বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০০

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে সুরের মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন চাঁদপুরের কৃতী সন্তান মুরাদ নূর

কবির হোসেন মিজি
বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে সুরের মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন চাঁদপুরের কৃতী সন্তান মুরাদ নূর

বাংলা সংস্কৃতির শেকড় হাজার বছরের গভীরে প্রোথিত। নদী, জনপদ, লোকজ ঐতিহ্য আর মানুষের অনুভবের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও স্রষ্টার। ভৌগোলিকভাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশ তাই কেবল প্রকৃতির দেশ নয়, সুরেলা সংস্কৃতিরও এক উর্বর জনপদ। সেই ধারাবাহিকতায় যাঁরা নীরবে, নিরলসভাবে বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম মুরাদ নূর।

মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর কোল ঘেঁষা চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি আজ দেশের পরিচিত একজন সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক। ছোট্ট গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত তাঁর সঙ্গীতযাত্রা মূলত এক আত্মঅন্বেষণের গল্প, যেখানে লোকজ সুর, আধুনিক ভাবনা আর ব্যক্তিগত দর্শনের মেলবন্ধন ঘটেছে।

বর্তমান সময়ে দেশের সেরা সুরকারদের তালিকা করলে অনায়াসেই উচ্চারিত হয় মুরাদ নূরের নামটিও। নিজস্ব ঢং, শব্দ ও সুরের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং বেছে বেছে কাজ করার মানসিকতা তাঁকে আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সৃষ্ট সুরে যেমন আছে মাটির গন্ধ, তেমনি আছে সময়ের স্পন্দন। এ কারণেই তাঁর গান কেবল শ্রোতাকে বিনোদনই দেয় না, ভাবতেও শেখায়।

মুরাদ নূরের সঙ্গীতচর্চার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী গুরুশিষ্য পরম্পরা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব শেখ সাদী খানের কাছে তিনি নিয়মিত সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন। এই গুরুই তাঁকে সুরের শুদ্ধতা, দায়িত্ববোধ ও সৃষ্টিশীলতার পাঠ দিয়েছেন। মুরাদ নূরের সঙ্গীতে যে গভীরতা ও সংযম লক্ষ্য করা যায়, তার পেছনে এই প্রশিক্ষণের বড়ো ভূমিকা রয়েছে।

দীর্ঘ সঙ্গীতযাত্রায় মুরাদ নূর প্রায় দু শতাধিক গানে সুর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সিনেমার গান ৮ থেকে ১০টি, নাটকের গান অন্তত ৫টি এবং অসংখ্য একক ও অডিও গান। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে : আমারে দিয়া দিলাম তোমারে, স্টেশন-২, ভুলি ভুলি মনে করি, টান, ধ্যানে জ্ঞানে, মাওলা, মেঘবরষা, জয় জোসনা, অন্তরে অন্তরে, ঢাকা, লজ্জা, রঙ্গের দুনিয়া ইত্যাদি। এসব গান শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সুরের সহজাত সৌন্দর্য ও কথার গভীরতার জন্যে।

মুরাদ নূরের প্রথম প্রকাশিত গানটি ছিলো বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের কথায় লেখা ‘একটু বাড়িয়ে বলা’ শিরোনামের নাটকের গান। এটি তাঁর সঙ্গীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর প্রথম সিনেমার গান করেন কবি মাসুদ পথিক পরিচালিত নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ চলচ্চিত্রে, যেখানে তাঁর সুরে ‘ওরে বন্ধু’ গানটি দর্শক-শ্রোতাদের দৃষ্টি কাড়ে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অডিও অ্যালবাম সারপ্রাইজ অব মুরাদ নূর। এই অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ সুরকার হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন।

মুরাদ নূরের সুরে গান গেয়েছেন দেশের প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় বহু কণ্ঠশিল্পী। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন : কাঙ্গালিনী সুফিয়া, ফকির আলমগীর, মুজিব পরদেশী, কুমার বিশ্বজিৎ, সামিনা চৌধুরী, এস আই টুটুল, এস ডি রুবেল, সাব্বির নাসির, রাজেশ ঘোষ, ফাহমিদা নবী, টুনটুন বাউল, রবী চৌধুরী, ফকির শাহাবুদ্দিন, ঐশী, কাজী শুভ, কোনাল, পড়শী, বেলাল খান, রাজীব, রিংকু, পুলক, সম্পা বিশ্বাসসহ আরও অনেকে। ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে তাঁর সুর নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

মুরাদ নূরের আরেকটি বড়ো পরিচয় হলো, তিনি শক্তিশালী সাহিত্যিকদের কবিতা ও গানে সুরারোপ করেছেন। এদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, জীবনানন্দ দাশ, মুনশি ওয়াদুদ, গোলাম মোর্শেদ, নির্মলেন্দু গুণ, অসীম সাহা, মিলন খান, কবির বকুল, ডা. রুখসানা পারভীন, দেলোয়ার আরজুদা শরফ, সোমেশ্বর ওলি, নীহার আহমেদ, আমিরুল হাছান, কামরুল নান্নু, ওমর ফারুক বিশাল প্রমুখের গীতিকবিতায় সুর করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।

এছাড়া ধ্যানে জ্ঞানে গানটি গেয়েছেন সাব্বির নাসির, আত্মদান গেয়েছেন রাজীব (ভাষার গান), কেমনে তোরে ভুলি গেয়েছেন জাকির হোসেন। এসব গানের কথা ও সুর দুটিই মুরাদ নূরের।

শুধু বাণিজ্যিক গান নয়, মুরাদ নূর বিশ্বাস করেন জনপদের গল্প গানে তুলে ধরতে। এর উজ্জ্বল উদাহরণ মতলব উপজেলার থিম সং ‘আমাদের মতলব’। তাঁর লেখা ও সুরে গানটি গেয়েছেন দিনাত জাহান মুন্নি ও আতিক বাবু। দেশের ইতিহাসে কোনো উপজেলাকে কেন্দ্র করে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ থিম সং, যা মতলববাসীর জন্যে এক আলাদা গর্ব।

এছাড়া মতলবের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইমামপুর পল্লী মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয়ের থিম সংও রচনা এবং সুর করেছেন মুরাদ নূর। এসব কাজ প্রমাণ করে, তিনি কেবল শিল্পী নন, নিজ এলাকার সংস্কৃতির জন্যে দায়বদ্ধ একজন প্রতিনিধি।

পেশাগতভাবে মুরাদ নূর যুক্ত রয়েছেন সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত নতুন সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। সমাজ, মানুষ ও সময়কে কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতাই তাঁর সঙ্গীতকে আরও বাস্তব ও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

চাঁদপুরের এই কৃতী সন্তান মুরাদ নূর মূলত একজন সুরের ফেরিওয়ালা। গ্রাম থেকে শহর, লোকজ থেকে আধুনিক, সবখানেই তাঁর সুরের অবাধ যাতায়াত। চাঁদপুরের নদীঘেরা জনপদ থেকে উঠে এসে তিনি যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলা সংস্কৃতির জন্যেও এক ইতিবাচক অর্জন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির পরিসর আরও বিস্তৃত হবে এমনটাই প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়