শনিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৭

ধারাবাহিক উপন্যাস-২৬

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

১৪.

এক এক করে ফ্রেশ হয়ে ভোর সোয়া ছয়টার মধ্যে তৈরি হয়ে যাই। ডায়াবেটিকের রোগী তাই কিছু একটা খেতে হবে। আমাদের রুমে সবসময় ব্যবস্থা রয়েছে খাবারের আর সেগুলোই খেয়ে নেই। রাতে ফেরার সময় নরেন্দ্রদা ত্রিশ প্যাকেট চিপসের বান্ডেল করা একটা বড় প্যাকেট কিনে নেয়। এত চিপস কে খাবে বলায় বলেÑআছে আছে সবই দেখতে পারবে। নরেন্দ্রদা নতুন কিছু করার চেষ্টা করে এটা আমরা সকলে জানি আর সেজন্যই তার কথায় আস্থা জন্মে অনায়াসে কিন্তু এতগুলো চিপস উনি করবেনই বা কী? আমরা কেহ মিলিয়ে নিতে পারছি না। অবশেষে সান্ত¦না দিলাম এই বলে যে কী হবে সেটা পরে দেখা যাবে। ওদের কথামতো সকাল সাতটায় বাস ছেড়ে চলে আসে টেকনাফের উদ্দেশ্যে আর রাস্তায় বেশ কিছু জায়গায় জানযট সহ্য করে অবশেষে সাড়ে নয়টায় পৌঁছি টেকনাফ। সকালের নাশতা গাড়িতে সারতে হয়। আমরা চারজন ব্যতিত অন্যান্য সকলেই অপরিচিত। সময়মতো দশটায় জাহাজ ছেড়ে দেয় টেকনাফ থেকে। যাত্রা এখন নাফ নদী দিয়ে সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। কুয়াশায় ভেজা রোদটা বেশ লাগছে যদিও আমরা চারজনই গরম জামা-কাপড়ে মোড়ান অনেকটা প্যাকেট প্রায়। বোটশিপ ভেসে চলছে নদীর মাঝখান দিয়ে আর নদীতে কনকনে শীতের বাতাস। আমরা বসে আছি ছাদের অংশে গদিওয়ালা সিটগুলো পাতা আছে যেখানে এবং খোলামেলা হওয়ায় জার্নিটা বেশ লাগছে। আমাদের সকলের চোখে সানগ্লাস যেন তরুনদের তুলনায় আমাদের পরিপাটি ভাবটা কম নয়। নরেন্দ্র দা ব্যাতিত আমরা তিনজনই এই পরিবেশে নতুন তাই বসে নদীর দৃশ্য দেখছিলাম। নরেন্দ্রদা আঙুল দিয়ে দূরে কী যেন একটা দেখাতে চাইছেন।

‘এই নদীটার একপাড় বাংলাদেশ আর অন্যপাড় মিয়ানমার অর্থাৎ এই নাফ নদীতে আর্ন্তজাতিক বর্ডার লাইন পড়েছে। আমরা এখন ওপাড়ের খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছি তো দেখবে ওপারে মিয়ানমারের কিছু লোকজন নদীর পাড়ে মাছ ধরছে।’

‘দাদা একটা নদীর এপাড়-ওপাড় দুটো রাষ্ট্রের সীমানা। কখনোকি কোনো ঝামেলা হয় না।’

‘হতে পারে আবার হয় না। শোন, কেহ যদি ঝামেলা করতে না চায় তাহলে ঝামেলা হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না।’

আমরা তিনজনই মনযোগ দিয়ে বিষয়টা শুনছিলাম। নদীর এলাকা শেষ হয়ে চলে আসে সমুদ্র আর আশপাশে প্রচুর গাংচিল ও বালি হাঁস উড়ছে। ওরা এত কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে যেন আমাদের পোষ মানা। বেশ আনন্দ নিয়ে বিষয়টা উপভোগ করছি। হাত বাড়ালে হাতের পাশে দিয়ে উড়ে যায় কিন্তু ধরা দেয় না।

‘তোমরা জানতে চেয়েছিলে না এই চিপসগুলো করব কী? এই দেখ কতগুলো বালিহাঁস ও গাংচিল এরা এভাবে উড়ে উড়ে আমাদের সাথে যাবে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত এর কারণ কী জানো! পর্যটকদের দেওয়া খাবার আর এর লোভে যখনই বোটশিপ দেখে এরা দল বেঁধে ছুটে চলে আসে খাবারের জন্য। এই দেখ আমি একটা একটা চিপস ছিটিয়ে দিচ্ছি ওরা বাতাসেই সেগুলো ধরবে আর খেয়ে নেবে।’

নরেন্দ্রদা চিপস ছিটানোর সাথে সাথে এক এক করে বালিহাঁস ও গাংচিলের দল উড়ে এসে সেগুলো শূন্যেই ধরে ফেলার চেষ্টা করে আর খেয়ে ফেলে। বিষয়টা বেশ মজাদার আর রোমাঞ্চক। আমরা সকলেই এভাবে চিপস বিলাচ্ছি এবং আমাদের দেখাদেখি অন্যান্যরাও সেরকম করছে। অল্প সময়ের মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস ও গাংচিল চলে আসে। যদি কোনো চিপস সমুদ্রে পড়ে আর বোটের ঢেউয়ের তোড়ে গুলোয়ে যায় আমরা কেহ কিছু দেখতে না পেলেও গাংচিল ঠিকই দেখে আর সেগুলো ছোঁ মেরে মুখে তুলে নেয়। আমাদের সাথে গাড়িতে এসেছিল সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি যারা হানিমুনে কক্সবাজারে এসেছিল পরিচয়টা যদিও বোটে এসে হয়। ওরা এসে আমাদের দেখে তার খাবারগুলো বিলাতে শুরু করল বেশ মজা নিয়ে। একটা সময় তাদের খাবার ফুরিয়ে যায় তারপর এসে একটা প্যাকেট কিনতে চায় আমাদের কাছে। অনিমেষ বলে দাম লাগবে না মা তুমি নিয়ে যাও একটা। মেয়েটা কাচুমাচু করে একটা প্যাকেট নিল আবার বিলাতে লাগল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী এই বোটশিপের সফর সঙ্গী। ওদের দু-জনের হাতে আছে গিটার আর একটার হাতে মাঝারী ধরনের ঢোল আবার আরেকজনের হাতে বাঁশি। একসাথে ১০-১৫ জনের একটা টিম যাচ্ছে সেখানে ঘুরতে। ওরা আমাদের এই বিনোদন দেখে কাছে এসে যার পকেটে খাবার যা কিছুই আছে সেগুলো বিলাতে লাগল। বেলা পৌঁনে বারটার দিকে সেন্টমার্টিন পৌঁছি আমরা। জাহাজ থেকে সমুদ্রের রং নীলাভ দেখে চকিত হই, বেশ লাগছে। দ্বীপে নামার পর আমাদের প্যাকেজ অনুসারে দুপুরের লাঞ্চ শেষ করতে হয়। মুরগির পাতলা ঝোল, সামুদ্রিক নারকেলি মাছ, লটিয়া শুটকি ভুনা, সব্জি ও ভর্তা এবং সাথে পাতলা ডাল খেতে বেশ লাগছে। লাঞ্চের পর আমাদের টিম ম্যানেজার এসে বলেÑ

‘স্যারÑআপনাদের জন্য কটেজ বুকিং দেওয়া আছে আপনারা সেখানে চলে যেতে পারেন আর আগামী পরশু বেলা তিনটায় এই জাহাজে করে ফিরে যাবেন। এই নিন কটেজের কার্ড এখানে ঠিকানা দেওয়া আছে এখান থেকে বেশি একটা দূর না। আপনারা চাইলে হেঁটে গেলে সর্বোচ্চ পনেরো মিনিটের পথ নতুবা ভ্যানগাড়ি পাওয়া যায় ওটাতেও যেতে পারেন।’

‘ধন্যবাদ আপনাকে। এখানকার সিকিউরিটি ভালো তো নাকি কোনো সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে?’

‘আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার। পর্যটনের জন্য ট্যুরিষ্ট পুলিশের টিম সর্বসময়ই অ্যাক্টিভ থাকে তাই কোথাও কোনো ঝামেলা হওয়ার সুযোগ নেই। আশপাশে অনেক ভালো রেস্টুরেন্ট আছে আর এখানে কোনো ফ্রিজিং করা মাছ পাবেন না প্রাকৃতিক তাই মাছের আইটেমগুলো নিলে খেয়ে মজা পাবেন স্যার। ঠিক আছে আপনারা এনজয় করুন আমি আসি তাহলে।’

ভদ্রলোক লম্বা সালাম ঠুকে বিদায় নিল আর নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত করাতে অনেকটা স্বস্তি বোধ করছি। আমরা একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে তার উপর ব্যাগগুলো রেখে চারজন পা ঝুলিয়ে দু পাশে বসে পড়ি। ছোটবেলার বেশ কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এভাবে ভ্যানগাড়িতে চড়ে বেড়াতে কী যে মজা লাগত তা বলে বুঝাতে পারব না। একটা বাজারের ভিতর দিয়ে দশ মিনিটের মধ্যে চলে এলাম কটেজের সামনে। গা-হাত মেজমেজ করছে তাই রুমে গিয়ে আগে ফ্রেশ হই তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেলা তিনটার পর আমরা নামি সমুদ্রের তীরে। বীচের কিনারায় হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি সমুদ্র বিলাসের দিকে। এটা দেশ বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহম্মেদের প্রপার্টি। বহু আলোচনা শুনেছিলাম লোকমুখে আজ সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে। আমরা গেইটে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি এক এক করে আবার গ্রুপ করে একসাথে। রুমে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নেওয়ায় শরীরটা ফুরফুরে লাগছে। সারোয়ারের সাথে আমাদের জমে উঠেছে আড্ডা। বিকেল চারটে প্রায় আমরা বীচ ধরে এগোচ্ছি ঠিক তখনি দূরে দেখা যায় ভার্সিটির সেই গ্রুপটা তাদের কেহ সমুদ্রে লাফাচ্ছে আবার কয়েকজন ছেলে-মেয়ে তীরে অর্ধগোলাকার হয়ে বসে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে। আমরা তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের মাঝখানে ঢুকে পড়ে সারোয়ার। ওরা প্রথমে বয়স্ক মানুষ দেখে একটু ইতস্তত বোধ করলেও সারোয়ার যেই গান তুলল সকলে এক এক করে যেন মিশে গেল একাকারে। যারা সমুদ্রে ঝাঁপাচ্ছিল এবার তারাও এসে গানের তালে তালে নাচা আরম্ভ করল। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে সারোয়ারের চঞ্চল ভঙ্গিমায় গান গাওয়াটা উপভোগ করছি। গান শেষ হওয়ার পর ওরা চেঁচিয়ে উঠে একসাথেÑআংকেল ওয়ানস মোর, ওয়ানস মোর। সারোয়ার গিটার বাঁজাতে জানে এটা আমাদের কারো জানা ছিল না। এবার সে নিজে গিটার নিয়ে সুর তুলছে আর গাইছে এবং তার সাথে সকলে সুর মিলাচ্ছেÑ

সোনা দিয়া বান্ধাইয়াছি ঘর

ও মন রে ঘুনে করল ঝর ঝর,

আমি কী করে বাস করিব এই ঘরেতে... হায় রে

তুই সে ...আমার মন।।

মন তোরে পারলাম না বোঝাইতে রে... হায় রে

তুই সে ...আমার মন।।

আমাদের প্রতিভাবানকে ওরা কিছুতেই ছাড়বে না অবশেষে কয়েকটা গান গাওয়ার পর ওদের একজন এসে আমাদের জন্য ডাব নিয়ে আসে। ডাব খাওয়ার পর অনিমেষ বলে উঠেÑআজকে ছেড়ে দাও আবার আগামী দিন হবে। বৃদ্ধ হওয়ার এটা হয়তো একটা সুবিধা যে নবীনরা প্রবীণদের সম্মান দেখাতে কার্পণ্য বোধ করে না, মেনে নেয়।

‘পিটার তোমার এই গুনও আছে সেটাতো জানা ছিল না।’

‘আরে দাদা আরও অনেক গুন আছে আপনার পিটারের সেটা বলে বুঝাতে পারব না।’

‘তা কী আর বলতে? তোমার গুন তো হারে হারে বুঝতে পারছি।’ ‘ভাই অনিমেষ প্রশংসা করছ নাকি বাঁশ দিচ্ছ।’

‘আরে না তুমি সত্যি প্রশংসার পাত্র বুঝলে।’

‘কীভাবে বুঝব? এভাবে শোনার অভ্যেস নেই তো তাই বুঝতে পারি না।’

‘হা হা হা....’

আমাদের বিকেলটা বেশ কেটেছে বীচে ঘুরে ফিরে। কারো কোনো পিছুটান নেই, অভিযোগ নেই, দুঃখ নেই যা আছে সেটা নিজেদের নিয়ে মেতে থাকা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুদূর চলে এসেছিলাম এবার ফিরে যাচ্ছি। সমুদ্রে জেলেদের মাছধরা নৌকাগুলো চমৎকার। যদিও এখানকার মানুষগুলো এমন দৃশ্যপটে অভ্যস্ত কিন্তু আমাদের কাছে পুরোটাই চমকপ্রদ। নৌকাগুলো অর্ধগোলাকৃতির হয়তো সাগরের ঢেউ বিবেচনায় এটা তৈরি করা তাই এর আকৃতির এমন রূপ। আমরা অনেকটা কাছাকছি চলে এসেছি এবার। অনেকদূর হাঁটায় ক্লান্তি লাগছে তাই সমুদ্রের তীরে বালিতে বসে পড়ি। সূর্যটা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে সাগরের জলে। জলের বর্ণ এবার পরিবর্তন হয়ে চিকচিক করছে রুপালি ধারায়। পশ্চিমের আকাশ লালচে আভায় মেখে আছে আর দূরে মেঘের খন্ডটাও তার শুভ্রবর্ন ভুলে গোধূলি রঙে রাঙ্গিয়ে নিল। সূর্যটা ঢলে পড়ে এবার সমুদ্রের অর্ধাংশে ডুুবে গেছে আর দূরে একটা নৌকা ভেসে যাচ্ছে সেই ক্যাপশনে। ক্যামেরা তাক করে বেশ কিছু ছবি ক্যাপচার করে নিলাম সে মুহূর্তের, যা চলে যাবে সেটা তো আর ফিরে আসে না। অবশেষে সূর্যটা ঢলে পড়ে পুরোটাই ডুবে যায়। সন্ধ্যা তখনো রাতের রূপে রাঙ্গায়নি। অনিমেষ সিগারেট ধরিয়ে দিব্যি টেনে যাচ্ছে এবং পিটার ও সারোয়ার পুরোটাই নিশ্চুপ। আমরা সকলে দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বেলা শেষের গোধূলি লগনে মন্ত্রমুগ্ধ। রাত নেমে আসায় রুমে এসে গরম জামা-কাপড় নিয়ে নেই, যদিও এখানে শীত তেমন একটা নেই তারপরও রিষ্ক নেওয়া যাবে না।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়