প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৮
শূন্য পাস এড়ানোর উপায়

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এবার ৩০,৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি, যেখানে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান শূন্য পাসের তালিকায় ছিল। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫১টি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার দুই বছরে মোট ১৮৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছিল। বিপরীতে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে পাসের হারও ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কোনো পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে, বরং এটি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শিক্ষাগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এই পরিসংখ্যান শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার দুর্বলতা বলে ভাবা যাবে না। কারণ একটি বিদ্যালয়ে যদি পর্যাপ্ত শিক্ষক, উপবৃত্তি, ভবন, শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা থাকার পরও একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ না হয়, তাহলে সেখানে শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, বিদ্যালয়ব্যবস্থাপনা, উপস্থিতি, পাঠদানের কার্যকারিতা, জবাবদিহি-সবকিছু নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আরও বিস্ময়ের বিষয়, কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যাও বেশি। অর্থাৎ কেবল অবকাঠামো বা শিক্ষকসংখ্যা বাড়ালেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। বরং বিদ্যালয়ের বাস্তব কার্যক্রম, শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান করছেন কি না, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে থাকছে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা আছে কি না, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। শূন্য পাসের পেছনে প্রথমেই যে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার, তা হলো বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা। শূন্য পাসের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে ‘কেন এমন হলো’ এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। একই সঙ্গে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানে গত পাঁচ বছরে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, কতজন নিয়মিত ক্লাস করেছে, কতজন নবম-দশম শ্রেণিতে ঝরে পড়েছে, কোন বিষয়ে বেশি ফেল করেছে, শিক্ষক উপস্থিতির হার কত, ক্লাস নেওয়ার প্রকৃত সময় কত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং বিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার এসব তথ্য একত্র করে প্রতিটি বিদ্যালয়ের একটি ‘পারফরম্যান্স অডিট’ করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা কত ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করে, কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার ওপর কতটা নির্ভরশীল এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে ভালো ফল করা বিদ্যালয় এবং শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা করা প্রয়োজন। কোথায় শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন, কোথায় অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি, কোথায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা সহায়তা দেওয়া হয় এসব পার্থক্য বের করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক সমস্যা, পরিবারের অশিক্ষা, শিশুশ্রম, বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা পরীক্ষাভীতি ফলাফল খারাপ করতে পারে। তাই কোনো বিদ্যালয়ের ফল খারাপ হলেই শুধু শিক্ষকদের দায়ী না করে বিদ্যালয়ভিত্তিক কারণ নির্ণয় করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা মানেই যে মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে, এ ধারণাটিও নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা বেশি হলেও যদি পরীক্ষার ফল অত্যন্ত খারাপ হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই শিক্ষকরা কি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন? শিক্ষকরা কি বিষয়ভিত্তিক দক্ষ? দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে শনাক্ত করে সহায়তা করা হচ্ছে কি? বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কি একাডেমিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন? শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত একাডেমিক পরিদর্শন হচ্ছে কি? শিক্ষক নিয়োগের পর তাঁদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? ডিজিটাল প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিনোদন ও বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট শিক্ষার্থীদের সময় ব্যবহারের ধরন বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি নিজে শিক্ষার শত্রু নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষার অসাধারণ সহায়ক হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।







