প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১০:৪৭
নজরুলের প্রকৃতি ভাবনা

প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে জানা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যেই অনেক লেখকের লেখার হাতেখড়ি হয় । আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও কিন্তু এর ব্যতিক্রম নন । তিনি শুধু বিদ্রোহের কবিতাই লিখনেনি । প্রকৃতির এই কবিকে এখনো চেনা অনেক বাকি আমাদের । প্রকৃতির কাছেই অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। আর তাকে যতো জানা যায়, ততো রহস্য উন্মোচিত হয়। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। নজরুল চর্চা কেন্দ্র বাঁশরীর এক আলোচনা সভায় আলোচকরা বলেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কিংবা প্রেমের কবি ছিলেন না, তিনি প্রকৃতিরও কবি ছিলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টির চর্চা, প্রচার ও প্রসারে কাজ করছে নজরুল চর্চা কেন্দ্র বাঁশরী। বাঁশরীর আয়োজনে নজরুলের প্রকৃতি ভাবনা নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় প্রধান অতিথি প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, নতুন প্রজন্মকে নজরুল সম্পর্কে জানাতে এবং দেশের প্রকৃতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ৯০ বছর আগে প্রকৃতিকে নিয়ে এমন অনেক তথ্যবহুল রচনা করেছেন যা অবাক করার মতো । তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হলেও কবি যে প্রকৃতিকেও খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন, সেই খবর কিন্তু আমরা খুব কমই রাখি। ছেলেবেলাতেই ছিলো তাঁর দুখু, নুরু, ব্যাঙাচিসহ আরো অনেক নাম! নজরুলের প্রথম দিকে ‘সালেক’ গল্পে মুক্তি কবিতায় এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার পূর্বে লিখিত কোনো কোনো রচনায় যে অলৌকিকতার সন্ধান পাওয়া যায় তা হয়তো প্রকৃতির বুক থেকেই আহরণ করেছিলেন । প্রকৃতিকে জানা মানে নিজেকে জানা আর নিজেকে জানা মানে জীবনের সব গভীরতা আস্বাদন করা। তাঁর আচার-আচরণে এই ঔদাসীন্য, প্রকৃতি প্রেম লক্ষ করে লোকে তাঁকে ‘তারাক্ষেপা’ বলেও ডাকতো। নজরুলের প্রকৃতির প্রেমের একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো প্রকৃতির মধ্যে মানবিক গুণের আরোপ করা । প্রকৃতি কখনো মানবিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উজ্জ্বল সত্তার উপস্থিতি নিয়ে হাজির হচ্ছে , কখনো মানুষই হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির অংশ। আবার কখনো নজরুলের প্রকৃতি ও নারীকে আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে । বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারির মতো প্রেম ও বৃক্ষ-প্রেমের কবিতা বাংলা কবিতায় বিরল বলা চলে ।
কবি কেবল প্রকৃতির মধ্যে মানবীয় গুণ অর্পণই করেননি, প্রকৃতির অনুভূতিতেও মানবীয় অনুভূতি আরোপ করেছেন । তার চক্রবাক কাব্যের ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতায় লিখেছে, “জেগে দেখি মোর বাতায়ন পাশে জাগিছে স্বপনচারী/নিশিত রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি!”
প্রকৃতির বিচিত্র সব রূপ তাঁর কাছে নতুন রূপে ধরা দিয়েছে প্রতিনিয়ত । তাই তো কবি বলেছেন-
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়’।
আর এ থেকেই বোঝা যায়, কবি কতো রূপে, কতো ভাবে প্রকৃতিকে আবিষ্কার করেছেন । নজরুলের রচনাতেই আমরা প্রথমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের উল্লেখ এবং তার রূপ প্রকৃতির অনুপম বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই । নজরুল লিখেছিলেন এভাবে---- নমঃ নমঃ নমঃ বাঙলাদেশ মম
চির-মনোরম চির-মধুরৃ/হরিত অঞ্চল হেমন্তে দুলায়ে/ফেরে সে মাঠে মাঠে শিশির ভেজা পায়ে,/
শীতের অলস বেলা পাতা ঝরার খেলা..... ।
অনেকেরই হয়তো অজানা, নজরুলের বিদ্রোহের আড়ালে ছিলো গভীর প্রকৃতি প্রেম এবং মানব প্রেম ।নজরুলের হৃদয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশেছিলো আবহমান গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতি। ‘অগ্নি-বীণা’ এবং ‘দোলন-চাঁপা’ এ দুটি কাব্যগ্রন্থের কবিতা নজরুল ইসলাম প্রায় একই সময়ে রচনা করেন। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থে নজরুল যেখানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুগের অগ্নিক্ষরা দিনের কবিতা রচনা করেছেন, সেখানে ‘দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থে কবি রচনা করছেন প্রেম ও প্রকৃতির কথা সাবলীলভাবে। দোলন চাঁপা কাব্যগ্রন্থের বেলাশেষে কবিতায় নজরুলের প্রকৃতি প্রেম প্রকাশ পেয়েছে ঠিক এভাবে --
“ধরণী দিয়েছে তার
গাঢ় বেদনার
রাঙা মাটিরাঙ্গা ধূসর আঁচলখানি
দিগন্তের কোলে কোলে টানি
পাখি উড়ে যায় যেন কোন্ মেঘ-লোক হ’তে
সন্ধ্যা-দীপ-জ্বালা গৃহ-পানে ঘর-ডাকা পথে।”
নজরুল তাঁর অনেক বইয়ের নামকরণের উৎস খুঁজেছেন প্রকৃতি থেকে । দোলনচাঁপা, ঝিঙেফুল, ফণীমনসা, রাঙা-জবা, মহুয়া আরো কতো নাম । তাঁর রচনাসম্ভারে নানাভাবে পুষ্প-বৃক্ষের প্রসঙ্গ এসেছে। কখনো উপমায়, কখনো সরাসরি। যেমন- নার্গিস কখনো প্রিয়তমা, কখনো ফুল হিসেবে এসেছে। তিনি গেয়েছেন-
‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে
ঝরা বন-গোলাপের বিলাপ শোনে’
নজরুলের গান কখনো ঋতু বৈচিত্র্যের অপরূপ রূপবন্দনা হিসেবে, আবার কখনো যথার্থ প্রকৃতির গান হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের মাঝে।
রুক্ষ, বিবর্ণ, তাপদগ্ধ দিন, বাদলের আকাশ ঘিরে সজল হাওয়ার কান্না, মেঘে মেঘে অন্ধ আকাশে বাদল ঝরার পালা, শিউলি তলায় শারদ প্রাতের পল্লী বালিকার ফুল কুড়ানোর চঞ্চলতা, শরতের নীল আকাশে মেঘেদের দল বেঁধে ভ্রমণ করা, হেমন্তের মাঠ ও নবান্ন উৎসবসহ অসংখ্য রূপ নজরুলের প্রকৃতি বিষয়ক গানে গানে প্রকাশ পেয়েছে অপরূপ নান্দনিকতায়, যা মানব হৃদয়কে নাড়া দেয় প্রবলভাবে ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
নিলয় ১৭৪/৩ , নতুন পাড়া, সুনামগঞ্জ।





