প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ১১:১৩
ফরিদগঞ্জে মাদকের কী ভয়াবহ নমুনা-চিত্র!

‘মাদকে সব হারিয়ে শেষে আত্মহনন অটোরিকশা চালকের’--এমন শিরোনাম দেখে পাঠকমাত্রকেই থমকে দাঁড়িয়ে সংবাদটি পড়তে হয়েছে। এ সংবাদটি চাঁদপুর কণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে গতকাল। সংবাদটিতে লিখা হয়েছে, জীবিকার তাগিদে এক সময়ে পাড়ি জমান প্রবাসে। স্বপ্ন ছিলো সুযোগ-সুবিধা ভালো করলে নিজের পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। ফিরে এলেন স্বদেশে। সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে শুরু করলেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন লড়াই। কিন্তু তার আগেই সঙ্গ দোষে মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এক সন্তানের জনক রিয়াজ উদ্দিন (৪৩)। সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন যা আয় হতো, তা মাদক সেবন করে শেষ করে দিতেন তিনি। সংসারে অবুঝ শিশু, স্ত্রী ও বৃদ্ধা মা থাকতেন অর্ধাহারে-অনাহারে। শুরু হয় পারিবারিক কলহ। পরিবার বারবার মাদক ছাড়তে বললেও ফিরে আসেননি তিনি। অবশেষে ভয়াল মাদকের থাবা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল ২০২৬) রাতে ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকার ৭নং ওয়ার্ডের কাছিয়াড়া গ্রামের রাঢ়ী বাড়ি থেকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত রিয়াজ উদ্দিন ওই বাড়ির মৃত খোরশেদ আলমের বড়ো ছেলে। রিয়াজ উদ্দিনের স্ত্রী মিতু আক্তার জানান, আমার স্বামী সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় করতো, তা দিয়ে গাঁজা-ইয়াবা সেবন করতো। এ নিয়ে আমাদের প্রায় বিরোধ হতো। মাদক সেবনে বাধা দিতেই বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে বসত বিল্ডিংয়ের ভেতরে একটি কক্ষে সিলিং ফ্যানের হুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আমার স্বামী। আর কেউ যেন এভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে। রিয়াজের মা নুরুন্নাহার বেগম হাউমাউ করে কেঁদে বলেন, ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম, পরিবারের হাল ধরবে। দেশে ফিরে সিএনজি চালানো শুরু করে। কয়েক মাস আগে থেকে মাদকে জড়িয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেছি ফিরিয়ে আনার, আসেনি। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে। ফরিদগঞ্জ থানার উপপুলিশ পরিদর্শক আবু তাহের জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কোনো অভিযোগ না থাকায় লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মাদকসেবী রিয়াজের এ আত্মহনন ফরিদগঞ্জে মাদকের ভয়াবহতার নমুনা-চিত্র। মাদক যে ফরিদগঞ্জকে কতোটা ভয়াল রূপে গ্রাস করেছে সেটা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বারবার তুলে ধরেছেন ও ধরছেন। টনক যেনো কারোই নড়ছে না। তিক্ত হলেও সত্য কথা এই যে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশসহ অন্যদের ‘লিপ-সার্ভিস’ ছাড়া মাদককে সর্বাত্মকভাবে প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ গলা হাঁকিয়ে কেবল বললেই হয় না। দরকার ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ, যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাদকের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ সৃষ্টি হয়। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি তাদের প্রচার ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্যে প্রদত্ত বরাদ্দের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করা দরকার ফরিদগঞ্জে। ভূমিদস্যুতাও চাঁদপুর জেলার অন্য সকল উপজেলার চেয়ে ফরিদগঞ্জে দেখা যায় বেশি। বাংলাদেশের অনেক উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে একাধিক থানা থাকলেও ফরিদগঞ্জের মতো ডাকাতি, মাদক ও ভূমিদস্যুতাপ্রবণ, অধিক প্রবাসী অধ্যুষিত, ঘনবসতিপূর্ণ ও বড়ো উপজেলায় সেটা নেই। অথচ চাঁদপুরের পার্শ্ববর্তী শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলায় সেটি রয়েছে। একটি হচ্ছে ভেদরগঞ্জ থানা এবং আরেকটি সখিপুর থানা। চাঁদপুর জেলার কচুয়া, শাহরাস্তি, হাইমচর ও মতলব উত্তরে থানার বাইরে পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও ফরিদগঞ্জে সেটা নেই। এ বিষয়ে এ সম্পাদকীয় নিবন্ধে আমরা বহুবার লিখেছি। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (এমপি), সুধীজন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এ ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ না হওয়ায় ফরিদগঞ্জে দুটি থানা কিংবা থানার বাইরে এক বা একাধিক পুলিশ ফাঁড়ি হচ্ছে না। ফলে এখানকার মাদকসহ অনেক অপরাধেরই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। এজন্যে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিগণ একত্রিত হয়ে দাবি আদায়ে সাংগঠনিকভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কিছু করা দরকার বলে আমরা মনে করি।



