শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৬

পান্তা ভাতের স্বাদ

আহমেদ মুসা
পান্তা ভাতের স্বাদ

আরে, এই অসময়ে বিদ্যুৎ যেতে হলো। অগত্যা ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে খুজে নিলাম একটা পেঁয়াজ আর কয়েকটা শুকনো মরিচ। ইলেকট্রিক লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শুকনো মরিচ গুলো ভেজে নিলাম।এই পোড়া ধকের গন্ধ আমার কখনোই সহ্য হয়না। কাশতে শুরু করলাম। এরপর পিঁয়াজ কেটে নিয়ে অন্ধকারে ফ্লাশ জ্বেলে পান্তা ভাতের আয়োজন। ভাজা ইলিশের অভাব বোধ হচ্ছে। জানালা দিয়ে ঝুম বৃষ্টির আওয়াজ। মাঝে মাঝে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দে অতীতের স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছি। আমি শুনতে পাচ্ছি মা আমায় খাবার খেতে ডেকে যাচ্ছেন। আমি তখন সাড়া না দিয়ে কানে বালিশ চেপে ফোনের স্কিনে আমার প্রিয় সাইমুম সিরিজ উপন্যাসে মগ্ন। মা যখন সামনে এসে দাঁড়ালেন ফোনটা ধীরে ধীরে সরিয়ে রেখে ঘুমের ভানে পড়ে থাকি। মা কিছুক্ষণ বকে চলে যান।তিনি আমার অসময়ে ঘুমের ভান বুঝতে পারেন।কিংবা কখনো কলেজে বা কাজে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে যখন খাবার না খেয়ে বের হবো তখন মা কিংবা বড় বোন এসে মুখের সামনে খাবার তুলে দিয়ে বলছে খাবার না খেয়ে কোথা ও যেতে পারবিনা, করুন সুরে বলছি দয়া করে আমায় যেতে দাও, দেরি হয়ে যাচ্ছে। তারা নাছোড়বান্দা। মা বলে দেরি হলে হোক আগে খাবার পরে কাজ। তার উপর আপুর রাগী চোখে ঢেকুর গিলে বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে বের হই।তখন তাদের মমতাময়ী চেহারায় যে স্বস্তির চিহ্ন আমি দেখতে পাই তা আমার কাজ কিংবা কলেজে দেরির জন্য বকা শুনাটা সামান্যতম ও কষ্ট দিতনা।আজ ফ্লাশের আলোয় আয়োজন করা পোড়া মরিচ আর পিয়াজের টুকরো দিয়ে পান্তাভাত আমায় কল্পনার জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনল। চোখ ঝাপসা হয়ে আসল। আমি বুঝলাম, আজ অশ্রুরা আমার বারন শুনবে না। তাদের আজ বাঁধা দিলাম না, গড়াতে দিলাম তাদের গতিপথে।টুপ করে পড়ে পান্তাভাতের পানির সাথে মিশে গেল। নিজের স্বপ্ন পূরনে ভালো একটা কলেজে পড়বো বলে যেদিন গ্রাম ছেড়ে নতুন শহর আসি দুদিন খাবার না খেয়ে থাকলে ও সেদিন কারো বকা শুনতে হয়নি কিংবা কেউ মুখের সামনে খাবার এনে বলেনি আগে খেয়ে নে পরে কাজ। মনে পড়ে দুদিন পর শুভাকাঙ্ক্ষী একজন জানতে পেরে খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন।খাইয়ে না দিলে ও দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন। তোমাদের অনুপস্থিতিতে তার উপকার আমি আজো ভুলিনি।অচেনা পরিবেশে সেই ছিলো একমাত্র চেনা কেউ।এরপর, পরিবারের সবার সাথে খাবার খেতে যে আমি অভ্যস্ত ছিলাম সেদিন হাত পুড়িয়ে নিজ হাতে রান্না করা খাবারের স্বাদ একা একা খেতে কেমন ছিলো তা আজ মনে নেই। রেষ্টুরেন্টের খাবার ও খেয়ে দেখেছি মায়ের মমতা মিশানো রান্নার স্বাদ আমি পাইনি। তারপর কতশত বার হাত পুড়িয়ে রান্না করলাম, সেই স্বাদ আর পাইনি।খাচ্ছি তো কেবল বেঁচে থাকার জন্য, খাওয়ার জন্য বাঁচছি না। তবে সুযোগ পেলেই বাড়িতে যাই মায়ের বকা শুনে খাবার খেতে,একটু আবদার করি মা অনেকদিন তোমার হাতে খাইনা, দাওনা একটু খাইয়ে । পুরনো অভ্যাসে খাবোনা বলে যখন ফোন স্কিনে ব্যস্ত হই কিংবা ঘুমের ভানে বিছানায় মুখ গুজে পড়ে রই কিংবা মাঝে মাঝে পড়ার টেবিলে বসে পড়ায় মগ্ন হই তখন মা খাবার খেতে বললেই আমার এক কথা, খাইয়ে দিলে খাবো নাহলে খাবোনা। মা অগত্যা খাইয়ে দেন, আমি তৃপ্তি নিয়ে খাই। কখনো মায়ের হাতে পান্তা ভাত খাইনি, আজ যখন সময় সংক্ষেপের জন্য পান্তা ভাত নিয়ে বসতে হলো, আমার চোখ তখন ঝাপসা। এই সংগ্রামের অধ্যায়ে অন্ধকারে ফ্লাশের আলোয় আজ নেওয়া যাক পান্তা ভাতের স্বাদ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়