শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:৩৩

কল্পনার রঙে আঁকা মানুষটি

উজ্জ্বল হোসাইন
কল্পনার রঙে আঁকা মানুষটি

রাতের সেই অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে আমার জীবনের ভেতর নতুন এক আলো জ্বালিয়ে দিলো। আগে কখনো এত গভীরভাবে নিজের জীবনকে নিয়ে ভাবিনি। সবসময় ব্যস্ততা, কাজ, মানুষের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি যেন নিজের ভেতরেই ফিরে আসছি। একটা প্রশ্নই বারবার মাথায় ঘুরছিল আমি কাকে খুঁজছি?

অচেনা কাউকে? নাকি এমন কাউকে, যাকে আমি আগে থেকেই চিনি, জানি, বুঝি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই একদিন হঠাৎ মনে পড়লো একটা মুখ। খুব পরিচিত, খুব কাছের, অথচ এতদিন যেন ভুলেই ছিলাম।

মেয়েটিকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। বলতে গেলে, তার বেড়ে ওঠার অনেকটা পথেই আমি পাশে ছিলাম। যখন সে ছোট ছিল, পড়াশোনায় একটু দুর্বল ছিল। তখন আমিই তাকে পড়াতাম। অক্ষর চিনতে শিখিয়েছি, বাক্য গঠন শেখিয়েছি, জীবনের ছোট ছোট নীতিগুলো বোঝানোর চেষ্টা করেছি। সে ছিল অন্যরকম। সাধারণ মেয়েদের মতো চুপচাপ নয় বরং স্পষ্টবাদী, প্রতিবাদী। অন্যায় দেখলে চুপ থাকতে পারতো না। তার চোখে একটা আগুন ছিলÑযেটা ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো নয়, বরং আলো ছড়ানোর মতো।

আমি তাকে সবসময় ছোট বোনের মতো দেখেছি। কখনো ভাবিনি এই মেয়েটি একদিন আমার জীবনের এত বড় প্রশ্নের উত্তর হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু আজ, এত বছর পর, কেনো যেন তার কথাই বারবার মনে পড়ছে।

আমি চোখ বন্ধ করে তার মুখটা মনে করার চেষ্টা করলাম। সময়ের সাথে সে নিশ্চয়ই বদলে গেছে। ছোট্ট মেয়েটা এখন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। তার নিজের ভাবনা, নিজের স্বপ্ন আছে। কিন্তু তার সেই স্পষ্টবাদী স্বভাবটা কি এখনো আছে? এই প্রশ্নটা আমাকে কৌতূহলী করে তুললো।

আমি ভাবতে লাগলাম যদি সে আমার জীবনে আসে, কেমন হবে?

আমার কল্পনার দেয়ালে তখন ধীরে ধীরে রং লাগতে শুরু করলো।

আমি দেখলাম একটা ছোট্ট সংসার। খুব বড় কিছু না, কিন্তু উষ্ণতায় ভরা। সকালে সে ব্যস্ত হয়ে রান্নাঘরে কাজ করছে, আর আমি হয়তো চা হাতে দাঁড়িয়ে আছি। সে হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে বলছে, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? একটু সাহায্যও তো করতে পারো!

আমি হেসে ফেললাম। এই দৃশ্যটা এত বাস্তব মনে হলো যে, মনে হলো আমি যেন সত্যিই সেখানে দাঁড়িয়ে আছি।

আবার ভাবলাম আমার খামখেয়ালিপনা, অনিয়মিত জীবন সে কি এগুলো মেনে নিতে পারবে?

তার সেই প্রতিবাদী স্বভাব যদি আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়?

হয়তো মাঝে মাঝে তর্ক হবে, মতের অমিল হবে। কিন্তু সেই তর্কের মাঝেও কি ভালোবাসা থাকবে? আমি জানি না। কিন্তু কল্পনায় দেখলাম আমরা তর্ক করছি, আবার কিছুক্ষণ পরই হাসছি। সে হয়তো রাগ করে অন্য ঘরে চলে গেছে, আর আমি গিয়ে তাকে বুঝাচ্ছি। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলো আমাকে অদ্ভুত এক আনন্দে ভরিয়ে দিলো।

আমি বুঝতে পারলাম আমি শুধু একজন জীবনসঙ্গী খুঁজছি না, আমি খুঁজছি এমন একজন মানুষকে, যার সাথে আমি আমার অসম্পূর্ণতাগুলোও ভাগ করে নিতে পারবো। মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতে একটা সময় মনে হলোÑআমি কি তাকে নতুন করে চিনি?

সে এখন কেমন? তার জীবনে কি কেউ আছে? সে কি আমাকে এখনো আগের মতোই দেখে?

এই প্রশ্নগুলো আমাকে কিছুটা অস্থির করে তুললো। আমি জানি, বাস্তবতা কল্পনার মতো সহজ না। হয়তো সে এখন অন্য কোনো স্বপ্নে বিভোর, হয়তো তার জীবনে অন্য কেউ আছে।

তবুও মনে হলো জানার চেষ্টা করতে দোষ কী?

একদিন অনেক ভেবে তার সাথে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। অনেকদিন পর তার নাম্বার জোগাড় করলাম। ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। ডায়াল করতে গিয়েও থেমে গেলাম। মনে হচ্ছিল এই একটা ফোন কল হয়তো অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সাহস করে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।

‘হ্যালো?’

কণ্ঠটা চিনতে একটু সময় লাগলো, কিন্তু তারপরই বুঝলাম এটা সেই কণ্ঠ, শুধু সময়ের সাথে আরও পরিণত হয়েছে। আমি নিজের নাম বলতেই কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর হালকা বিস্ময়ের সুর।

‘আপনি! এতদিন পর?’

আমরা কথা বলতে শুরু করলাম। প্রথমে একটু অস্বস্তি ছিল, তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। সে এখন অনেক বদলে গেছে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও পরিণত। কিন্তু তার সেই স্পষ্টবাদী স্বভাবটা এখনো আছে।

কথার ফাঁকে সে বললো

‘আপনি তো আমার অনেক বড় শিক্ষক ছিলেন। আপনার জন্যই আমি অনেক কিছু শিখেছি।’

এই কথাটা শুনে আমার ভেতরে কেমন যেন হলো। একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি গর্ব, লজ্জা, আর কিছুটা দ্বিধা। আমি ভাবলাম আমি কি এই সম্পর্কটাকে অন্য দিকে নিয়ে যেতে পারবো?

কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে চাইনি। আমি চাইছিলাম এই সম্পর্কটা ধীরে ধীরে, স্বাভাবিকভাবে এগোক।

আমরা নিয়মিত কথা বলতে শুরু করলাম। তার চিন্তাভাবনা, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করতে লাগলো। আমি বুঝতে পারলাম আমি শুধু কল্পনায় নয়, বাস্তবেও তাকে নতুন করে আবিষ্কার করছি।

কিন্তু তবুও ভেতরে একটা ভয় কাজ করছিল যদি সে আমাকে সেইভাবে না দেখে?

একদিন সাহস করে তাকে বললাম।

‘তোমাকে নিয়ে আমি একটু অন্যভাবে ভাবছি।’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

আমার হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেলো।

তারপর সে ধীরে বললো

‘আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমাকে একটু সময় দিতে হবে।’

এই উত্তরটা আমাকে স্বস্তিও দিলো, আবার অস্থিরও করলো।

আমি জানি সবকিছু সময়ের উপর ছেড়ে দিতে হবে।

আজ আমি আবার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এবার সেই স্বপ্ন শুধু কল্পনার নয় বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে।

আমি জানি না, শেষ পর্যন্ত কী হবে। হয়তো সে আমার জীবনসঙ্গী হবে, হয়তো হবে না।

কিন্তু একটা জিনিস আমি নিশ্চিত এই পথচলাটা আমাকে বদলে দিয়েছে।

আমি এখন আর খামখেয়ালিপনায় ভেসে যাই না। আমি বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছি।

আর সবচেয়ে বড় কথা আমি আবার ভালোবাসতে শিখেছি। কল্পনার দেয়ালে যে ছবি আঁকা শুরু হয়েছিল, সেটি এখন ধীরে ধীরে বাস্তবের রঙ পাচ্ছে। হয়তো এই ছবিটা একদিন সম্পূর্ণ হবে। আর যদি না-ও হয়, তবুও এই আঁকার আনন্দটুকু আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। কারণ জীবনে কিছু স্বপ্ন পূরণ না হলেও, সেই স্বপ্ন দেখার সাহসটাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

আর আমি আমি এখন সেই সাহসটুকু খুঁজে পেয়েছি।

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়