বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪, ০০:০০

জীবন ও মানবতা

মোঃ আকাশ হোসেন

জীবন মানে জীবন। জীবনের সঠিক সংজ্ঞা খুঁজে বের করা দুষ্কর। সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটলসহ পৃথিবীর কোনো দার্শনিক কিংবা কোনো গভীর চিন্তাশীল প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীই জীবনের সঠিক ও বাস্তবিক সংজ্ঞা আবিষ্কার করতে পারেননি। তবে হ্যাঁ, আমার কাছে জীবন মানে,"এই মহা পৃথিবী এবং এই পৃথিবীর মানুষের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে কিছু করে যাওয়া।" এর মাধ্যমেই আমরা আমাদের জীবনের সঠিক সংজ্ঞাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারবো এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনকে উপলব্ধি করতে পারবো। আমাদের জীবনটা কেনো জানি সঙ্কীর্ণ,"এই শুরু তো এই শেষ"। তবে, বাস্তবতার আদলে জীবন সমুদ্রের স্রোতের ন্যায় প্রবহমান। আমাদের এই সঙ্কীর্ণ জীবন কতই না দিগন্তময়, কতই না বৈচিত্র্যময়।

এবার আসুন, মানবতা কী? এটার সংজ্ঞা খুঁজে বের করা নিতান্তই সহজ কাজ। মানবতা হলো মানুষের মনুষ্যত্ববোধ, যে বোধ মানুষকে প্রাণবন্তভাবে জাগ্রত করে। মানুষের জন্যে প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, মানব সেবা কিংবা মানুষের জন্য মঙ্গলজনক কিছু করাটাই হলো মানবতার অনন্য উদাহরণ। এককথায়, মানুষের কল্যাণে সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে যে কোনো কাজ করাকে মানবতা বলে। রুশ লেখক ‘লিও টলস্টয়’-এর একটি কথা না বললেই নয় "ঞযব সধরহ সবধহরহম ড়ভ ষরভব রং ঃড় ংবৎাব যঁসধহরঃু রিঃয বাবৎুঃযরহম." অর্থাৎ, জীবনের মূল মানেটা হলো নিজের সব কিছু দিয়ে মানবতার সেবা করা।

জীবনের এক প্রাচুর্যময় সম্পদ হলো মানবতা। যে জীবনে মানবতা নেই, সে জীবনটা বৃষ্টিপাতে পাহাড়ের মতো ধসে পড়ার অবস্থা। জীবন ও মানবতা একই সূত্রে গাঁথা। যেনো একটি ডাল দুটি ফুল। জীবনের প্রসঙ্গকে তুলে ধরতে হলে অবশ্যই মানবতাকে তার গতিপথ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। মানবতা ছাড়া আমাদের জীবন পাড় ভাঙ্গা নদীর মতো দুঃখময় কাহিনী। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে এবং জীবনের প্রতিটি সম্মুখপানে মানবতাকে সবকিছুর চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আপনার উদ্ধৃত চিন্তা-চেতনা, ভাব-গাম্ভীর্য, শিক্ষা-মননশীলতা, ধর্মনীতি, জাতিগত নীতি, রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, সমাজ-নীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চিন্তা-চেতনা এবং বহিরাগত ও ভিতরগত চিন্তা-চেতনাসহ মানব জীবনের সকল পর্যায়ে মানবতাকে প্রধান শক্তির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর সকল ধর্মই মানবতাকে মুখ্য হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো ধর্মই যেমন মানুষকে অসত্য শেখায় না তদ্রূপ ধর্মের প্রধান শক্তিই হলো মানবতা। মানবতা ছাড়া কোনো ধর্মকে ধর্ম বলে সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ, পৃথিবীর সকল ধর্মের মূল স্তম্ভ হলো মানবতা। প্রতিটি ধর্মই তার অনুসারীদেরকে বলে, ‘মানুষের জন্য কিছু কর।’

এই পাশ্চাত্যময় বিশ্বের মানুষ প্রতিনিয়তই প্রচ্ছন্নভাবে মানবতা থেকে দূরে সরে পড়ছে। এই আধুনিক পৃথিবীর মানুষ কেনো জানি মানবতাকে জীবনের পার্থিব ঐশ্বর্য মনে করছে না। মানবতা ছাড়া একটি জীবন অর্থহীন এবং মানবতাহীন মানুষের বিবেক প্রতিনিয়তই দংশন হচ্ছে। মানুষকে প্রচ্ছন্নচিত্তে জীবনের অনড় তাগিদে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মানবতার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হবে। মানব সেবাই মানবতা, যেখানে কিঞ্চিৎ পরিমাণ সার্থকতা থাকে না। মানব সেবার থেকে বড় ধর্ম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর কী-বা আছে। সেটা আমরা জেনে'ও পালন করছি না। জীবন ও মানবতা একে অপরের সংস্পর্শে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। এককথায়, ‘দুই দেহ এক প্রাণ।’ কিন্তু আমরা জীবন থেকে কেনো জানি মানবতাকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি! বলাবাহুল্য, মানবতা ছাড়া আমরা নিজেদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের স্পৃহা জাগ্রত করতে পারবো না। আগেই বলেছি, জীবন বড়ই সঙ্কীর্ণ। জীবনের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই এটাই চিরন্তন সত্য। আমাদের এই ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ জীবন ক্রমশই তার সীমানা অতিক্রম করছে। প্রতিনিয়তই আমরা চলে যাচ্ছি জীবনের শেষ সীমানার দ্বারপ্রান্তে। শক্তিহীন হয়ে পড়ছে আমাদের আত্মবোধ, আত্মশক্তি, আত্মসম্মান, অর্জিত বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও গরিমা। এর থেকেও বড় লজ্জার বিষয় হলো, আমরা বিবেকহীন হয়ে পড়ছি, মানবতাহীন হয়ে পড়ছি। আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবন থেকে মানবতা দিন দিন বসন্ত বৃক্ষলতার মতো ঝরে পড়ছে অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। যার চাক্ষুষ প্রমাণ চাইলেও দিতে পারি। যেমনটা আমরা যখন কোনো মানবিক কাজ করি সেটা যদি মানুষের জন্যে মন থেকে না করে শুধুই কেবল লোক দেখানোর জন্যে করি অথবা মানুষের কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার জন্যে করি, তাহলে বুঝে নিতে হবে, এটাই মানবতা ঝরে পড়ার একটি উদাহরণ।

ধর্ম একটি বিশাল ব্যাপার। ঠিক তেমনি মানবতাও একটি বিশাল ব্যাপার। মানবতা ছাড়া ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। মানবতা সাধন করা মানুষই বলতে পারবে, মানবতার অস্তিত্ব ঠিক কতটুকু? এবং মানব জীবনে তার পরিসর কতটুকু বিস্তৃত। এই বিশাল ভূখণ্ডের পৃথিবীতে মানবতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অচিরেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যদি আমরা চাই তাহলে অবশ্যই পারবো নিজের জীবনের সাথে মানবতাকে মিশেল দিয়ে টিকিয়ে রাখতে। বিশ্ব চরাচরে মানবতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে মানবতা সাধন করতে হবে। মানবতার প্রতিটি ঐশ্বর্য, ধাপ ও স্তর--নিজের মনের মধ্যে আয়ত্ত করতে হবে। এই বিষয়ে বিন্দু পরিমাণ কার্পণ্য করা যাবে না। কারণ, মানবতা টিকে থাকলে মানুষের জীবন টিকে থাকবে। "মানবতা ছাড়া মানুষের জীবন অর্থহীন।" এই বাক্যটা আক্ষরিক অর্থেই মানুষকে বোঝানো বড় মুশকিল। জ্ঞান ও বিশ্বাসের দিক থেকে মানুষকে বোঝানো যাবে না, মানবতা ছাড়া মানুষ পরিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট জীবন গড়তে কিংবা সাধন করতে পারবে না। এতোটুকু সংশয় না রেখেই নির্দ্বিধায় ধ্রুব সত্য বলা যায়। মানুষের জীবন ও মানুষের মানবতা একে অপরের পরিপূরক। মানুষের জীবনের একটি কষ্টবিহীন ফসল হলো মানবতা। যেটা কিনা কোনো কষ্ট ছাড়াই উপলব্ধি করা যায়। বলাবাহুল্য, মানবতা চর্চা করতে গিয়ে কারো শরীর থেকে বিন্দু পরিমাণ ঘাম ঝরাতে হবে না। যার জীবনে মানবতা নেই, সে কোনোভাবেই নিজেকে আত্মবিচার করতে পারবে না। সংকোচ না রেখে নিজেকে উপলব্ধি করতে পারবে না। নিজের জীবনকে বিশুদ্ধ করে তুলতে পারবে না। আর যাই হোক, সত্যোদ্ঘাটনের জন্যে হলেও মানবতাবাদী হতে হবে। এই পৃথিবীতে মানবতাবাদী মানুষ ছাড়া কেউই সত্য কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। যারা মানবতাবাদী নয় তারা মিথ্যাতেই লুক্কায়িত। তাদের দ্বারা আর যাই হোক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। যারা মানবতাবাদী নয়, তারাই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষকে খাবলে খাবলে খাচ্ছে। যার অহরহ প্রমাণ চাইলেও দিতে পারি।

মানবতা একটি ইহজাগতিক ধর্ম। যার জীবনে মানবতা নেই তার জীবনকে অনায়াসে তলাবিহীন ঝুড়ির সাথে তুলনা করা যায়। মানবতাহীন একটি জীবন একশো মৃত মানুষের সমান। অতএব, জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে মানবতার সংস্পর্শে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানবতাই আমাদের শক্তি, আমাদের প্রাণ। আমরা মানুষ ঠিকই, কিন্তু আমাদেরকে হতে হবে মানবতাবাদী মানুষ। আর আমরা মুখে নিজেদেরকে মানবতাবাদী মানুষ বলেও বসে থাকবো না, মন-প্রাণ খুলে অন্তরাত্মা দিয়ে মানুষের জন্যে কিছু করতে হবে। এভাবেই আমরা পৃথিবীতে মানবতার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবো। এর সাথে সাথে আমাদের জীবনকেও মানবতার চেতনার নিরিখে সাজাতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়