প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১০:৫০
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(তিপ্পান্নতম পর্ব)
আমার প্রধান শিক্ষকবৃন্দ, আমার অধ্যক্ষবৃন্দ :
চট্টগ্রামের বিখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীলের বাড়ি আমাদের গ্রামের বাড়ির খুবই কাছে, বোয়ালখালী থানার পূর্ব গোমদন্ডী গ্রামে। তিনি একজন মাইজভান্ডারিও বটে। তাঁর কবিগানে তিনি মাঝে মাঝেই আওড়াতেন, ‘গু-তে ঘোর অন্ধকার, রু-তে আলো হয়।
অন্ধকারে আলো দানে তাঁরেই গুরু কয়।’
তাঁর এ কথার সূত্র ধরেই মনে পড়ে যায় আমার শিক্ষাজীবনের পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষবৃন্দকে, যাঁদের পুণ্য হাতের স্পর্শে নির্মিত হয়েছিলো আমার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন ও মনন। আমার প্রথম বিদ্যালয় সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুলের মাননীয় প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন সে সময় ব্রাদার বার্নার্ড সিএসসি। তিনি ছিলেন একজন স্মার্ট প্রিন্সিপ্যাল। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিলো তীক্ষ্ণ ও পরিষ্কার। মিতভাষী এই প্রিন্সিপ্যালের চলন-বলনে ঠিকরে পড়তো জ্যোতির্ময়ী ব্যক্তিত্ব। ঊনিশশো ঊনআশি থেকে ঊনিশশো আশি সাল পর্যন্ত তিনি আমাদের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন। এরপরে স্বল্প সময়ের জন্যে আমাদের প্রিন্সিপ্যাল হন ব্রাদার জুলিয়ান হেতু এবং ব্রাদার এলবেরিক। দুজনেই ছিলেন ফর্সা। এর মধ্যে ব্রাদার এলবেরিক ছিলেন কিঞ্চিৎ লালচে আভাযুক্ত। ক্লাস টু-তে ব্রাদার জুলিয়ান হেতু আমাদের ডিকটেশন দিয়েছিলেন ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষায়। তাঁর সেই ইউরোপীয়ান ইংরেজির অ্যাকসেন্ট আজও কানে বাজে। তিনি আমাদের ‘গ্রেফায়ার্স ববি’ চ্যাপ্টার থেকে ডিকটেশন দিয়েছিলেন। তাঁর বলা একটা লাইন এখনও মনে পড়ে, ‘ অ্যাজ ইফ ইট ওয়াজ ট্রায়িং টু সে প্লিজ গিভ মি মাই বান।’ এটা ছিলো একটা প্রভুভক্ত কুকুরের গল্প যার নাম ছিলো ববি। মনিবের মৃত্যুতে সে শোকার্ত হয়ে তার কবরে শুয়ে থাকতো। ব্রাদার জুলিয়ান হেতুর পরে আমাদের প্রিন্সিপ্যাল হয়ে আসলেন ব্রাদার মার্সেল সিএসসি। তিনি দীর্ঘকাল এ স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ঝোঁক ছিলো পড়াশুনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটির ওপর। তিনি দাবা, বাস্কেটবল, ভলিবল, টেবিল টেনিস ইত্যাদি ক্রীড়াকে যেমন প্রাধান্য দিতেন, তেমনি স্কাউটিং ও কাবিংকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। তিনি ড্রইং ও শরীরচর্চাকেও সমমাত্রায় দেখতেন। ফলে প্রতিবছর শহিদ দিবসে বাণী টিচারের নেতৃত্বে ভালো ভালো আঁকা ছবির প্রদর্শনী হতো। তাঁর আমলেই ভিক্টর হালদার ভাই কুমিল্লা বোর্ডে এসএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান পেলেন। তিনি সম্ভবত আঠারোতম স্থান দখল করেছিলেন। তাঁর একটা স্কুটি ছিলো। তার ওপর সওয়ার হয়ে ব্রাদার মার্সেল শহরে বিচরণ করে নিজের যোগাযোগ বজায় রাখতেন। ক্লাস এইটে আমি স্কুল ত্যাগ করার সময় তিনি বাস্কেটবল টিম নিয়ে রাজশাহী গিয়েছিলেন বিভাগীয় টুর্নামেন্টে অংশ নিতে। এর কয়েকবছর পর শুনি তিনি কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়ে কানাডায় পরলোকগমন করেন।
ঊনিশশো সাতাশিতে পাড়ি জমালাম কলেজিয়েট স্কুলে। এখানে এসে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পেলাম জনাব আব্দুল খালেক স্যারকে। তিনি ছিলেন বিএসসি বিএড। গণিতের শিক্ষক। হেড স্যার হওয়ার পরে আর ক্লাস নিতেন না। গলার স্বর কখনও খুব একটা উঁচু ও কড়া করতে শুনিনি। একবার কোনো কারণে আমাের গণিত শিক্ষক না আসায় তিনি আমাদের একটা উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিয়েছিলেন। বর্গমূল বিষয়ক ক্লাসটি মূলত ক্লাস ছিলো বলা যাবে না, ছিলো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এক মধুর মিলনমেলা। আদর আর আনন্দের মধ্য দিয়ে গণিতকে আমরা কখন যাপন করলাম সেদিন তা টেরই পেলাম না। তবে দিনশেষে বুঝলাম, আমাদের হেড স্যার একজন ভালো অনুপ্রেরণাদানকারী ব্যক্তি ছিলেন। পদাধিকার বলে স্যার অনেক কিছুর সাথে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সেই পদভার তাঁর ব্যক্তিত্বকে ঘুনে ধরাতে পারেনি মোটেও। স্যারের এক ছেলে তখন স্কুলের শিক্ষার্থী না হলেও আমাদের সাথে ঊননব্বই সালে শিক্ষা সফরে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। তিনি আমাদের চেয়ে বয়সে বেশ কয়েক বছর জ্যেষ্ঠ ছিলেন।
স্কুল ছেড়ে কলেজে ওঠার পর সবাই উপদেশের সাথে বলতে লাগলো, কুয়ো থেকে এবার উঠে এলে জ্ঞানের মহাসমুদ্রে। সেই মহাসমুদ্রে এসে সান্নিধ্য পেলাম আমাদের প্রিন্সিপ্যাল ড. এম এ সবুর চৌধুরী স্যারকে। তিনি একজন সজ্জন ও বিদ্বান ব্যক্তি। রসায়নের শিক্ষক কিন্তু আমরা পেলাম প্রশাসকরূপে। একবার আমাদের অডিটোরিয়ামে তাঁকে পেয়েছিলাম কাছ থেকে টেবিল টেনিস প্রতিযেগিতার উদ্বোধক হিসেবে। তিনি উদ্বোধনী বক্তৃতায় চীনে টেবিল টেনিসের ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়ার ওপর আলোকপাত করেছিলেন সেদিন। সংক্ষিপ্ত কলেজ জীবনে স্যারের সাথে তেমন ইন্টার অ্যাকশনের সুযোগ হয়নি। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে দীর্ঘদিন কলেজ বন্ধ থাকায় ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পেছানোর আবেদন নিয়ে ছাত্রদের দলের সাথে স্যারের রুমের সামনে ঘোরাঘুরি হলেও স্যারের সাথে কথা বলার আর সুযোগ হয়নি। সুযোগ হলেও আর কী-ই বা বলতাম। তবে স্যারের মেয়ে শান্তা আপা আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। তাকে দেখলে আমার স্যারের মুখ মনে পড়তো, যদিও বাপে-বেটিতে চেহারায় খুব বেশি যে সাযুজ্য ছিলো তা বলা যাবে না। স্যারের বাড়ি ছিলো পটিয়ায়।
কলেজ পার হয়ে চলে আসলাম টার্শিয়ারি স্তরের পড়াশুনার পাদপীঠে। বিরান্নবই-তিরানব্বই সালের সেশনে ঢুকে বের হলাম দুহাজারে। এটুকু সময়ে আমরা পেলাম বেশ কয়েকজন প্রিন্সিপ্যাল। শুরুতেই যাঁকে পেলাম তাঁর নাম শুনলে রোগীরাই কাঁপে আর শিক্ষার্থীরাতো বলাই বাহুল্য। তিনি ছিলেন উপমহাদেশ বিখ্যাত আমাদের গর্বের ধন অধ্যাপক ডা. সৈয়দা নূরজাহান ভূঁইয়া। তিনি বেশ স্বাস্থ্যবতী ছিলেন এবং মায়াময় মুখশ্রীর অধিকারী ছিলেন। ম্যাডামের সফেদ দাঁতের দ্যুতিতে হাসির যে উজ্জ্বলতা ছিলো তাতে রোদ স্বয়ং ম্লান হয়ে যেতো। রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি তারেই আমি বলি’ গানের নায়িকা যেন তিনি। তিনি সাজতে পছন্দ করতেন বেশ। তাঁর ঠোঁটে লাল লিপস্টিকের বর্ণিলতা তাঁর ব্যক্তিত্বকেই প্রকট করে তুলতো। সম্ভবত সিল্কের শাড়িতে নিজেকে অধিক স্বচ্ছন্দ মনে করতেন বলেই তিনি এ ধরনের পরিধেয়ে কলেজে আসতেন বেশি। ম্যাডাম শান্ত থাকলে মমতাময়ী আর ক্ষেপে গেলে যেন সাক্ষাৎ মা শ্যামাময়ী। পরীক্ষার হলে ভাইভার সময় তিনি যেন ছেলেদের জন্যে বরাভয় আর মেয়েদের জন্যে সাক্ষাৎ শনিদেবের বড় বোন। যাকে বকা দিবেন পরীক্ষার টেবিলে সে হল থেকে বের হয়ে নাচতে পারে খুশিতে। কারণ সে জানে সে পাস। এ যেন পেটে খেলে পিঠে সয়। বকা যাকে দিয়েছেন পাস তাকে করিয়ে ছেড়েছেন। কিন্তু রুদ্র বাক্যে যখন কাউকে শাসাতেন তখন তিনি অশ্লীল বাক্যকেও শিল্পে পরিণত করে দক্ষাতা দেখাতেন। তাঁর এতো বকাবাদ্য আর রাগরাঙা ব্যক্তিত্ব নিয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে এক নম্বরের পছন্দপর এবং শ্রদ্ধার পাত্রী। মায়ের মমতা তাঁর চলনে বলনে ঠিকরে পড়তো ঠিকই। ভাইভার টেবিলে জুনিয়র কলিগদের বাড়ি হতে বানিয়ে আনা নাশতা খেতে খেতে উজাড় করে দিতেন তাঁর স্নেহ। একবার আমাদের ইয়ারের এ-ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কমিউনিটি মেডিসিনের আরএফএসটিতে মীরেরসরাই হেলথ কমপ্লেক্সে গিয়েছিলো দিন সাতেকের জন্যে। আরএফএসটি হলো রেসিডেন্সিয়াল ফিল্ড সাইট ট্রেইনিং। তো এমনিতেই আমাদের ইয়ারে এ-ব্যাচের বন্ধুরা ছিলো খুব বেশি মাখো মাখো। তার ওপর বল্গাহীন হরিণের মতো আরএফএসটিতে গিয়ে লাগামছাড়া জীবন পেলো। জোছনা পুলকিত যামিনীতে তারা সন্নিহিত এলাকার ফসলের খেতে, পুকুরের পাড়ে নর-নারীতে একাত্ম হয়ে চাঁদের হাসির বন্যাকে উপভোগ করতে শুরু করলো। জোছনায় অবগাহিত রাত তাদের কাছে দিনের চেয়েও অধিক সৌন্দর্য নিয়ে উছলে পড়লো যেন। কোনো অশালীনতা নয় বরং অনির্বচনীয় আনন্দের জোয়ারে তারা ভাসিয়েছিলো ভেলা। যা কিছু মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে শোভন তা তো আর প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে স্বাভাবিক নয়। তাই রক্ষণশীল এবং মানবীয় জীবনের সৌন্দর্যে অনভ্যস্ত সহজ সরল গ্রাম্য মানুষের চোখে তা হয়ে গেলো নিষিদ্ধ দুষ্কর্মেরও অধিক নিন্দনীয়। সঙ্গত কারণেই অভিযোগ গেলো ঐ হেলথ কমপ্লেক্সের প্রধানের কাছে এবং তা পরবর্তীতে যুৎসই ও যথাযথ মাধ্যম হয়ে আমাদের বাঘপ্রতিম প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের কাছে। তিনি তাঁর মুখে পড়া শিকার হরিণ শাবকের মতো এ-ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পেয়ে জলদগম্ভীর গর্জনে বলে উঠলেন, ‘যদি তোমাদের এতোই দরকার ছিলো তবে আমাকে বলতে, আমি তোমাদের বিয়ে দিয়ে দিতাম’। ম্যাডামের এই ‘ধরণী দ্বিধা হও’ জাতীয় বাক্যে সবাই অধোবদনে মৃত্তিকায় অশ্রুপাতে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর চারপাশে থাকা সহকর্মীরা হাসি লুকোতে আপ্রাণ চেষ্টা করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে অবশ্য ম্যাডাম দিনখানেকের ব্যবধানে মা হয়ে উঠলেন এবং তাদের হয়ে অন্যদের দু-চার কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। কখনও মধুবর্ষী কখনও কর্কটভাষী ম্যাডামের একটা নান্দনিক গুণ ছিলো। তিনি রবীন্দ্রসংগীত ভালো গাইতেন। জানি না বালিকা বয়সে কিংবা তারুণ্যে তিনি সংগীত আরাধনায় নিমগ্ন ছিলেন কি না। তবে আনরা যখন তাঁকে শুনেছিলাম তখনও তিনি কোকিলকণ্ঠী ছিলেন নিঃসন্দেহে। আমরা পাস করে বের হওয়ার বছর কুড়ি পরে ফেসবুকে খবর পেলাম, আমাদের সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম, যাঁর হাতে অসংখ্য শিশু যেমন দুনিয়া দেখেছে তেমনি ডাক্তারও হয়েছে, তিনি ক্যান্সারের কাছে দমের যুদ্ধে হেরে গিয়ে চিরজীবী হয়ে গেছেন কালের কপোলতলে। মহান স্রষ্টা আমাদের পরমারাধ্য গুরুমাকে উচ্চতর পারলৌকিক মর্যাদা দান করুন।
প্রিন্সিপ্যাল পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষায় আমরা বাঘিনীর হাত থেকে নিস্তার পেলেও পরবর্তীতে সিংহের খাঁচায় পতিত হলাম। আমাদের সেই লেজহীন কেশরহীন সিংহের নাম অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। উচ্চতায় খাটো গড়নের হলেও ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন এভারেস্ট শৃঙ্গের সমউচ্চতার। তাঁর মুখের ভাষা ছিলো প্রমিত। তাঁর গলার স্বরে ছিলো মোহনীয় জাদু। তাঁর শব্দ চয়নে ছিলো অনুপম প্রাজ্ঞতা। তাঁর বক্তব্য শুনতে শিক্ষার্থীরা উন্মুখ হয়ে থাকতো। এমন অনেকেই আছেন, শুধু স্যারের কথা শুনতেই কলেজে আসতো। আমাদের এনাটমির লেকচারার আমানউল্লাহ্ স্যার বার বার অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, আমাদের প্রিন্সিপ্যাল স্যারের শুধু কথাও তাঁর জন্যে বড় প্রাপ্তি। এ যেন শ্রবণে সুধাদায়ী। স্যারের মুখের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতো কলম। সেই কলমে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো ঝরনার জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে ফুটে উঠতো। বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় যাঁরা বিজ্ঞান চর্চায় পথিকৃৎ, আমাদের প্রিন্সিপ্যাল অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। বড় মানুষ পরীক্ষা নিলে ছাত্ররা সহজেই পাস করে, এটা স্যারকে দেখেই আমাদের জানা হয়ে যায়। ভাইভা পরীক্ষায় বায়োকেমিস্ট্র ও ফিজিওলজি সহজ হয়ে আসে স্যারের সহজ ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নে। স্যারের মেরুদণ্ড খাড়া ছিলো সব সময়। তাই কোনো রাজনৈতিক চাপ তাঁকে কাবু করতে পারেনি। শান্তি নিকেতনে প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করা স্যারের রবীন্দ্রপ্রীতি যেমন ছিলো তেমনি বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রেমও ছিলো গভীর। বংশগতভাবে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার আকিলপুর গ্রামের জমিদার ছিলেন তাঁরা। তাঁর ছোট ভাই দন্ত চিকিৎসক ও রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ডা. অরূপ রতন চৌধুরী একুশে পদক জয়ী। আর তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন বিজ্ঞান সাহিত্যে। তাঁর মা ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরীর লেখা পাঠ্যবইয়ে আমরা ক্লাস সেভেনে পড়েছি। একজন প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে তিনি এতোটাই দক্ষ ছিলেন যে, একই সাথে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিনও ছিলেন। তিনি অবসরোত্তর জীবনে বারডেমের ল্যাব সায়েন্সের পরিচালকরূপে দায়িত্ব নিয়ে সারা বাংলাদেশে ডায়বেটিক হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরিগুলোকে মানোন্নীত করেন। তিনিও দিনশেষে কর্কট-দানবের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে অসীমে বিলীন হন বছর দেড়েক আগে।
শুভাগত স্যারের পরে আমরা যাঁকে পেলাম তাঁকে সবাই সংক্ষেপে মাসি নামে চেনে। দুষ্টু ছেলের দল যখনই সুযোগ পেতো তখনই এরকম মেধার খেল দেখাতো। এই মাসির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। আসলে না তিনি নারী, না তিনি মায়ের বোন। তিনি ছিলেন মান্নান সিকদার স্যার যাঁকে সংক্ষেপে মাসি হতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে। তাঁর পুরো পরিচয় ছিলো অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান সিকদার। তিনি একজন প্যাথলজিস্ট এবং একজন সংস্কৃতিসেবী। রসিক ছিলেন স্যারে। তাঁর উয়িটও ছিলো তীক্ষ্ণ। স্যার খুব বেশিদিন ছিলেন না। ছোটবেলায় পোলিওর কারণে স্যারের এক পা খাটো হয়ে গিয়েছিলো। ভারসাম্য বজায় রাখতে স্যারের সেই পায়ের জুতোর হিল কৃত্রিমভাবে উঁচু করা থাকতো। খাটো উচ্চতার হলেও স্যারের চালচিত্র কিন্তু অনেক বড়ো ও দেদীপ্যমান। স্যার ছিলেন একজন বিতর্কপ্রেমী। আমাদের আগের ইয়ারের বিতার্কিক মহিউদ্দিন হুমায়ূন ভাই স্যারের ছেলেকে পড়াতেন বাসায় গিয়ে। তিনি এসে গল্প করতেন, স্যারের বাসায় নাকি তাকে প্রচুর নাশতা খেতে দেওয়া হতো। অর্থাৎ স্যার পিতৃসুলভ ছিলেন। আমাদের ইয়ারের যাহেদ ইমিউনিটি সংক্রান্ত ক্লাস টেস্টের পরে স্যারের খুব প্রিয় হয়ে গিয়েছিলো।
আর একজন প্রিন্সিপ্যালও আমরা পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। তাঁর নাম ছিলো অধ্যাপক ডা. চৌধুরী বি. মাহমুদ। সংক্ষেপে সিবিএম। অবশ্য তাঁর শাসনামলে আমাদের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ছিলো না। তিনি পানজীবী ছিলেন। পানের রসে রঙিন করা মুখও মাঝে মাঝে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হতো। কৃষ্ণবর্ণের উন্নত নাসিকায় স্যার শ্যামসম দৃপ্ত দেহে বিচরণ করতেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে। (চলবে)






