সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১০:৪৫

প্রবীণদের বাঁচতে হলে পড়তে হবে

হাসান আলী
প্রবীণদের বাঁচতে হলে পড়তে হবে

একটা সময় ছিলো, যখন বই ছিলো মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। অবসর বিকেলে, ছুটির দিনে কিংবা রাতের নির্জনতায় বই খুলে বসা ছিলো আনন্দের এক বিশেষ অভ্যাস। বইয়ের পাতায় মানুষ খুঁজে পেতো জ্ঞান, কল্পনা, অভিজ্ঞতা আর জীবনের গভীর উপলব্ধি। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন হাতে বইয়ের বদলে মোবাইল ফোন, আর বইয়ের পাতা ওল্টানোর বদলে চলছে স্ক্রল করা। কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন হলেই মানুষ বইয়ের তাকের দিকে নয়, গুগলের দিকে হাত বাড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব আর অসংখ্য ছোট ছোট ভিডিও আমাদের মনোযোগকে খণ্ডিত করে দিয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে, আর এর প্রভাব পড়ছে আমাদের চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিশক্তির ওপর। বিশেষ করে প্রবীণদের জীবনে এই পরিবর্তনের প্রভাব আরও বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের মতো মস্তিষ্কেরও যত্ন প্রয়োজন। আমরা যেমন শরীরকে সচল রাখতে হাঁটাচলা করি, ব্যায়াম করি, তেমনি মস্তিষ্ককে সচল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। আর এই অনুশীলনের অন্যতম সেরা উপায় হলো বই পড়া।

বই পড়া মানে শুধু তথ্য সংগ্রহ করা নয়, এটি একটি সক্রিয় মানসিক প্রক্রিয়া। যখন কেউ বই পড়ে, তখন তাকে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, বাক্যের অর্থ বুঝতে হয়, চরিত্র ও ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে হয়, নতুন তথ্যকে পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে। ফলে স্মৃতিশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি এবং মনোযোগ—সবকিছুরই উন্নতি ঘটে।

অন্যদিকে, মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য গ্রহণ অনেক সময়ই খুব দ্রুত ও অগভীর হয়। সেখানে চিন্তার চেয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠা তথ্যের প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই বেশি কাজ করে। এতে মস্তিষ্কের গভীর অনুশীলন হয় না। এর ফল হিসেবে দেখা যায়, মানুষ ক্রমশ ভুলে যেতে থাকে ছোট ছোট তথ্যও। অনেকেই আজকাল নিজের পরিচিত মোবাইল নম্বরটিও মুখস্থ বলতে পারেন না। স্মৃতির ওপর নির্ভরতার বদলে আমরা যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের কার্যকর ব্যবহার কমে গেলে বয়সের সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যদিও বই পড়া একাই সব রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না, তবে এটি মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং মানসিক অবক্ষয়ের গতি কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস প্রবীণদের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বই পড়ার আরেকটি বড়ো উপকার হলো এটি একাকীত্ব দূর করে। অনেক প্রবীণ অবসরের পরে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করেন। সন্তানরা ব্যস্ত থাকে, সামাজিক যোগাযোগ কমে যায়, জীবনের গতি মন্থর হয়ে আসে। এই সময়ে বই হতে পারে এক অনন্য সঙ্গী। একটি ভালো উপন্যাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ বা ইতিহাসের বই প্রবীণ মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, আনন্দ দেয়, আলোচনার খোরাক জোগায় এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনে।

বই মানুষকে উদার করে, সহনশীল করে, নতুনভাবে পৃথিবীকে দেখতে শেখায়। সমাজের পরিবর্তন, মানুষের জীবনবোধ, সংস্কৃতির বিবর্তন, নতুন মতামত ও উপলব্ধির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় বই। ফলে প্রবীণরাও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন জ্ঞানের সংযোগ ঘটিয়ে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারেন।

প্রবীণদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতে পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানরা যদি বাবা-মায়ের হাতে বই তুলে দেয়, তাঁদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করে, কিংবা একসঙ্গে পড়ার পরিবেশ তৈরি করে—তাহলে এই অভ্যাস সহজেই গড়ে উঠতে পারে।

পাড়া-মহল্লায় ছোট ছোট পাঠচক্র, প্রবীণ পাঠাগার কিংবা বই আলোচনা সভা আয়োজন করাও হতে পারে দারুণ উদ্যোগ।

সুস্থভাবে বাঁচতে হলে শুধু শরীরের যত্ন নিলেই হবে না, মনের ও মস্তিষ্কের যত্নও নিতে হবে। বই সেই যত্নের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই প্রবীণদের প্রতি আমাদের আহ্বান—মোবাইলের পর্দা থেকে কিছুটা সময় সরিয়ে বইয়ের পাতায় ফিরে আসুন। কারণ সত্যিই, প্রবীণদের বাঁচতে হলে পড়তে হবে। বইয়ের আলোয় মন হবে উজ্জ্বল, চিন্তা হবে প্রসারিত, আর জীবন হবে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থপূর্ণ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়