প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ১১:২৫
সাইকোলজিকাল থ্রিলার
ছায়া শিকারি

এক.
২১২৫ সালের এক সন্ধ্যা। পাহাড়ের গভীরে নির্জন এক কারাগার। অল্প আলোয় সঙ্কীর্ণ জায়গাটাতে একটা মানুষের ছায়া পড়ে। সেই ছায়াটা বেশ দীর্ঘ। বেরিয়ে আসে দীর্ঘ দুটো কালো হাত। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে অলিগলি ধরে। বীভৎস আর বিকৃত এক মুখ, যা দেখে ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠার মতো। সে আরও আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যায়, তারপর একজন বন্দিকে গলা চেপে ধরে, ভয়ের চোখে বন্দি ছায়ার দিকে তাকায়, সে চিনতে পেরে তার নামটা উচ্চারণ করতে যাবে, এ সময় ছায়ার মতো লোকটা তার গলার চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়, লোকটা বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে থাকাবস্থায় প্রাণবায়ু বেরিয়ো যায়।
এ কারাগারে ক’জন নারী ও পুরুষ বন্দিকে নির্যাতন করা হচ্ছে। তাদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে না। কারণ তাদের মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো। তারা জানে না তাদের অপরাধ কী? একজন শব্দ-পুলিশ তাদেরকে একটা যন্ত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখে। যন্ত্রটা শব্দ মাপে, ডেসিবেল স্কেলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যন্ত্রটা কিছুই ধরতে পারে না। কারণ, তারা চিৎকার করলেও শব্দ নেই। যেনো শব্দ নিজেই কারাবন্দি।
তাদের শারীরিক যন্ত্রণা থাকলেও শব্দ নেই, এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। একজন বন্দি, যিনি একসময় ছিলেন কবি ও গায়ক, তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, এই শহরে শব্দ মানেই বিপ্লব। তিনি চেষ্টা করেন ‘হৃদয়ভাষা’য় কথা বলতে, যা শব্দহীন, কিন্তু অনুভবযোগ্য।
শব্দ-পুলিশের এসআই জামশেদ ধীরে ধীরে বন্দিদের কাছে এগিয়ে এলো। তারপর তাদের যন্ত্রণাকাতর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “এই শহরে শব্দ নিষিদ্ধ তোমরা কি তা জানো না?”
মাথা নাড়ালো লোকটা। সে এক সময়ের জনপ্রিয় কবি, যিনি শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয় নাড়া দিতেন। তার কবিতায় ছিলো প্রতিবাদের সুর, প্রেমের ভাষা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরব বিদ্রোহ। একটি কবিতা লিখেছিলেন, ‘শব্দেরা আজ বন্দি, অথচ হৃদয় চিৎকার করে’ যা ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, শব্দ হারালেও ভাব হারায় না। এখন তিনি চেষ্টা করছেন হৃদয়ভাষায় কথা বলতে, চোখের ভাষা, স্পর্শের ভাষা, নিঃশ্বাসের ছন্দে।
এই কবির নাম তুষার আহমেদ। তার বান্ধবীর নাম লায়লা। এখানে সেও আছে। লায়লা এক সময়ের রেডিওর কণ্ঠস্বর, যিনি প্রতিদিন মানুষের ঘরে ঘরে সাহস ও সান্ত্বনার বার্তা পৌঁছে দিতেন। একদিন লাইভ সম্প্রচারে তিনি বলেছিলেন, “শব্দকে ভয় পেও না, ভয় করো নিঃশব্দতাকে।” এরপরই তার কণ্ঠস্বর চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার জন্যে এখানে তুলে আনা হয়। শত নির্যাতনের পরও তিনি এখনো মনে মনে ঘোষণা পাঠ করেন, যেনো শব্দহীনতাকেও ছুঁয়ে যায় তার কণ্ঠের স্মৃতি।
এখানে আরেক সেলে নির্যাতিত হচ্ছেন রাশেদ। তিনি এক সময়ের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, যিনি শহরের শব্দ-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একদিন তিনি নিজেই সেই প্রযুক্তিকে হ্যাক করে ‘নিঃশব্দের শহরে’র কেন্দ্রীয় ঘোষণায় একটি শব্দ ঢুকিয়ে দেন, ‘স্বাধীনতা’। তিনি নিজেকে দায়ী মনে করেন এই নিপীড়নযন্ত্র তৈরির জন্যে, কিন্তু এখন তিনি মুক্তির পথ খুঁজছেন প্রযুক্তির মধ্যেই।
এখানে আরও আছেন নাহার নামের একজন নারী। যিনি শিশুদের জন্যে কাজ করতেন। যারা শব্দহীন হয়ে বেড়ে উঠছে তাদের জন্যে। জন্ম থেকেই তাদের কণ্ঠস্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক শিশুর মুখে শব্দ ফিরিয়ে আনার জন্যে তিনি একটি নিষিদ্ধ যন্ত্র ব্যবহার করেন, একটি ছোট্ট রেকর্ডার, যাতে ছিলো একটি ‘ঘুমপাড়ানি গান’। তিনি বিশ্বাস করেন, শব্দ ফিরে আসবে শিশুর কান্না দিয়ে, হাসি দিয়ে, গান দিয়ে।
শব্দ-পুলিশ শত চেষ্টা করেও এই ক’জনের নিঃশব্দতা রক্ষা করার শপথ ভাঙ্গতে পারে না। বন্দিরা হাজার নির্যাতনেও কিছু বের করছে না, তথ্য দিচ্ছে না— কারা এদের প্রধান নিয়ন্ত্রক। বন্দিদের চিৎকার না করার অভিজ্ঞতা তার ভেতরে প্রশ্ন জাগায়, “যদি শব্দ না থাকে, তবে আমি কী পাহারা দিচ্ছি?”
এসব বিষয় ভেবে সে গুহার বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর তাদেরকে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে মুখের স্কচটেপ খুলে বের করে দেওয়া হয়। বন্দিরা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বাইরে বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শব্দ-পুলিশের এসআই জামশেদ গোয়েন্দা প্রধান ‘কারুণ’-এর কাছে কল করে।
কারুণ বলে, “এদেরকে ছেড়ে দিয়ে অনুসরণ করো জামশেদ। যাতে ভবিষ্যতে আমরা এই দলটির পালের গোদাটাকে ধরতে পারি।”
ঢাকা শহর আমূল পাল্টে গেছে। শুধু ঢাকা শহর নয়, পুরো বাংলাদেশের আনাচে কানাচে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। গ্রাম বলে এখন আর কিছুই নেই, সবকিছুতেই প্রযুুক্তির ছোঁয়া। শত বছরের আগের বাংলাদেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো মরা মানুষকে যদি জীবিত করা যেতো, তাহলে সে বলতো, “এটা কোন্ দেশ! ইউরোপ-আমেরিকা নাকি?”
এখানে এখন আগের সব ঘুণে ধরা দালান-কোঠা নেই। ২০ বছর আগেই সেগুলো সব বুলডোজারে ভেঙ্গে দিয়ে গড়ে উঠেছে পঞ্চাশ-একশ’তলা বিল্ডিং। মানুষ এখন আর আগের মতো নেই। সবাই ধনী। কিন্তু সঙ্কটে এখন মানুষের শব্দ। এখানে শব্দের বিকিরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষ শব্দ করে কথা বলতে পারে না। শুধুই ফিসফিসিয়ে কথা বলে রোবটের মতো। এখানে শব্দের উচ্চারণে মতবিরোধ। তাই ইরফানও কথা বলা ভুলে গেছে ছোটকাল থেকে। সে এখন মূক, তবে বধির নয়। পড়াশোনা করে মেডিকেল কলেজে।
আজ কলেজের প্রথম দিন। তার সঙ্গে ক্লাসে প্রথম দেখা বৃষ্টি, অনন্যা, অধরা, তাসফিয়া, রুবিনা, ইমতিয়াজ, আরাধ, ইরিনা, লীনা, শিশির, তাসফিয়া, অপরূপা, সেলিম, সোহাগী, রুবিনা আর তুষার আহমেদের। ক্লাসমেট সবাই।
ক্লাসে ইরফানের চুপথাকা নিয়ে সবাই হাসাহাসি করে। সবাই ফিসফিসিয়ে কথা বললেও নির্বাক যেনো ইরফান। সে শুধু দু চোখ দিয়ে তাকিয়ে লেকচার শুনে আর নোট করে। কিন্তু কোনো দিকে তাকায় না, কথা বলে না।
ক্লাস শেষে বৃষ্টিই প্রথম ইরফানকে প্রশ্ন করলো, “তুমি কি বোবা নাকি?”
ইরফান হাসে, সে বোবার মতোই কিছু ইঙ্গিত করে বৃষ্টিকে বোঝাতে চায়-- সে কথা বলতে পারে না।
অধরা বলে, “আসলেই কি তুমি বোবা? কথা বলতে পারো না?”
বৃষ্টি বাধা দেয়। সে বলে, “যদি কথা বলতে পারতো তাহলে তো কথাই বলতো। ইঙ্গিতে বোঝাতে আসতো না। ঠিক না?”
তাসফিয়া মজা পায় যেনো, সে বৃষ্টিকে বলে, “তুমি কি আগে থেকেই বোবা ইরফানকে চিনতে?”
উত্তর দেয় বৃষ্টি, “জানি না। তবে মনে হয় এই জনমে হয়তো কোথায় কোনো নির্জন স্থানে তাকে কখনও দেখেছি!”
‘ওহ।’ রুবিনা একটা গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ে। তারপর বলে, “মানুষ স্বপ্নেও কতো কিছু দেখে। এটাই হয়তো কিছু কিছু মানুষের স্বভাব।”
এ সময় ইমতিয়াজ এগিয়ে আসে, তারপর ইরফানের কাঁধে হাত রাখে। বলে, “কী হে, কথা বলতে পারো না নাকি?”
কাছাকাছিই ছিলো আরাধ নামের আরেক ক্লাসমেট। সেও এগিয়ে আসে তাদের কথা শুনে। তারপর ইরফানকে বলে, “কথা বলো ইরফান। তোমার ভাষাটুকু আমরা শুনতে চাই।”
ইরফান এ সময় খাতায় লিখে প্রশ্ন করে, “তোমার নাম কি?”
আরাধ নিচে লিখে দেয়, “আমার নাম আরাধ।”
ইরফান খাতায় লিখে প্রশ্ন করে, “তোমার নামের অর্থ কি?”
“আরাধ হচ্ছে আরাধনা’র প্রতিচ্ছবি।” আরাধ লিখে জানায়।
ইরফান খাতায় লিখে, “অথচ তার বিপরীত- ধ্বংসও হতে পারে।”
সবাই ইরফানের খাতায় এই মজা করা দেখে হেসে গড়িয়ে উঠে। কিন্তু ইরিনা ও লীনা নিশ্চুপ। এটা দেখে আরাধ হাসে না, সে বলে, “হতে পারে। কোনো একদিন আমিই নামের বিপরীতে গিয়ে এই পৃথিবীকে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠবো। অথবা কোনো কাজ করবো, যা মানুষ চিরকাল স্মরণ করবে।”
আরাধের কথা শুনে ওরা সবাই হাসে। কিন্তু ইরফান হাসে না। তার মনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র, যেখানে সবাই নিঃশব্দ। কথা বলায়ও নিষেধ। সরকারের বিপরীতে কেউ কথা বলতে পারে না। সবকিছু বলা যায়, কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা যায় না, মানুষকে মূক হয়ে থাকতে হয়। দিন দিন কথা বলতে না পারার কারণেই ইরফান মূক হয়ে যায় জীবনের শুরু থেকেই, সে কবিতা লিখতে পারে না। গান লিখতে পারে না। বিপ্লবের সুর বাজাতে পারে না। তাহলে, সমাজে কী আর আছে? এর চেয়ে বোবা হয়ে থাকাই ভালো। বোবার কোনো শত্রু নেই!
ইরফানকে ভাবতে দেখে বৃষ্টি প্রশ্ন করে, “তুমি কেনো কথা বলো না ইরফান। সত্যি তুমি বোবাই নাকি?”
ইরফান খাতায় লিখে, “একটি নিঃশব্দের বাংলাদেশ, যেখানে আজ শব্দ একটি নিষিদ্ধ জিনিস। কোনো মানুষ উচ্চস্বরে কথা বলতে পারে না, গান নেই, পাখির ডাক নিঃস্বরে, আর প্রতিটি শব্দ রেকর্ড হয় ‘ধ্বনি-পুলিশ’ নামক টহল বাহিনীর দ্বারা। কারণ, একশ’ বছর আগে শব্দ নাকি বিপ্লব ঘটিয়েছিলো। আমি কবিতা লিখতে ভুলে গিয়েছি, আমি বিপ্লবের গান গাইতে ভুলে গিয়েছি তাই। আমাকে বাকরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে ছোটকাল থেকেই। কারণ বাবা-মা বলতো, তুমি যদি বিপ্লবের গান গাও, তুমি যদি সংস্কারের কবিতা লেখো, তাহলে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। গারদে ঢোকাবে, নির্যাতন করবে। তাই তুমি এসব করবে না। এসব শুনে শুনে আমি বড়ো হয়েছি, বাকরুদ্ধ হয়েছি, কথা বলতেও ভুলে গেছি।”
একটা নিঃশ্বাস ফেললো বৃষ্টি। সে খাতায় ইরফানের লেখা কথাগুলো পড়ে অন্যদের দিকে তাকালো। অন্যরাও লেখাটুকু পড়লো। এ সময় কথা বলে উঠলো আরাধ, “ঠিক আছে। তোমার কথা না বলাই ভালো, তোমার বিপ্লবের কবিতা না লেখাই ভালো, গান করাও তোমার অনুচিত। কারণ তুমি তাহলে সরকারের বিপরীতে কথা বলবে, গান গাইবে। এখানে এসব শব্দ বারণ। তুমি জানো না, এটা নিঃশব্দের শহর?”
বৃষ্টি উত্তর দিলো, “তাহলে মানুষ বাঁচবে কী করে? মুখ বন্ধ করে কি বেঁচে থাকা যায়?”
“হ্যাঁ, বেঁচে থাকা যায়।” উত্তর দিলো আরাধ। “আমরা সরকারের কাছ থেকে মাসিক ভাতা পাই, আমাদেরকে রোজগার করতে হয় না। কষ্ট করে কাজ করতে হয় না, এর বিনিময়ে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলাও যায় না। যেমন গিভ এন্ড টেক। বুঝতে পারছো?”
ইমতিয়াজ এবার উত্তর দিলো, “কিন্তু এটা তো আমরা চাইনি, আমরা কথা বলার অধিকার চাই। আমরা বিনা উপার্জনে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে চাই না। কষ্ট করে রোজগার করে বাঁচবো, কিন্তু আমাদের কথা বলার অধিকার দিতে হবে।”
ইরফানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, সে খাতায় লিখলো, “প্রতিবাদকারীদের ভাষা কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না। হয়তো কিছুকাল তাদের দমিয়ে রাখা যায়।”
“এটা আমাদের জন্যে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে ইরফান।” খাতায় লিখলো আরাধ। তারপর মুখে উচ্চারণ করলো, “নিঃশব্দের এই শহরে তোমরা সরকারের বিরুদ্ধে শব্দ উচ্চারণ করে বেঁচে থাকতে পারবে না। মরে যেতে হবে। অথবা বন্দিশালায় তিলে তিলে নির্যাতনে মরবে।”
“তাহলে তো মৃত্যুই ভালো।” বৃষ্টি ধীরে ধীরে নিকটবর্তী হচ্ছে ইরফানের। তারপর তার খাতায় লিখলো, “আসলে আমরা সবাই জন্মেছি মৃত্যুর জন্যেই, কিছুকালই শুধু এখানে বেঁচে থাকা। তবে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের কথা বলার অধিকারটুকু ফিরিয়ে দিতে হবে।”
জামশেদের হাতের আইপডের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কয়েকটি মুখ। সে এগুলো পর্যালোচনা শুরু করলো। তারপর তাদের শব্দ-প্রতিশব্দগুলো শুনতে লাগলো। তার মুখে একটা ক্রুর হাসি ভেসে উঠলো। মনে মনে বললো, “শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে শনাক্ত করবো, তারপর যা করার দরকার তা-ই করবো।” (চলবে)







