প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(উনপঞ্চাশতম পর্ব)
আমার সামনে মাইক, মাইকের সামনে আমি :
ঘরোয়া আড্ডায় কিংবা বন্ধু মহলে প্রচুর কথা বলা যায়। কথা বলতে বলতে গলার শিরাও ফোলানো যায়। কিন্তু একপাল দর্শকশ্রোতার সামনে মাইকে কথা বলা দূর থেকে যত সহজ মনে হয় আসলে তত সহজ নয়। মাইকে কথা বলতে গিয়ে প্রথম প্রথম দু হাঁটু কাঁপেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কেউ কেউ আছে মাইকের কথা শুনলেই গলা শুকিয়ে যায়। ঘন ঘন পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিতে হয়। কারও কারও মাইকে কথা বলার আহ্বান আসলেই মাথা চক্কর মারে, চোখে সর্ষে ফুল দেখে। আবার কেউ কেউ আছেন একবার মাইকে কথা বলা রপ্ত হয়ে গেলে আর মাইক ছাড়তেই চান না। তারা যেন মাইক হাতে অমায়িক হয়ে যান। এদের হাতে কথা সংক্ষেপ করার স্লিপ না ধরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তারা বলতেই থাকেন। এ রকম লোক আমার চেনাশোনা গণ্ডীর মধ্যে নেহায়েতই কম নয়। মাইকে কথা বলা নিয়ে অনেক চটুল গল্পও প্রচলিত আছে। কোনো এক হলভর্তি অনুষ্ঠানে বক্তারা বক্তব্য শুরু করার পর একে একে দর্শক কমতে শুরু করে। শেষমেষ একজন বক্তা আর একজন দর্শক অবশিষ্ট ছিলো। কৌতূহলী হয়ে বক্তা তখন দর্শককে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই চলে গেছে কিন্তু আপনি বসে আছেন কেন? জবাবে তিনি বললেন, আপনার পরে আমার বক্তব্য দেওয়ার পালা। তাই বসে আছি।
আমাদের রোটারী ক্লাবে মাঝে মাঝে হলভর্তি জনসমাগম করার লক্ষ্যে রোটারী স্পাউজ আর লেটসদের নিয়ে যেতে বলা হতো। এক সিনিয়র রোটারিয়ান তার পরিবার ও সন্তান-সন্তুতিকে এ উদ্দেশ্যে নিতে চাইলে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, যাবো না, ওখানে মাইকে বকবক বেশি হয়। দর্শক ধরে রাখতে হলে বক্তাকে জানতে হবে, কতক্ষণ বললে দর্শকের জন্যে তা বোরিং হবে না বা কীভাবে বললে দর্শক শুনতে আগ্রহী হবে৷ কেউ কেউ মাইকে কথা বলতে গেলে দুনিয়ার থুথু ছিটকে পড়ে মাইককে দূষিত করে দেয়। তখন মাইক হয়ে উঠে বিপজ্জনক। মাইকের ব্যবহারে অনভ্যস্তজন কেবল মাইকে আঙ্গুলের টোকা দিয়ে যাচাই করে মাইক অন আছে কিনা। কেউ কেউ তো ফুঁ দিতে দিতে মাইকটাকেই যেন নিভিয়ে দেয়। আর কেউ মাইককে এতো বেশি হেলায় যে, হ্যালো হ্যালো হ্যালো বলতে বলতে নিজেই হেলে পড়ে। মাইক পেলে কারও গলায় গর্জন বাড়ে আর কারও কণ্ঠ হয়ে যায় ক্ষীণ, মিউ মিউ।
মাইকের সামনে আমি বা আমার সামনে মাইকের পরিচয় ঘটেছে শৈশবে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও উপস্থাপনা, আবৃত্তি, বিতর্ক, ধারাবর্ণনা, ঘোষণা প্রদান, নাটকের সংলাপ বলা এবং অভিনয়, কোরাস গানে অংশগ্রহণ, কবির লড়াই, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন, স্লাইড প্রেজেন্টেশন, শিক্ষকতা, প্রশিক্ষণ প্রদান, ত্রিপিটক পাঠ, র্যাপোটিয়ার, গোলটেবিল বৈঠকের আলোচক, বক্তা, প্রবন্ধ উপস্থাপক, স্মারক বক্তা, প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে মূল্যায়ন, স্লোগান দেওয়া, নেপথ্যে কণ্ঠ দেওয়া, সাক্ষাৎকার দেওয়া ও নেওয়া, মন্তব্যের লাইভ ও রেকর্ডিং ইত্যাদি নানা ভূমিকায় মাইক ও আমি কিংবা আমি ও মাইক পরিচয়ে ও প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছি বার বার। আমার প্রতি মাইকের প্রেমে যেমন আমি ঋদ্ধ হয়েছি তেমনি মাইকের প্রতি আমার সমীহ মাইককে আমার হতে সাহায্য করেছে। মাইকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে গ্রামে যখন আমার সবেমাত্র বোধবুদ্ধি তৈরি হচ্ছে তখন। সে সময় ছিল লং প্লে রেকর্ডের যুগ। গ্রামে কারও বিয়ে কিংবা বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসবে মাইকে বাজানো হলে আমি ও আমরা গিয়ে মাইক্রোফোনে কৌতূহলে ও ক্রীড়াচ্ছলে আবোল তাবোল শব্দ করতাম। নিজের কণ্ঠ নিজের কোমন লাগে শুনতে তা যাচাই করতাম। এ অভ্যেসটা আমি আমার দুই শ্রীমানের মধ্যেও দেখেছি। মাইক পেলেই হৈ, হ্যালো ইত্যাদি নানা আওয়াজ করে তারা সুখ ও শখ মেটাতো। অবশ্য এসব শৈশবেই সীমাবদ্ধ। মাইকে শোনা প্রথম দুটো গান আমার এখনও মনে আছে। একটা গান হলো ‘নিঝুম সন্ধ্যায় ক্লান্ত পাখিরা বুঝি বা পথ ভুলে যায়’ আর অন্যটা হলো ‘ আকাশ প্রদীপ জ্বেলে দূরের তারার পানে চেয়ে।’ এ যাবৎ অনেক গান শুনেছি। কিন্তু এ দুটো গান আমার কানে কখনো পুরোনো হয় না।
ক্লাস ওয়ানে পড়াকালীন গ্রামে প্রথম আমার হাতে মাইক্রোফোন দেওয়া হয়। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমাকে একটা গান গাইতে বলা হয়৷ শিশুর কণ্ঠে তখন পরিচর্যাহীন গান শুনে হাতে একটা খাতা ধরিয়ে দেওয়া হলো উপহার হিসেবে। ইউনিসেফের লোগো আঁকা খাতা নিয়ে কিছুটা দৌড় আর কিছুটা লাফাতে লাফাতে বাড়ি আসি। আমার গাওয়া গানটা ছিলো সিনেমার গান। ‘ মাগো মা ওগো মা আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা। আমি যেতে পারি দুনিয়া ছাড়ি তবু তোমায় ছাড়বো না।’ তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে শীতকালে মাঘমাসে আমার মেজমামার বিয়েতে প্রীতি উপহারের লেখা পাঠ করার জন্যে আমাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো মাইকের সামনে। মাঘের শীতে চান্দগাঁও সিএমবি বিএডিসি কোয়ার্টারের খোলা মাঠে শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমি কোনোমতে পড়ে শেষ করেছিলাম সেই কাব্যিক উপহার পত্রটি। আমাকে পাঠক হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন আমার বড়দা আর প্রীতি উপহারটাও তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ আমি দাঁড়িয়ে গেলাম মাইকের সামনে বিজয় দিবস উপলক্ষে ছোটদের পক্ষ থেকে খেলাঘরের হয়ে বক্তব্য দিতে। এই ছিলো বড়ো পরিসরে শিশু একাডেমিতে আমার প্রথম বক্তৃতা। তখনও আমি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। তৃতীয় শ্রেণিতেই ‘রাজা ও রাজদ্রোহী’ নাটকে অভিনয় উপলক্ষে মাইকের সামনে দাঁড়াই। গুণে গুণে মাত্র দুটো সংলাপ ছিলো। এ বছরই অক্টোবরের দিকে কাতালগঞ্জ নব পণ্ডিত বৌদ্ধ বিহারে জাতীয় বৌদ্ধ শিশু কিশোর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে অংশগ্রহণকালীন মাইকের সামনে দাঁড়াতে হয়। এবারের বিষয় আবৃত্তি। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া ‘এত্তোটুকুন হাতিটার অত্তোবড়ো দাঁত/ শাক খায় না, মাছ খায় না/ খায় না গরম ভাত’; এই ছিলো ছড়াটির শুরুর স্তবক। চতুর্থ শ্রেণিতে উঠে আমি মাইক হাতে নিই ক্রিকেট খেলার ধারা বর্ণনা করতে। এটা ছিলো আসলে একটা ক্রিকেট ম্যাচের মঞ্চায়ন। আমার সাথে সহ-ভাষ্যকার ছিলেন হাকিম মামু। তিনি তখন পঞ্চাশ ছোঁয়া তরুণ ছিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে প্রথম বিতার্কিক হিসেবে মাইক হাতে পাই। স্কুলে সেন্ট প্ল্যাসিডস্ ডে উদযাপনকালীন প্রীতি বিতর্কে অংশ নিই দলপ্রধান হিসেবে। কলেজিয়েট স্কুল বিজ্ঞান ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল প্রাঙ্গণে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় মাইকের সামনে দাঁড়াতে হয়। এ ছিলো প্রথম উপস্থিত বক্তৃতা নিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ানো। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম মাইক পাই গ্রামে, কঠিন চীবর দানোৎসবের উপস্থাপক হিসেবে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপন করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের অনুষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য যেমন আলাদা, তেমনি শব্দ চয়নও আলাদা। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের নির্ধারিত বক্তৃতা দিতে গিয়ে আবারও মাইক হাতে পাই। মেডিকেল কলেজে এসে প্রথম বর্ষে মাইক হাতে পাই অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী স্যারের ক্লাসে। স্যারের বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাসে তাঁর পড়ানো বিষয়টা পুনঃ পাঠদানের নমুনা দেখাতে। তৃতীয় বর্ষে মাইক হাতে আসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বিতর্ক দল তৈরি করার সময়। এ বছরের শেষের দিকে কবির লড়াই করতে গিয়ে মাইক হাতে নিতে হয়। ছন্দে ছন্দে নিজের পরিচয় দিতে তখন বেশ লেগেছিলো। এ সময় ধারাবাহিক গল্প বলতে গিয়েও মাইকের শরণাপন্ন হই। দ্বিতীয় হয়েছিলাম যদিও। মেডিকেল কলেজের ছাত্র অবস্থাতেই গ্রামে ধর্মীয় বক্তা হিসেবে মাইকের সামনে দাঁড়াতে সুযোগ পাই। বৌদ্ধ ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ে বলার জন্যে আদিষ্ট হয়েছিলাম সেবার। বক্তা হিসেবে কার্ডে নাম আসে প্রথম ডাক্তার হওয়ার আগেই, ছাত্র অবস্থায়। ব্যানারে নাম আসে ডাক্তার হওয়ার পরে। বিবাহ বাসরে আশীর্বাদের অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব পড়ে বেশ কয়েকবার। মামাতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে আশীর্বাদক হিসেবে বক্তব্য রাখতে মাইক হাতে পাই। এরপর থেকে ধীরে মাইক্রোফোন আমার হাতে এসে যেতো বিভিন্ন উছিলায়। চিকিৎসকদের অনুষ্ঠানে মাইক্রোফোন হাতে নিতে হলো র্যাফেল ড্র পরিচালনাকারী হিসেবে। রোটারীক্লাবে মাইক্রোফোন ধরি প্রধান অতিথির জীবনী পাঠ এবং আগত অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দিতে। জেলা সাহিত্য সম্মেলনে মাইক ধরি স্বাগত স্লাইড শো-এর ধারা বর্ণনায়। পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্কে মাইক হাতে আসে মাননীয় স্পিকার হিসেবে এবং দু দলের টস পরিচালনাকারী হিসেবে। চাঁদপুর ও ঢাকা শিল্পকলায় স্মারক বক্তা হিসেবেও মাইকের সামনে এসেছি।
জেলা শিল্পকলায় মাইকের সামনে এলেই কোথা হতে জানি শহীদ পাটোয়ারী ভাই উদয় হয়ে বলতেন, দাদা সংক্ষেপ কইরেন। অথচ তখনও বক্তৃতা শুরু করিনি। চ্যালেঞ্জিং লাগতো মাইকে কথা বলার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে। তখন বলার ভলিউম বাড়াতে হতো, বিদ্যুৎ না আসা অব্দি। বক্তৃতা দিতে গেলে কখনও কখনও মাইক আমার কাছে এসেছে আর কখনও আমি মাইকের কাছে গিয়েছি। বিভিন্ন কর্মাশালায় প্রশ্ন উত্থাপনকালীন মাইক নিজে হেঁটে আমার কাছে এসেছে। আবার শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়ে গিয়ে নিজে হেঁটে মাইকের কাছে গিয়েছি। কাউকে কাউকে দেখেছি, মাইক পেলে একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়ও বক্তব্যে তুলে ধরে। আর কেউ কেউ আগের বক্তার সাথে একমত পোষণ করে কথা গুটিয়ে আনে। আমি বিতার্কিক বলেই মাইকের সামনে পাঁচ মিনিটের বেশি থাকার চেষ্টা করি না। তবে প্রবন্ধ পাঠ বা ক্লাস নিতে গেলে তা আলাদা। অনেকের জীবনে মাইকের সামনে যাওয়ার সাধনা থাকে, উচ্চাভিলাষ থাকে। আমার জীবনে মাইক নিজেই আগে এসেছে। তারপর আমার সাথে মাইকের প্রেম হয়েছে। মাইক যার বশীভূত, তার জন্যে কথা বলা কোনো ব্যাপারই নয়। মাইকের কাছে আমার ঋণ অনেক। কারণ আমাকে না কাঁপিয়ে মাইক আমার কণ্ঠ দিয়ে স্বর ও কথা বের করে নিয়েছে। তাই আমি মাইকের আর মাইক আমার। (চলবে)







