প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৮
নাতনি আরমা দত্তের চোখে ব্যক্তি ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

আরমা দত্ত ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রস্তাবকারী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি, কবি ও সাংবাদিক সঞ্জয় দত্ত এবং প্রতীতি দেবীর কন্যা, মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও নারীনেত্রী। ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমাদের চেতনায়-সত্তায়-অনুভবে ভাষা নিয়ে, ভাষা শহীদদের নিয়ে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। যার মাধ্যমে আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার লাভ করি, সেই ভাষা দিবস নিয়ে আবেগ অনুভূতি থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ভাষা সৈনিক ও ভাষা শহীদদের নিয়ে লেখালেখি একেবারে যে হয় না তা নয়। অন্তত ফেব্রুয়ারি মাস এলে চেতনার জায়গা থেকে হোক , অথবা দায়বোধের দিক থেকে হোক, ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিকদের আত্মাহুতি ও অবদানকে স্মরণ করা হয়, তাদের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও
সভা-সমাবেশের মাধ্যমে। কিন্তু একটা জায়গায় এসে আমরা কৃপণতা অথবা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না অনেক দিন ধরে। আমরা দেখে এসেছি যে, যে পথ দেখায় সে থাকে সবার আগে। তঁার নাম লেখা হয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। সে ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কিন্তু একটা জায়গায় যেন সে ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে প্রায়শই আমার মনে হয়। হ্যঁা, আমি বলছিলাম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা। সে মানুষটি যতো বড়ো ছিলেন , যতো মহান ছিলেন ততোটা সত্যিকারে পেঁৗছায়নি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কী কারণে জানি।
ভাষা আন্দোলনের কথা বলতে প্রথমেই বলতে হবে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলার প্রথম প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন তিনিই। অথচ সে মানুষটির সঠিক মূল্যায়ন আমরা করতে পারি নি। উপযুক্ত সম্মান আমরা বাঙালিরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে দিতে পারিনি। তিনি শুধু ভাষা সৈনিক ছিলেন না, তিনি একজন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের মানুষ আর দেশকে ভালবাসতেন হৃদয় দিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অমায়িক মানুষ। আরমা দত্তের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘আমার দাদু শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং অন্যান্য’ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি তঁার চরিত্রের নানা দিক, যা আমাদের জন্যে হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যা অনুসরণ করে একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এবং পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত চিন্তায় মননে ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক মানুষ। আরমা দত্ত বলেন, “আমার দাদুর মত আধুনিক মানুষ আমি এখনো খুব একটা দেখি না। তঁার নীতি, চরিত্র ও চিন্তাধারা ছিলো বহু বছর এগিয়ে। তঁার মত উদার, সবদিক থেকে আধুনিক সংস্কারমুক্ত মানুষ এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়ে না। নারী জাতিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন তিনি। তিনি বাড়ির একজন কাজের মেয়েকে মা ছাড়া ডাকতেন না। আরমা দত্ত তঁার দাদুর স্মৃতি বলতে গিয়ে বলেন,’’ আমি নয় বছর বয়সে যে সমাজ বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনেছি আমার দাদুর কাছে, তা পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানের গাদা গাদা বই পড়েও শিখতে পারি নি।”
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত খুব সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাস করতেন। ঘরের কোনো মহিলাকে ২০ টাকা দামের বেশি শাড়ি কিনতে দিতেন না। তিনি ছিলেন একজন দয়ালু মানুষ। তিনি প্রায়ই বিনা পয়সায় তঁার দরিদ্র মক্কেলদের সমস্যা সমাধান করে দিতেন। তিনি বলতেন, “গরিবদের কাছ থেকে পয়সা না নিলে আমি হয়তো বড়লোক হবো না। কিন্তু না খেয়ে তো মরবো না। কিন্তু গরিবরা টাকার অভাবে না খেয়ে মরবে।”
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ধর্ম ব্যবসায়ীদেরকে পছন্দ করতেন না। ধর্ম নিয়ে যারা কথা বলতো তাদেরকে তিনি বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকতে দিতেন না। সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আরমা দত্ত বলেন, “দাদু বারবার বলতেন, যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ব্রিটিশরা এই দেশে বুনে দিয়ে গেছে, মৃত্যু সাল হিসেবে তার থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি মাত্র পদ আছে। আর তা হলো এই দেশে ইন্টার্মেরেজ হওয়া। যেদিন এটা ঘরে ঘরে হবে, সেদিন বুঝবে এই দেশের মুক্তিলাভ ঘটেছে এবং অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। পাকিস্তান হয়েছিলো ধর্মের ওপর ভিত্তি করে, আর আজ বাংলাদেশ হয়েছে বাংলা ভাষার ওপর ভিত্তি করে।” এ প্রসঙ্গে আরমা দত্ত বলেন, “বাংলাদেশের জন্মের জন্যে আমার দাদু শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান কতোটুকু? অবদানের কথা সবাই জানে, কিন্তু তার সম্মানজনক স্বীকৃতি কোথায়?”
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪২ সালে আইন অমান্য আন্দোলন পর্যন্ত রাজনীতি করার দায়ে তঁাকে পঁাচবার কারাবরণ করতে হয়েছে। যুক্তফ্রন্টের সময় তিনি ১৯৫৬ সালে পূর্ববাংলার স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনে কাজ করায় তিনি তখন কারাবরণ করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তঁাকে বাড়িতে অন্তরীণ রাখা হয়।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন নরম মনের মানুষ। ভালোবাসতেন ফুল-পাখি-শিশু। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আরমা দত্ত বলেন,
“আমার দাদু শিউলি ফুল খুব পছন্দ করতেন, বাড়ির আঙ্গিনায় একটা ছোট্ট শিউলি ফুলের গাছ ছিলো। দাদু বারান্দায় সকালের চা খেতেন, তখন দুটি কাক, এক জোড়া শালিক, একটা বেড়াল এবং কয়েকটি চড়ুই দাদুর থালা থেকে দিব্যি নিজেরা খেয়ে যেতো। এ দৃশ্য আমি খুব কমই দেখেছি। আমি সিঁড়ির নিচে বসে মালা গঁাথতাম, আড় চোখে দেখতাম আর ভাবতাম, মানুষ আর পশু-পাখি কী করে এই মিল হয়!”
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, সুনামগঞ্জ।
নিলয়, ১৭৪/৩ পূর্ব নতুন পাড়া, ০১৭১৬৭৩৮৬৮৮।
ংফংঁনৎধঃধ২০২২@মসধরষ.পড়স







