বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:২০

চার দশক পর বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় বাংলাদেশ!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
চার দশক পর বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় বাংলাদেশ!
ছবি :সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে কোনো জাতির বৈশ্বিক মঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ কেবল একটি পদের প্রাপ্তি নয়, বরং তা বিশ্বব্যবস্থায় সেই দেশের নীতি, আদর্শ ও গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য স্বীকৃতি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে এক গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। বিশিষ্ট কূটনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনের ‘প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট’ (President-Elect) হিসেবে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত গোপন ব্যালটের এই ভোটে তিনি সাইপ্রাসের অভিজ্ঞ প্রার্থীকে পরাজিত করে ৯৯টি ভোট পেয়ে এই মর্যাদাপূর্ণ গৌরব অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দীর্ঘ চার দশক পর কোনো বাংলাদেশি হিসেবে তিনিই প্রথম জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। এই বিজয় সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির প্রেক্ষাপটে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে বলা হয় বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক ফোরাম, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র সমানাধিকারের ভিত্তিতে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে। এই পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির আসনটি এমন এক সময়ে একজন দূরদর্শী বিশ্বনেতার হাতে যাচ্ছে, যখন বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ও জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত, অন্যদিকে আঞ্চলিক যুদ্ধবিগ্রহ ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে মানবজাতি আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। এই ক্রান্তিলগ্নে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কেবল অধিবেশন পরিচালনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বনেতাদের এক মঞ্চে এনে কার্যকর ঐকমত্যে পৌঁছানোর এক মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত পরীক্ষা।

মেধা, প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য আখ্যান

ড. খলিলুর রহমানের এই শীর্ষ পদে আসীন হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তা তাঁর দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঠ্য কর্মজীবন, মেধা ও প্রজ্ঞার এক অবধারিত পরিণতি। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিলサービスの (বিসিএস) প্রথম নিয়মিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগদান করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি এবং টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করে নিজের জ্ঞানভিত্তিক ভিত্তিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন।

তাঁর কূটনৈতিক পথচলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে প্রথম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিশ্বমঞ্চে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDCs) প্রধান মুখপাত্র হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১ সালে তিনি সরাসরি জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন এবং সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার (UNCTAD) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা চালুর ঐতিহাসিক ‘ব্রাসেলস কর্মপরিকল্পনা-২০০১’ খসড়া প্রণয়নে তাঁর অবদান ছিল অগ্রগণ্য। বাংলাদেশে শিক্ষাবিস্তারে অবদান রাখতে তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি’র একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বৈশ্বিক সংকটের চ্যালেঞ্জ ও নতুন নেতৃত্বের দায়

আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া ড. খলিলুর রহমানের এক বছরের এই কার্যকালটি জাতিসংঘের ইতিহাসে অন্যতম একটি অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তাঁর এই মেয়াদের মাঝেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, যা বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সাধারণ পরিষদের সভাপতির সামনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আসবে। তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর মেয়াদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী একটি মূল প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছেন: “আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ”

দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে তিনি বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে গতি আনা, জলবায়ু মোকাবিলা, মানবাধিকার রক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তির সুশাসন এবং জাতিসংঘের সার্বিক সংস্কারের মতো ৬টি প্রধান অগ্রাধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু কূটনীতিতে কার্বন নিঃসরণকারী বড় দেশগুলোকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর এই দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা আজ সময়ের দাবি।

বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আশার আলো

বিগত কয়েক বছরে বিশ্বরাজনীতিতে একমুখী বা দ্বিমুখী প্রভাবের কারণে বহুপাক্ষিকতা (Multilateralism) কিছুটা দুর্বল হয়েছে। শক্তিশালী দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময়ই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে স্থবিরতা দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল চ্যালেঞ্জ হবে জাতিসংঘের সাধারণ ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করা, যেখানে ছোট-বড় সব দেশের মতামতের সমান মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।

প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের এই অনন্য মনোনয়ন বিশ্বমঞ্চে সমতা এবং ন্যায্যতার পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর আজ আর উপেক্ষণীয় নয়। আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা, সংঘাত নিরসন এবং বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে তাঁর এই আসন্ন কার্যকাল বিশ্ববাসীর জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনতে পারে।

উপসংহার

ড. খলিলুর রহমানের এই মহতী অর্জন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেধা, সততা এবং সুদীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সংকটের মহাসমুদ্রে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের এই নতুন সারথি বিশ্বকে কতটা শান্ত ও স্থিতিশীল তীরে পৌঁছাতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে তাঁর এই গৌরবময় যাত্রা যে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মর্যাদাকে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় উচ্চতায় নিয়ে গেল, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমরা এই নতুন বিশ্বনেতৃত্বের সর্বাঙ্গীন ও ঐতিহাসিক সাফল্য কামনা করি।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়