প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৬
কিশোরবেলার বন্ধু লিটন সাহার স্মরণে

শিশু, কিশোর ও যুবক এই তিন কাল মানুষের জীবনের পথচলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে একসঙ্গে মিলেমিশে সৎ ভাবনায় সামাজিক কাজ করার আনন্দ এক অন্য রকম অনুভূতি।
শিশুকাল মনে না থাকলেও কিশোরকালটা সবারই মনে থাকে। কিশোরবেলার বন্ধুত্বও সবাই মনে রাখে। কিশোরবেলায় বন্ধু হওয়া, ধীরে ধীরে বড় হওয়া। ‘তুই’ বলে ডাকা, যা স্বাধীনভাবে শুধু বন্ধুকেই বলা যায়।
এর মাঝেও সময়ের পরিবর্তনে খুব কাছের বন্ধুকেও বন্ধু ভুলে যায়। কাছাকাছি থাকা মানুষও দূরে চলে যায়। আর এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কারণ, জীবন চলার ছন্দে এমনটি ঘটবেই।
ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্বের মাঝে গভীরতা থাকলেই জীবন চলার পথে অধিকার নিয়ে বন্ধুকে ‘তুই’ বলা যায়। বলা যায়, ‘বন্ধু, তুই কেমন আছিস?’
আমার এই জীবন চলার পথে ‘তুই’ করে ডাকার বন্ধুদের মধ্যে ছিল অকালপ্রয়াত লিটন সাহা।
গত ২ জুন ২০২৬ বিকেলে লিটন সাহার মৃত্যুর সংবাদটি ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ফেসবুকে বন্ধুরা এবং সিনিয়র ভাই-দাদারা গভীর শোক প্রকাশ করেন।
আজ ১৭ জুন, বুধবার, লিটন সাহার স্বর্গীয় আত্মার চিরশান্তি কামনায় শ্রীশ্রী কালী বাড়ি মন্দিরে শ্রাদ্ধের কাজ সম্পূর্ণ হবে।
লিটন সাহার সঙ্গে পরিচয় এবং আমার বন্ধুত্বের সময়কাল প্রায় ৩২ বছর। লিটন সাহার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একদিনের জন্যও আমাদের মধ্যে মুখ কালাকালি, ঝগড়া বা বিবাদ কিছুই হয়নি।
বরং লিটন সাহা সবসময় প্রগতিশীল, সাংস্কৃতিক ও সৃষ্টিশীল ভাবধারায় চলাফেরা করতেন।
লিটন সাহার সঙ্গে একসময় ১৯৯২-৯৩ সালে চঁাদপুর ললিতকলায় প্রয়াত সংগীতগুরু শীতল ঘোষালের কাছে সংগীতচর্চা করতাম। লিটন সাহার ছোট বোন এবং আমার ছোট বোনও সেই সময়ে ললিতকলায় সংগীতচর্চা করত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিল আমাদের অটুট।
ব্যস্ততা ও কর্মব্যস্ততার কারণে আগের মতো আড্ডা না হলেও চঁাদপুর শহরে প্রায়ই লিটনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। অনেক সময় লিটন সাহা ব্যস্ততার মধ্যে থাকলেও আমি যখন বলতাম, ‘লিটন, কেমন আছিস?’ তখন মুখে হাসি দিয়ে বলত, ‘হ্যঁা দোস্ত, বন্ধু, ভালো আছি।’
চঁাদপুর শহরটি ঠিকই আছে। সবার সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু দেখা হবে না আর কোনোদিন লিটন সাহার সঙ্গে। বিষয়টি মনে হলে খুব কষ্ট হয়।
সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ ধর্মীয় সংগঠনের অনেক কাজে লিটন সাহার সহযোগিতা পেয়েছি।
চঁাদপুর সাহিত্য একাডেমির নির্বাচনের ঠিক আগের দিন রাতে হঠাৎ করে লিটন সাহাকে ফোন করলাম। বললাম, ‘বন্ধু, আমি তো একটি ভুল পথে চলছি কি না জানি না। আমি নির্বাচনে দঁাড়িয়েছি।’
উত্তরে লিটন সাহা আমাকে বলল, ‘ভুল পথ কেন? ঠিক আছে। দঁাড়িয়েছিস। তবে বিষয়টি আমাকে আগে জানালে ভালো হতো। আচ্ছা, ঠিক আছে। যারা আমার পরিচিত আছেন, সবাইকে বলে দিব তোকে যেন ভোট দেয়।’
ভোটের দিন শ্রদ্ধেয় জেঠু সুভাষচন্দ্র রায়কে নমস্কার জানিয়ে আমি বললাম, ‘আমার নাম পলাশ দে। আমাকে একটা ভোট দিন।’
তিনি সেদিন আমার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, ‘লিটন তোমার বন্ধু। ও-ও আমাকে বলেছে তোমাকে ভোট দেওয়ার জন্য।’
সেদিনের লিটনের ভালোবাসা আমি কী করে ভুলব?
লিটন সাহার বড় ভাই নিলয় সাহা, নিতু দাদাও আমাকে অনেক ভালোবাসেন।
ভালোবাসার বন্ধনে আজ শুধু লিটন সাহা নেই।
কত শত স্মৃতি লিটন সাহার সঙ্গে। লিখে বা বলে সবকিছু বোঝানো যাবে না।
লিটন সাহার জীবনে যেকোনো প্রতিকূলতা বা সংকট নিয়ে তার সঙ্গে কথা বললে কিংবা পরামর্শ চাইলে সে উদারভাবে এগিয়ে আসত।
লিটন সাহা জীবনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। আর তা নিয়ে বহু কথা বলা হতো। বিষয়টি নিয়ে বললে হাসিমুখে বলত, ‘তোরা তো করছিস। এখন আমি অপেক্ষায় আছি। নেমন্তন্ন পেয়ে যাবি।’
হ্যঁা বন্ধু, তোর বিয়ের নিমন্ত্রণ না পেলেও আজ তোর শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণপত্র পেয়েছি।
এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যাবি, সত্যিই ভাবতে পারিনি রে বন্ধু লিটন সাহা।
জীবন চলার পথে কখনো যদি কোনো অন্যায় করে থাকি, ক্ষমা করিস বন্ধু লিটন সাহা। ওপারে ভালো থাকিস।
বিখ্যাত সংগীতশিল্পী মান্না দের গানের মাধ্যমে বন্ধু লিটন সাহার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাÑ
“বন্ধু জানিনা তুমি কেমন আছো
দিনগুলো কিভাবে কাটাই
শুধু একবার এসে দেখে যাও
তুমি তো ঠিকানা দিয়ে যাওনি আমায়
এখানে ওখানে কত খুঁজেছি তোমায়...”








