায়।
চিনি : বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয় এবং সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
পত্র : পাকস্থলী পরিস্কারক ও শুক্রাণুবর্ধক। ঘৃত (তৈল) : শারীরিক দুর্বলতা দূর করে দেহস্থ চন্দ্র বৃদ্ধির সাথে বংশ বৃদ্ধিতে সহায়ক।
এবার আসি মূল কথায়, শিবরাত্রি ব্রত বা শিব উপাসনা। বাস্তবে আমরা দেহস্থ জীবের আধার রূপী প্রাণ (শিব) কে রক্ষার জন্যে ব্রত বা উপাসনা করে থাকি। বিশেষ করে জীবরূপী মানুষ বুদ্ধিমান হওয়ায় নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়ে নিজ দেহকে রক্ষার জন্যে এই পাঁচটি উপাদানকে ব্যবহার করে থাকেন খাদ্য, পথ্য এবং ঔষধ হিসেবে।
শিবই সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের কারণ। তথা প্রাণই প্রাণ সৃষ্টি করেন, প্রাণই প্রাণকে রক্ষা বা আশ্রয় দিয়ে থাকে, আবার প্রাণই প্রাণকে হরণ করেন (সর্ব নামে কীর্ত্তিত)।
স শিবঃ সর্বমেবেদং স্বক্রিয়াভিশ্চ মূর্তিভিঃ
অধিতিষ্ঠত্যমেয়াত্মা যৎ তৎ সর্বস্ততঃ স্মৃতঃ।।
ব্রহ্মা বিষ্ণুস্তথা রুদ্রো মহেশানঃ সদাশিবঃ।
মূর্তয়স্তস্য বিজ্ঞেয়া যাভির্বিশ্বমিদং ততম্।।
(শিবপুরাণ : বায়বীয়সংহিতা, উত্তরভাগ, ৪.২-৩)
“পরমাত্মা শিব স্বকীয় মূর্তিসমূহ দ্বারা সকল কিছুতেই অধিষ্ঠান করে আছেন বলে তিনি ‘সর্ব’ নামে কীৰ্ত্িতত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, মহেশ্বর ও সদাশিবসহ বিবিধ মূর্তিতে প্রকাশিত।”
নিজেকে রক্ষার জন্যে স্বভাবানুযায়ী বিভিন্ন আচার ও অনুষ্ঠান করে থাকলেও কখন, কী কারণে উপকরণ ব্যবহার করেন, তা হয়তো সবাই জানেন না সাথে উপকরণের গুণাগুণ। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আর্য পণ্ডিতগণ রূপক চরিত্র দিয়ে লীলা কাহিনীর মাধ্যমে ধর্মীয় কল্যাণ ও অকল্যাণ সন্নিবেশিত করার মাধ্যমে কিছু কিছু বিশেষ তিথিকে বা দিনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছেন। তেমনিই শিবরাত্রি ব্রত পালন,,,,,
এই ব্রত পালনে যে সকল উপাদান ও স্নান সম্পন্ন করতে যে যে দেবতা ও দেবীর রূপ কল্পনা করা হয়েছে, তা উপাদানের সাথে একই অর্থবোধক বা প্রাণ রক্ষার পথ্য।
শিব লিঙ্গ’ই হচ্ছে আরাধ্য মূর্তি, যাঁর মধ্যস্থানকে মাতৃযোনীরূপে আখ্যায়িত। প্রথমেই যোনীস্থানের ডানে গণেশ, বামে কার্তিক, তারপর একমাত্র কন্যা অশোক সুন্দরী ও দুর্গা এবং সব শেষে মধ্যস্থ উচ্চ লিঙ্গস্থ শিবকে উপাচার অর্পণের মাধ্যমে স্নান করানো এবং উপবাস করে ব্রত সম্পন্ন করা।
গণেশ হচ্ছে বল ও শক্তি (দুধ ও দধি), কার্তিক বীর্য (ঘৃত) অশোক সুন্দরী শোক ও দুঃখ বিনাশক (বিল্বপত্র), দুর্গা দুর্গতি বা রোগ হরণকারিণী (শর্করা) আর শিব সর্বকারণের কারণ (জল)।
বাস্তবে আমারে বাঁচাতে আর সৃজিতে আমিই করি আমারে সেবা, ইহাই ব্রত নামে হইল প্রচার। যিনি জ্ঞানী তিনি নিত্য করেন শিব উপাসনা আর যিনি না জানের এমন তত্ত্ব তিনি করেন দেখাদেখি তিথিমত মাত্র একদিন।
- রিপন কুমার সাহা : সভাপতি, শারদাঞ্জলি ফোরাম, চাঁদপুর। তারিখ : ১৫/০২/২০২৬ খ্রি.।




