প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৫
মাটিখেকোদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন

মেঘনার চর-এখন কিছু মানুষের কাছে লুটের মাল। রাত নামলেই শুরু হয় মাটিখেকোদের তাণ্ডব। ফসলি জমি কেটে, টপসয়েল তুলে, কয়েক কিলোমিটার জুড়ে চর দখলের এই তৎপরতায় দিশেহারা চঁাদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের কৃষকরা। এলাকাবাসীর ভাষায়, এটি যেন পরিকল্পিত ভূমিদস্যুতা। সদর উপজেলার ১১নং ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র নির্বিঘ্নে চর কেটে দখল করে আসছিলো। গত ক’দিন ধরে সন্ধ্যার পর থেকেই ভারী যন্ত্রপাতির শব্দে কেঁপে উঠছিলো বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। কৃষিকাজের জন্যে প্রস্তুত জমিতে ঝিল কেটে ‘প্রজেক্ট’ তৈরির নামে টপসয়েল বিক্রি করাই ছিলো মাটিখেকোদের মূল উদ্দেশ্য। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে সদর উপজেলা প্রশাসন একটি অভিযান চালায়। অভিযানে কৃষিজমি কাটার কাজে ব্যবহৃত ৫টি এক্সেভেটর (ভেকু) বিকল করা হয় এবং ভেকুর দু শ্রমিক হাফেজ মাল (৩৮) ও গোলাম রাব্বানী (৩০)কে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা আইনে তাদের প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়পূর্বক ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাপ্পী দত্ত রনি। তিনি জানান, কৃষিজমি ও সরকারি চর দখলের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রাখা ভেকুগুলো ঘটনাস্থলেই বিকল করা হয়েছে। আইন অমান্য করলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। তারা জানান, ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের চালিতাতলী মৌজার এসব চরে বহু বছর ধরে ফসলি জমিতে কৃষিকাজ হয়ে আসছে। প্রতি মৌসুমে তারা সরিষা, আলু, ধনিয়া, কালিজিরা, ধানসহ নানা ধরনের শাকসবজির চাষ করে থাকেন। এই চরাঞ্চলের কৃষিই হাজারো পরিবারের জীবিকার একমাত্র ভরসা। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী শরীয়তপুর জেলার মমিন দিদার, স্থানীয় শাসন গাজী, আবু তাহের গোলদার, বিল্লাল গাজী, হারুন হাওলাদার, হানিফ, কাদির ছৈয়াল, রফিক মল্লিক, ইকবাল পাটোয়ারীর নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র ফসলি জমি নষ্ট করে এসব চর কেটে দখলের মাধ্যমে প্রজেক্ট তৈরি করছে। সংঘবদ্ধ চক্রটি বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক এনে একসঙ্গে ৫ থেকে ১০টি ভেকু দিয়ে ফসলি জমির টপসয়েল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে জমিগুলো চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং কৃষকরা সর্বস্ব হারানোর মুখে পড়ছেন। ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এ বিষয়ে তারা জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার এবং সদর উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর থেকেই চর দখলকারী চক্রটি বিভিন্নভাবে কৃষকদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে।স এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রশাসনের এই অভিযান কি সত্যিই স্থায়ী সমাধান আনবে, নাকি কিছুদিন থেমে আবারও শুরু হবে মাটিখেকো ভেকুর তাণ্ডব? ইব্রাহিমপুর চরের কৃষকরা এখন তাকিয়ে আছেন ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানের দিকে, যাতে তাদের ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকু রক্ষা করা যায়।
ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের চর প্রায়শই চঁাদপুর কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদের উপজীব্য হচ্ছে। যেমনটি পুরো ফরিদগঞ্জ নিয়ে হচ্ছে। চঁাদপুর জেলার অন্য সকল স্থানেই কম-বেশি মাটিখেকোদের উপদ্রব আছে। কিন্তু উপরোল্লিখিত দুটি স্থানে বেশি উপদ্রব হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কারণে মনে হচ্ছে। ফসল উৎপাদনের জন্যে চঁাদপুর সেচ প্রকল্পভুক্ত ফরিদগঞ্জ ও চঁাদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর চর মোক্ষম স্থান। অথচ মাটিখেকোরা এ দুটি স্থানকেই বেশি টার্গেট করেছে। মাটিখেকোরা প্রধানত ব্রিক ফিল্ডেই বেশি মাটি বিক্রি করছে। তাদের কাছে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্নে ব্রিক ফিল্ডে ইট উৎপাদনটাই মুখ্য, ফসল নয়। আমরা ইট উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। সেজন্যে বৈধভাবে ইট উৎপাদনে ব্রিক ফিল্ডগুলো কীভাবে কোন্ উপায়ে মাটি কিনতে পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনা গণমাধ্যম সহ জনসমক্ষে আসা দরকার। নয়তো ব্রিক ফিল্ডগুলো বন্ধ করে দেয়া দরকার। বৈধ-অবৈধ ব্রিক ফিল্ডগুলো চলবে, আবার মাটিখেকোদের উপদ্রব চলবে-এটা হতে পারে না। মাটিখেকোরা গুপ্ত জঙ্গি, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর মতো নয়, এরা প্রকাশ্য অপকর্মকারী, এদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যে খুব কঠিন কাজ নয়। তারপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না কেন? এ প্রশ্নের জবাব ওপেন সিক্রেট, তবে সময়ের দাবি হচ্ছে : তদন্তের মাধ্যমে সেটা ওপেন করে দেয়া হোক। যে কোনোভাবেই হোক মাটিখেকোদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাটা অতীব জরুরি। অন্যথায় এরা ফসলি জমির চর খাবে, সেচ প্রকল্পের জমি খাবে, সর্বোপরি কৃষিপ্রধান দেশটির উর্বরা জমিগুলো একের পর এক গ্রাস করবে। বিনা বাধায় এদের কেউ কেউ বালুখেকো সেলিম খানের মতো শক্তিশালী হয়ে যাবে এবং অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়ে সারাদেশে চঁাদপুরের ভাবমূর্তি আবার ক্ষুণ্ন করবে। তাদের জন্যে এ সুযোগ করে দেয়াটা কি ঠিক হবে?







