প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ১১:২৭
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(বায়ান্নতম পর্ব)
ছেলেদের শৈশব : প্রখর-পর্ব
চাঁদপুর শহরের স্টেডিয়াম সড়কের মাদ্রাসা গলিতে আখতার মনজিলের চারতলায় তখন আমাদের দিনগুলো চলছিলো সুধাস্রোতের মতো। আখতার মনজিল ছিলো অসমাপ্ত পাঁচতলার একটা ভবন। আমরা ছিলাম ভবনটির চারতলায়। যেদিন বাসায় কাপড়চোপড় বেশি ধোয়া হতো সেদিন অসমাপ্ত পঞ্চমতলার আধানির্মিত কক্ষগুলোকে আমরা কাপড় শুকানোর উপযুক্ত স্থান হিসেবে ব্যবহার করতাম। ভবনটির মালিক ছিলেন একজন নারী যিনি তার পিতার সম্পত্তির প্রাপ্য অংশ হিসেবে এর কর্তৃত্ব অর্জন করেন। বৈবাহিক সূত্রে তিনি চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা। মাঝে মাঝে তার স্বামী এসে ভবনের ভাড়াটিয়া বাসিন্দাদের কাছ থেকে কেয়ার টেকার কর্তৃক সংগৃহীত ভাড়া বুঝে নিয়ে যেতেন এবং ভাড়াটিয়াদের সমস্যা-সংকট সমাধান করে দিতেন। তাদের থাকার জন্যে নিচতলায় একটা কক্ষ ছিলো, যেটা কাউকে ভাড়া দেওয়া হয়নি। তাদের আত্মীয় ছিলেন নিচতলার ভাড়াটিয়া রশিদ সাহেব, যিনি পেশায় বাবুরহাট স্কুল এন্ড কলেজের পরিসংখ্যানের শিক্ষক ছিলেন। মূলত তিনিই ভবন মালিকের পক্ষ হয়ে যাবতীয় বিষয়াদি দেখতেন। রশিদ সাহেব নিজে নিচতলায় কয়েকজন ছাত্র পড়াতেন। আমি যখন ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠি তখন তিনি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন এই বলে, যেন আমার বাসায় কোনো ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি পেশাগত প্রয়োজনে না আসেন। তার এই শর্তে আমি অবাক হলেও বিরক্ত হইনি। আমি জানি ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে সমাজে তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণির এক ধরনের অ্যালার্জি আছে। তাদের কাছে এরা অন্যগ্রহের প্রাণীর মতো। যদিও ফ্রি স্যাম্পলের ঔষধ চেয়ে নিতে কিংবা প্যাড-কলম উপহার পেতে কারও কোনো অসুবিধা হয় না। তারা ভুলে যান, এরা এ সমাজেরই কারও ছেলে, কারও ভাই। এরাও সর্বোচ্চ শিক্ষিত ভদ্র সমাজের অংশ। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে এদের অবদান আর কারও চেয়ে কম নয়। এরা নিয়মিত রাষ্ট্রের ট্যাক্স দেয়, মূসক দেয়।
দুহাজার নয় সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা আখতার মনজিলের চারতলায় উত্তর দিকের বাসায় উঠি। বাসাটিতে দুটো বারান্দা ছিল। বারান্দা দুটো ছিলো উত্তর পাশে। নারকেল, সুপুরি আর কাঁঠাল গাছের সমাহারে বারান্দার শোভা ছিলো সবুজময়। এ বাসায় সেপ্টেম্বরের দিকে দ্বিতীয় বেডরুম সংলগ্ন বারান্দায় একটি লক্ষী পেঁচা এসে উপস্থিত। দিনের বেলায় লক্ষীর বাহনটি বারান্দায় বসে থাকতো আর সাঁঝ হলে নারকেল গাছে আশ্রয় নিতো। প্রত্ন আর তার মায়ের আগ্রহ ও যত্নে লক্ষী পেঁচাটির খাবারের অভাব হতো না। শ্বেতশুভ্র পেঁচাটিকে দেখলেই মনে একটা নির্মলতা তৈরি হতো। পেঁচাটি যেদিন থেকে আর সেখানে দেখা গেলো না, সেদিনই আমরা প্রখরের মাতৃজঠরে অধিষ্ঠানের শুভ সংবাদটি পাই। প্রখর যেদিন মায়ের গর্ভে তার অবস্থান পূর্ণ করে পৃথিবীর আলো দেখলো সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। রাত আটটার পরে চাঁদপুর স্টেডিয়াম রোডের জেনারেল হাসপাতালের ওটিরুমে তার জন্ম। বড়োভাই প্রত্ন আসার সময় তার মাকে অস্ত্রোপচারের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো বিধায় প্রখরের আগমনেও একই পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটেনি। আমাদের প্রিয় মিনুদির হাতে প্রখর আলো দেখে পৃথিবীর। বড়োভাই প্রত্নের নামের সাথে সাযুজ্য রেখে তার নাম রাখা হয় প্রখর পীযূষ বড়ুয়া। সাড়ে তিন বছরের বড়োভাইয়ের হাতে দোলনায় দোল খেতে খেতে প্রখর বেড়ে ওঠে ভাইয়ের খেলার সাথী হয়ে।
তিনমাস বয়স থেকেই প্রখর মায়ের বুকে ক্যাঙ্গারু ব্যাগে লেপ্টে থেকে ভাইয়ের স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করে। স্কুলের গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে স্যার-ম্যাম, বড়োভাই-বড়োবোনেরা তাকে আদর করে যায়, পাহারা দেয়, কোলেও নেয়। স্কুলে বড়োভাইয়ের সহপাঠীদের কাছে সে-ও যেন একটা খেলার পুতুলে পরিণত হয়ে যায়। এভাবে যেতে যেতে প্রখর একদিন নিজেই ঐ স্কুলের ছাত্র হয়ে যায়। তার শৈশবের আহার মায়ের হাতে পায়েসান্ন। বড়োভাইয়ের স্কুলের পিকনিকে সে-ও যায় কীর্তিকুঞ্জে আমাদের সাথে। তাকে সাহচর্য দিতে আমাদের সাথী হয় জরিনা। জরিনা হলো সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সহকারী। জরিনার বোন সখিনা ছিলো আমাদের গৃহকর্মে সহযোগী। হামাগুড়ি বয়স হতে মুখে যখন তার বোল ফুটতে শুরু করে তখন ব্যথা পেলে সে বলতো, ‘মাগো বাবা’। তার এই বলার মধ্যে একটা ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া যেতো। রিকশায় একবার নগর ভ্রমণে বের হলাম আমরা চারজনের পরিবার। আমার কোলে প্রত্ন আর তাদের মায়ের কোলে প্রখর। রাত নয়টা-দশটার দিকে আমাদের নগর ভ্রমণ শেষে রিকশাযোগে ফিরছিলাম আপনালয়ে। লেকের পাড় ধরে মিশন রোডের ওপর দিয়ে রেললাইনের সমান্তরালে চলতে চলতে একসময় বিদ্যুৎ কিছুটা সময়ের জন্যে বিরাম নিলো। পৌরসভার নগরবাতিগুলো নিভে গেলো। নিভে গেলো আশেপাশের বিপণী ও আবাসনের কৃত্রিম আলোক। এ সময় দৃশ্যমান হয়ে উঠলো আকাশে নিরবে উঁকি দেওয়া চাঁদ। এতোক্ষণ কৃত্রিম আলোর ঝলকানিতে চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতা চোখে পড়ছিলো না। কিন্তু বিদ্যুৎ-বিরামের ফুরসতে চাঁদ বিকশিত হলো আপন মহিমায়। জোছনায় আলোকিত লেকের শোভায় তার মায়ের কোলে বসা প্রখর বলে উঠলো,’আইপিএস আইপিএস’। তার উল্লসিত বলার ভঙ্গিতে আমরাও হেসে উঠলাম। তার এই মনোভাবের প্রকাশ আমাকে চিন্তার খোরাক জুগিয়ে দিলো। সারাদিন সূর্য হতে আলো নিয়ে চাঁদ যেন আইপিএস হয়ে ঠিকই আমাদের রাতের আঁধারে সার্ভিস দিয়ে যায়।
বাংলা ভাষার বর্ণমালা আসলে একটু কঠিন অন্য ভাষার চেয়ে। বিশেষত ইংরেজির চেয়ে তো বটেই। কোন্ বর্ণে পূর্ণমাত্রা, কোনটায় অর্ধমাত্রা আর কোনটা মাত্রাহীন তা মনে রাখা অনেকেরই বেগ পাওয়ার বিষয়। কোনটাতে পাগড়ি, কোনটায় আঁকড়ি, কোনটায় টিকি এটা মনে রাখাও বেশ কঠিন। এ রকম একটা মাত্রাজনিত ভুল আমাদের হাসির খোরাক হয় একবার। চাঁদপুর শহরের কালীবাড়িতে বইয়ের লাইব্রেরি আছে হাতে গোণা কয়েকটা। আমরা ফুল টিম আর্মি মানে সপরিবার রিকশায় চড়ে গিয়েছিলাম নিউমার্কেট। আসার পথে একটু যানজট থাকায় কালীবাড়ি মোড়ে রিকশা
আটকে থাকে। ওই সময়ে ছোট্ট প্রখরের চোখ যায় লাইব্রেরির সাইনবোর্ডে। এর পরেই সে আওয়াজ দেয়, ‘বই বিচিয়ে’। আওয়াজ শুনে আমরা অবাক হয়ে দেখি। সাইনবোর্ডে চোখ গেলো সবার। মাত্রা ছাড়া ‘বিচিত্রা’র ত-রফলা হয়ে গেলো ‘এ’। ফলে উচ্চারণটা ‘বই বিচিত্রা’ না হয়ে ‘ বই বিচিএা’ হয়ে গেলো। সেই ছোট বয়সে তার বর্ণ পরিচয় ও তার সঠিক উচ্চারণ আমাদের দারুণ চমকিত করেছিলো।
দুহাজার পনের সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহনবাঁশি স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে ছড়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয় প্রথমবারের মতো। এতে ছোটদের ছড়া আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ছিলো। চার বছরের কাছাকাছি বয়সের প্রখরও ছিলো একজন প্রতিযোগী। সব প্রতিযোগী ছড়া আবৃত্তি করতে এসে আগে সালাম দিচ্ছে সবাইকে। তারপর তাদের ছড়া আবৃত্তি করছে। প্রখরের নাম যখন ডাক পড়লো তখন সে যথারীতি মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনের সামনে নিজেকে স্থাপন করে। তারপর শুরু করে,’ ওয়ালাইকু সালাম।’ তার বলাটুকু শুনে বিচারক সামীম আহমেদ খানসহ সবাই হেসে দেন। নিজের হাসি থামিয়ে তাকে তিনি শিখিয়ে দেন কী বলতে হয়। অতঃপর তার আবৃত্তি সে পরিবেশন করে। স্কুলে প্লে ক্লাসে পড়াকালীন তানিয়া ম্যাম তাকে একটা গান শিখিয়ে নেন যা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সামনে গাইতে হয়েছিলো। তানিয়া ম্যাম হার্মোনিয়ম বাজিয়ে তাকে দিয়ে গানটা গাইয়েছিলেন। গানটা গাইতে গিয়ে তার শ্বাস নেওয়ার ভঙ্গিটা ছিলো যেন খুব মেহনত হচ্ছিল সেরকমই। খেলার মাঠের অভাব, খেলার সময়ের অভাব এবং খেলার সাথীর অভাব প্রখরদের জন্যে একটা বড়ো পীড়া ছিলো। স্কুলে মাঠ ছিলো না তবে আঙ্গিনা ছিলো। সে আঙ্গিনায় খেলার সাথী ও সরঞ্জামের অভাবে সে একা একা পানির খালি বোতলকে ফুটবল মনে করে খেলতো। এটাই ছিলো তার সুখ ও সান্ত্বনা। স্টেডিয়াম রোডের কাছে বাসা হওয়াতে ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে সে ভর্তি হয় আগ্রহ নিয়ে। দুপুর দুটোয় তাকে যেতে হতো আউটার স্টেডিয়ামে। কিন্তু প্রতিদিন নিয়ে যাবে কে? তাই একসময় তার ক্লেমনে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তার ওপর একদিন যেতে দেরি হওয়ায় থ্রি পড়ুয়া ছেলেটাকে কয়েকবার মাঠ চক্কর দিতে হয়। এর পরদিনই সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়। ছেলের জ্বর হওয়ায় তার মা আর ঐ খা খা রোদ্দুরে ছেলেকে পাঠাননি। ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও সময় সমন্বয়হীনতার কারণে মাঠের ক্রিকেটে প্রখরের বিচরণ করা হলো না। তবে ক্রিকেটের সব খুঁটিনাটি সে তার বাবার কৈশোরের মতোই মনে রাখতো। কোন্ খেলোয়াড় কোন্ ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়, বিপিএল-আইপিএলে কার দাম বেশি এগুলো সব তথ্যই তার নখের আগায় থাকতো, যা আজও বলবৎ আছে।
ক্লাস ফোরে পড়াকালীন প্রখর এক মজার ঘটনা ঘটায়। তার সহপাঠী স্যামুয়েলের জন্মদিনে তার ইচ্ছে হলো বন্ধুকে কিছু উপহার দেওয়ার। এটা বাবা-মা কাউকে সে জানিয়ে বিব্রত করতে চায়নি। তাই শিলু ম্যামের কাছে পড়তে গিয়ে ব্যাগে করে কিছু কাপড়চোপড় সে নিয়ে যায় স্যামুয়েলকে দেওয়ার জন্যে। বলাবাহুল্য ওগুলো ছিলো তার ব্যবহারের পরিধেয়। পরে আমি জানতে পেরে একটা চকোলেটের বাক্স কিনে দিয়েছিলাম তার বন্ধুর জন্যে। আর স্যামুয়েলের মা প্রখরের পরিধেয়গুলো ফেরত দিয়েছিলেন ওর মায়ের সাথে কথা বলে।
ছোটবেলায় তার মায়ের হাত ধরে পীযূষ কান্তি রায় চৌধুরীর বাড়িতে গেলে প্রখর দাদার সাজিয়ে রাখা তবলায় ইচ্ছেমতো টুংটাং বাজাতো। পরে অবশ্য দাদার কাছেই তার হাতেখড়ি হয়, বাদ্যে ও কণ্ঠশিল্পে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের জারিগান গাইতে গিয়ে সে ভুল ধরায় তৎপর থাকে বড়োদের। সুরধ্বনির অনুষ্ঠানে সে প্রথম লুঙ্গি পরে লোকগানে অংশ নেয়। মাথায় একটা গামছাও বাঁধা ছিলো তার। শৈশবের প্রখর পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে হয়ে গেলো লেখক। ক্রিকেট নিয়ে তার একটা মুক্তগদ্য ছাপা হয়ে গেলো বিখ্যাত ‘শিশু’ পত্রিকায়। এর পরেই করোনা নিয়ে লেখা ছড়া ছাপা হয় দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে। কাছে থেকে দেখা প্রখর তার শৈশবের দিনগুলোর কারণে আমার লেখায় চরিত্র হয়ে এসেছে বার বার। লম্বা একটা করোনা ভ্যাকেশন তাদের জীবনকে গৃহান্তরীণ রেখে শৈশবকে তাড়াতাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও শৈশবের প্রখর ছিলো নিজ ঘটনাচক্রে বর্ণিল। (চলবে)






