মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:০৬

পত্রিকার সংকট লেখকের সংকট

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
পত্রিকার সংকট লেখকের সংকট

আধুনিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় সংবাদপত্র বা বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে গণমাধ্যমকে। আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় এই সংবাদপত্রই পত্রিকা হিসেবে সম্বোধিত হয়। সংবাদপত্র অর্থে পত্রিকা কখনোই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মলাভ করেনি। মূলত সেবাব্রতী মন নিয়ে পত্রিকার জন্ম হয়, যার আদর্শ ছিলো সত্যানুসন্ধান এবং অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস। পাঠক নামমাত্র মূল্যে একটা পত্রিকা সংগ্রহ করলেও পত্রিকার মূল উপার্জন কিন্তু পত্রিকা বিক্রিত অর্থ নয়। বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে আয় ও মালিকপক্ষের পত্রিকার উদ্দেশ্যে সঞ্চিত মূলধন হতে আয়ই হলো পত্রিকার মূল জ্বালানি। আর পত্রিকার হৃদপিণ্ড হলো পাঠক সমাজ। তার মানে দাঁড়ায় পত্রিকা প্রকাশ কোনো ব্যবসা নয়, বরং সেবা। তারচেয়ে বরং আধুনিক পরিভাষায় বলা যায়, পত্রিকা হলো পাঠকের ড্রোন। যেখানে মানুষ অপ্রবেশ্য, যে স্থান সাধারণের অগম্য, পত্রিকা সেখান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে সত্যটাকে পাঠকের হাতে তুলে দেয়। যেহেতু অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস পত্রিকার থাকতে হয়, সেহেতু এটা মানতেই হয়, একটা ভালো মানের পত্রিকার শক্ত ও ঋজু মেরুদণ্ড থাকা আবশ্যক। সেটা হতে হয় বটের মতো মহীরুহের দৃঢ়তায়। তাকে উপড়ানো যেতে পারে কিন্তু কখনও মচকানো যায় না যেমন তেমন করে। পাঠকের রুচি অনুযায়ী পত্রিকা চলার কথা নয় বরং পত্রিকাই নির্মাণ করে তোলে পাঠকের অভিরুচি। পত্রিকা নিরপেক্ষ থাকার কথা নয়। যেখানে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব ঝনঝনিয়ে ওঠে, সেখানে পত্রিকা নিরপেক্ষ থাকা কিংবা মৌন থাকা মানেই হলো নিজ আদর্শ বিকিয়ে পত্রিকা মিথ্যাকে প্রশ্রয় কিংবা প্রণোদনা দিয়ে চলেছে। এতো গৌরচন্দ্রিকার উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পত্রিকার জগত দেখে মনের মধ্যে ফুটে ওঠা বেদনাকে প্রকাশ করার প্রয়াস।

আজকের পত্রিকা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে গিয়ে মনে পড়ে যায় এস. টি. কোলেরিজের লেখা ‘দ্য অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার’ গল্পের একটা মূল্যবান কথা। অকারণ ক্ষোভে অ্যালবাট্রস নামের সৌভাগ্য বহনকারী সামুদ্রিক পাখিটাকে গুলি করে মেরে পরিণামে দণ্ডিত পিপাসার্ত বৃদ্ধ নাবিকের উপলব্ধি হলো, সেই বিশাল উন্মুক্ত সমুদ্রে তার জাহাজের চারপাশেই জল আর জল। কিন্তু তার একফোঁটাও পানযোগ্য নয়। সবটাই প্রখর লবণে ভরা। ঠিক এরকমই এক অভিব্যক্তি আমাদের তৈরি হয় আজকের গণমাধ্যমের ভূমিকায়। গণমাধ্যমের তথাকথিত স্বাধীনতার যুগে আমাদের চারপাশে অসংখ্য সংবাদপত্র ছাপানো এবং অনলাইনে প্রকাশ হতে দেখি। কিন্তু এতো সংবাদপত্রের ভিড়ে পাঠক তার সত্যাশ্রয়ী কোনো পত্রিকা পাচ্ছে না। ফলে এর প্রতি পাঠকের আগেকার যে আগ্রহ থাকতো তা আজ আর নেই। মনে পড়ে, বাবাকে দেখতাম অধীর আগ্রহে সন্ধ্যা সাতটার বিবিসি বাংলা এবং রাত দশটার পরে ভয়েস অব আমেরিকা বা ভোয়ার সংবাদ শোনার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকতে। এ দুটো সংবাদ না শুনতে পেলে কারও যেন ভাত হজম হতো না কিংবা সুনিদ্রা হতো না, এমনই অবস্থা। নব্বইয়ের দশকের শেষে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দশকের প্রথম দিকে আমরা একুশে টেলিভিশনের সংবাদ পরিবেশনের কায়দায় বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু আজকাল যেন গোলে হরিবোল। আজকের সংবাদপত্রগুলো কোথায় জানি নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। একদিকে মালিকপক্ষ হয় ব্যবসার তাগিদে, নয়তো নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিতে বা সুদৃঢ় করতে পত্রিকার মালিক হয় আর নয়তো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিউগল বাজাতে নিজেকে তৈরি করে রাখে। ফলে আপাত কিছু সত্যের সাথে অতিরিক্ত কিছু হলুদ মিশিয়ে পরিবেশন করা পণ্যে আর যাই হোক সংবাদ থাকে না, থাকে লেজুড়বৃত্তি। বাঙালিকে নিয়ে রবার্ট ক্লাইভের একটা কথা স্মরণযোগ্য। তার ভাষায় বাঙালি চেয়ারের ভক্ত। অর্থাৎ রাজা আসে রাজা যায় কিন্তু বাঙালি চেয়ারকে আঁকড়ে ধরে থাকে। যতদিন পর্যন্ত কোনো শাসক ক্ষমতায় থাকেন ততদিন পর্যন্ত আমরা ঐ শাসক সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো খবর সংবাদপত্রে পাই না। ক্ষমতায় থাকাকালে তার পোষা প্রাণীর গায়ের ঘ্রাণও যেন সংবাদ হয়ে ওঠে। আর যেই না ক্ষমতা হতে চ্যুত হলেন, অমনি ফর্ ফর্ করে ছাপা হতে থাকে তার যতো কুকীর্তি আর যতো অসফলতা। অথচ এই শাসককেই একদিন আগে স্তুতি করা হয়েছে দেবের উপমায়। আজকের বর্তমান আগামীকালকে সাবেক হয়ে ক্ষমতায় নূতন কেউ যখন আসেন তখন সংবাদ মাধ্যমে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় তার সম্পর্কে কতো উচ্চমাত্রায় ভালো সংবাদ পরিবেশন করা যায় তা নিয়ে। বিরোধী দলে থাকাকালীন তার যত দোষ ছিলো ক্ষমতায় এসেই সংবাদপত্রের চোখে তার দোষগুলো অনন্য গুণ হয়ে ধরা পড়ে। চব্বিশের পরিবর্তনের আগে আমরা অনেক গণমাধ্যমকে দেখেছি তৎকালীন সরকারের সকল কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে। ক্ষমতাসীনের মুখনিঃসৃত একটা বাণীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে দেখেছি কতো গণমাধ্যমকর্মীকে। কিন্তু যেই না তাদের পতন হলো, অমনি তাদের সকল কাজের দুর্নীতির ফিরিস্তি আমরা পেতে শুরু করলাম। আবার নবাগত ইন্টেরিমকে নিয়ে তৈরি হলো নূতন গল্পগাছা। ঐ সময়ের পত্রিকা ঘাঁটলে তাদের কোনো খারাপ খবর পাওয়া যাবে না। বরং নদীর পাড়ের ময়লা পরিষ্কার করতে গিয়ে কাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হলো তা নিয়ে গণমাধ্যম ব্যস্ত হয়ে পড়লো। অথচ তখন গণমাধ্যমের কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার লেশমাত্র পাওয়া যায়নি। কিন্তু যেই না ইন্টেরিম বিদায় নিলো অমনি প্রকাশ পেলো হামের টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিতকরণের সংবাদ। এরকম আরও অনেক কিছু।

এতো কথা বলার একটাই কারণ--আমরা দেখতে পাচ্ছি পত্রিকা তার গুণাবলি হারাচ্ছে এবং পত্রিকা চলে যাচ্ছে কর্পোরেট বাণিজ্যের হাতে। পত্রিকা হয়ে যাচ্ছে মহাজনী কারবারের আধুনিক সংস্করণ। অগ্রিম অর্থমূল্যে কিনে নিচ্ছে লেখককে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঐ লেখক হয়ে যান ওই পত্রিকার ক্রীতদাস। তার লেখা যেমন অন্য কোনো পত্রিকায় ছাপানো যাবে না, তেমনি আত্মবিক্রিত লেখক সময়ে অসময়ে ঐ পত্রিকা-গ্রুপের পক্ষে তার কলম চালাবেন। এ রকম অনেক লেখকের উদয় হয়েছে আজ বাংলাদেশে। এমনকি তারা তাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছেও নিজেদের বিক্রি করে দিচ্ছেন সাংবাৎসরিক। ফলে লেখক তার প্রকৃত লেখা থেকে যেমন সরে যাচ্ছেন তেমনি ফরমায়েশি লেখায় সয়লাব হয়ে যাচ্ছে আমাদের আজকের সাহিত্য জগত। কিছু কিছু পত্রিকা রাজনীতির নেপথ্যে থেকে সরকার পরিবর্তনের মতো বড়ো বড়ো কর্মকাণ্ডের অংশীদার হচ্ছে। অথচ এটা তাদের কাজ নয় মোটেও। কোনো কোনো পত্রিকা তো বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর হয়ে দেশের সকল ভালোতেও ছিদ্র খুঁজে বেড়ান, যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচার করা যায় মোটা দাগের অর্থ বা সুবিধার বিনিময়ে। ফলে চারদিকে আজ খবরের কাগজ নামধারী অনেক প্রকাশনাই আছে, কিন্তু তাদের ভিড়ে প্রকৃত পত্রিকার বড়োই অভাব।

আজকাল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক পত্রিকায় মনের মাধুরী মেশানো শিরোনাম দেখা যায়। ওয়াকিবহাল মানুষেরা এ ধরনের সংবাদকে ডলারখেকো সংবাদ নামে অভিহিত করছেন। কারণ খবরের ভেতরে ঢুকলে বুঝা যায় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক সংবাদ পরিবেশনের চেয়ে জাজমেন্টাল প্রবণতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে আদালত প্রমাণ করার আগেই তিনি রায় দিয়ে শিরোনাম করছেন,’ ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’ কিংবা ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় রোগীর করুণ মৃত্যু।’ বোদ্ধা মহলের মতামত হলো, এগুলো মূলত বিদেশে রোগী পাচারের বাণিজ্যিক কৌশল। এগুলোর জন্যেই হয়তো তার সাথে চুক্তি হয়েছে বিদেশি হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংবাদ শিরোনামের নমুনা এমন হয় যে, তিনি বলছেন, ‘ প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে বের হলেন।’ অথচ দেশে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আরও রয়েছে, যাতে জনস্বার্থ জড়িত আছে। এধরনের সাংবাদিকতা আজকাল সংবাদপত্রের চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে এবং মোটামুটি কয়েকটা সংবাদপত্র পড়লে বুঝা যায়, শিরোনামটুকু পাল্টানোর মতো কষ্ট কেউ করেননি। এটা যে প্রযুক্তি-যুগের উপজাত সংকট তা বুঝতে সক্রেটিস হতে হয় না । একজনে সংবাদ তৈরি করে সবার হয়ে পত্রিকাগুলোতে সরবরাহ করেন।

পত্রিকার প্রজননকাল মনে হয় আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগকে বলা যেতে পারে। যেখানে সেখানে যখন তখন অনলাইন বা প্রিন্ট মিডিয়ায় পত্রিকার জন্ম হচ্ছে অহরহ। এই বিপুল সংখ্যক পত্রিকাকে চালাতে হলে বিপুল সংখ্যক লেখক দরকার। মানসম্পন্ন লেখকের বিপুল চাহিদার জোগান দেওয়ার এই সংকটকালে মানহীনদের পোয়াবারো। এমনকি একই দিনে একই লেখকের চার-পাঁচটা দৈনিকে লেখা প্রকাশ পাচ্ছে। অতিপ্রজ হওয়ার মানে এই নয় যে, তিনি অতি উচ্চমানসম্পন্ন। লেখার রসাস্বাদ করলেই বোঝা যায়, এগুলো নেহায়েতই অভাবের তাড়নায় লেখা। মানে লেখকের ঘাটতির কারণেই লেখাগুলো ছাপার হরফে চলে আসে। এ ধরনের লেখক অনেকটাই রক্তে অপুষ্ট লোহিত কণিকার আগমনের মতো। যখন কোনো মানবদেহে রক্তের ঘাটতি দেখা দেয় তখন ঐ ঘাটতি পূরণ করতে রক্তস্রোতে অপরিপক্ক লোহিত কণিকা চলে আসতে বাধ্য হয়। এলে কী হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন তারা ধারণ না করতে পারার কারণে দেহের চাহিদা মেটে না। এসব অপরিণত লেখকদের অবস্থাও তাই।

এখন এআইয়ের যুগ। চ্যাটজিপিটি দিয়ে মিনিটেই যে কোনো লেখা নামানো যায়। এমন অনেক নবীন লেখককে আমি চিনি, যারা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে গবেষকে পরিণত হয়ে গেছেন। আর কেউ আছেন কাট-পেস্ট করে লেখা তৈরি করছেন। এগুলো যাচাই করার সুযোগ অনেকের পক্ষে হচ্ছে না চাহিদার কারণে। এতে করে পত্রিকার মান ও উদ্দেশ্য উভয়ই ব্যাহত হচ্ছে। পত্রিকাগুলো নিজ উদ্যোগে লেখক তৈরি করার উপায় খুঁজতে হবে। নইলে এ সংকট সহজে মোকাবেলা করা যাবে না। ছোট ছোট অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে নতুন লেখক তৈরি করে তাদেরকে বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাকিয়ে আনা যেতে পারে। লেখকের যেন স্বাধীনতা থাকে। লেখককে যেন বাধ্য না করা হয় লেখার মাধ্যমে পত্রিকার মালিকের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করে তুলতে।

পাঠক হিসেবে আমি চাই পত্রিকা পত্রিকার মতোই থাকুক। তার চরিত্র ঋজু থাকুক, সত্য ও সৃজনশীল চর্চার সাথে থেকে সময়ের বেদনাকে তুলে ধরুক। পাঠকের নির্ভরশীল বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে উঠুক আগের মতো। রাজনীতির পচা শামুকে যেনো পত্রিকার পা কাটা না যায়। নিরেট দেশপ্রেমে পত্রিকা হোক পর্বতপ্রতিম। অনলাইন হোক বা অফলাইন, প্রিন্ট হোক বা ইলেকট্রনিক, পত্রিকা যেনো ব্যক্তির আদর্শ ধারণ না করে। পত্রিকা ধারণ করুক পত্রিকার আদর্শ। ক্ষমতার চেয়ারকে নয়, রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই পত্রিকা মান্য করে অসঙ্কোচে সত্যকে বের করে আনুক জনগণের পাঠের আওতায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়