শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ০২:০১

ঢাকা-চীন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ!

বঙ্গোপসাগরের ঢেউ বেইজিংয়ে?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বঙ্গোপসাগরের ঢেউ বেইজিংয়ে?

সমকালীন বিশ্বব্যবস্থা আজ এক নতুন শক্তি-সমীকরণের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে, অন্যদিকে এশিয়াকেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বলয় দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আর কেবল দ্বিপাক্ষিক সৌজন্য বা উন্নয়ন সহযোগিতার সীমায় আবদ্ধ নেই; বরং তা ক্রমেই রূপ নিচ্ছে বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রতীকী ঘোষণা। এই বৈঠক স্পষ্ট করেছে—ঢাকা এখন বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্কের এমন এক কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য একই সূত্রে গাঁথা।

ঐতিহাসিকভাবে চীন বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল—এসব প্রকল্পে বেইজিংয়ের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার করেছে। শুধু অর্থায়ন নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও চীনের উপস্থিতি দৃশ্যমান।

বর্তমান বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের দারিদ্র্য বিমোচন, শিল্প বিপ্লব ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নকে যে ‘অনুকরণীয় উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র কয়েক দশকে শতকোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা চীনের অভিজ্ঞতা উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে এক বাস্তব পাঠশালা

এই শীর্ষ বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এ বাংলাদেশের অবস্থানের পুনঃনিশ্চিতকরণ। বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস, সেমিকন্ডাক্টর প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ডি-ডলারাইজেশন বিতর্ক আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে নতুন পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান চীনের জন্য কেবল বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত মূল্যবান।

বাংলাদেশের জন্যও এই অংশীদারিত্ব সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষত উচ্চ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট অবকাঠামো এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ দেশের শিল্পভিত্তিকে নতুন স্তরে উন্নীত করতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

তবে উন্নয়ন সহযোগিতা কখনোই অন্ধ নির্ভরশীলতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা নির্মম—স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ নয়, স্থায়ী হয় কেবল জাতীয় স্বার্থ। অতএব, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্নে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।

বিশেষত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান জরুরি। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এখন আর একমুখী নয়; বরং এটি বহু শক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। এই জটিল বাস্তবতায় বিচক্ষণ কূটনীতি ছাড়া টেকসই অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছে, তেমনি তা নতুন দায়িত্বও আরোপ করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের পথে এগোতে হলে বাংলাদেশকে কৌশলগত দূরদর্শিতা, বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করতে হবে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণ কেবল দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; এটি আগামী দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-অর্থনৈতিক মানচিত্র পুনর্লিখনেরও এক সম্ভাব্য সূচনা।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়