সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০০

দ্বিতীয় প্রেম তৃতীয় তলায়

হাসান আলী
দ্বিতীয় প্রেম তৃতীয় তলায়

প্রথম প্রেমে আছাড় খেয়ে দম যায় যায় অবস্থা আমার। সুন্দর পৃথিবীটা আমার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠলো। মনটা বিষিয়ে উঠলো সমগ্র নারী জাতির প্রতি। মনে হলো প্রেম মানে একটা মধুর প্রতারণা। দুজন দুজনের কাছে নিজকে লুকিয়ে শুধুমাত্র মিথ্যার ফানুস উড়িয়ে দেয়া। আমি তখন দিনরাত কবিতা লিখতে শুরু করলাম। কবিতা লিখে পাতার পর পাতা ভরে ফেললাম। চাঁদপুরের তরুণ কবিদের কবিতা পড়ে শোনালাম, তাঁরা মাথা নেড়ে সমর্থন দিলো। বেশ কিছু কবিতা ছাপানোর জন্যে ঢাকায় পাঠালাম। প্রতি সপ্তাহে পত্রিকা দেখে দেখে হয়রান হয়ে গেলাম। কিন্তু পত্রিকার পাতায় আমার কোনো কবিতা ছাপা হলো না। শেষ পর্যন্ত আমার কবিতা নিয়ে চাঁদপুর কলেজের বাংলার অধ্যাপক সৈয়দ আবদুস সাত্তার স্যারকে দেখালাম। স্যার বললেন, ‘কবিতা লেখার আগে কবিতা পড়। বিভিন্ন কবিদের কবিতা পড়ে মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করো। লেখালেখি করতে হলে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। তুমিতো পড়ই না।’ আমি কিছুটা হতাশা হয়ে ইংরেজির অধ্যাপক হেলাল স্যারকে দেখালাম। তিনি হেসে বললেন, ‘এগুলো কবিতা হয়নি, হয়েছে বিলাপ আর গালাগালি। কবিতা হলো ব্যক্তির চিন্তার নির্যাস।’

পরবর্তীকালে চাঁদপুরের একশ’ কবির কবিতা নিয়ে ‘শত মাল্লার জলতরঙ্গে’ আমার কবিতা স্থান পায়নি। মেয়েদের প্রতি যতোটা ঘৃণা আর বিদ্বেষ মনে তৈরি হয়েছিলো, ক্রমেই তা হালকা হতে শুরু করলো। আবার মনটা অস্থির হয়ে উঠলো নতুন করে প্রেমে পড়তে। স্থির করলাম এবার দেখে শুনে প্রেম করবো। কলেজের সুন্দরী মেয়েদের অনুসরণ করলাম। মেয়েরা প্রায় সবাই সায়েন্স বা আর্টসে পড়ে। কমার্সে কেউ পড়ে না। আমি কমার্সে পড়ি, অতএব নোট আদান প্রদান, বই দেয়া নেয়া লাইনে প্রেম করা সম্ভব হলো না। বন্ধুরা পরামর্শ দিল, ‘দোস্ত লেগে থাক। হাল ছেড়ো না।’ সুন্দরী মেয়েদের কাছে কাছে ঘুরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। কেউ ফিরেও তাকায়নি। একদিন মাস্তান টাইপের এক ছেলে আমাকে শাসিয়ে গেলো। বলে গেলো, ‘তোকে যদি এই মেয়েগুলোর পেছনে ঘুরতে দেখি তবে নলা ভাইঙ্গা হাতে ঝুলাইয়া দিমু।’

ভয় পেয়ে সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকানো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেলো। দেখলাম সুন্দরী মেয়েরা প্রায় সবক’টি কুৎসিত চেহারার ছেলেগুলোর সাথে প্রেম করছে। মনে মনে ভাবলাম, আমার মতো ফরসা ছেলেকে তোদের নজরে পড়লো না! ভূগোলের মোজাম্মেল স্যার আমাকে কিছুটা স্নেহ করতেন। সেই সুবাদে মাঝে মধ্যে স্যারের বিভাগে যেতাম। সেখানে স্যারের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করতাম। ভূগোলে অনেক মেয়ে পড়তো। স্যারের সাথে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে মেয়েদের আড় চোখে দেখতাম। কারো কারো সাথে গায়ে পড়ে কথা বলতাম। কেউই পাত্তা দিলো না। সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দেবো সেই সাহস আমার নেই। মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, যার সাথে প্রেম করবো সে হবে লম্বা ফর্সা, টানা চোখ, লম্বা চুল আর স্বাস্থ্যবতী। আমার স্বপ্নের প্রেমিকার মত চাঁদপুর কলেজে কাউকে খুঁজে পেলাম না। কিছুদিন মহিলা কলেজের সামনে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিলাম। টাউন দারোগার ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে গেলাম। একদিন দেখলাম মহিলা কলেজের সামনে আড্ডা দেয়া কয়েক বখাটে ছাত্রকে টাউন দারোগা লেকের পানিতে সাঁতার কাটতে বাধ্য করছে।

পরিস্থিতি খারাপ দেখে নিজ কলেজের মেয়েদের প্রতি মনোযোগী হলাম। কোনো সাড়া না পেয়ে যখন পুরোপুরি হতাশায় ডুবে যাচ্ছি, তখন একজনকে দেখলাম আমার প্রতি মনোযোগী। মেয়েটি বিএসসি পরীক্ষা দেবে। নকলের দায়ে কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল হলে চাঁদপুর কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। চট্টগ্রামে পরীক্ষা কড়াকড়ি হওয়াতে সেই মেয়েটি ফেল করেছিলো। মেয়েটির নাম জ্যোৎস্না বানু। আমি দ্বাদশ বাণিজ্যের ছাত্র মাত্র। জ্যোৎস্না আমার চাইতে বছর পাঁচেকের বড়ো হবে। তাঁর গায়ের রং কালো, চোখ দুটি খুবই ছোট, খাটো, মাথার চুল ছোট। আমি যেমন মেয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম ইনি তার উল্টো। বুকটা ফাইট্টা কান্না আসতে লাগলো। অনেক কষ্টে নিজকে সামলে নিলাম। জ্যোৎস্না আমাকে কলেজে একদিন আচার খেতে দিলো। আমি জ্যোৎস্নার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত চলে গেলাম। পরদিন কলেজে আমি গেলাম। জ্যোৎস্নার সাথে দেখা হলো, তিনি আমাকে একটা বই হাতে দিয়ে দ্রুত চলে গেলেন। আমি বইটা খুলে ধরতেই একটা খাম মাটিতে পড়ে গেল। খামটা তুলে নিয়ে দেখলাম তাতে আমার নাম লেখা রয়েছে। খাম ছিঁড়ে পড়তে শুরু করলাম। আমার হাত কাঁপছিলো। গা দিয়ে ঘাম বের হচ্ছিলো। গলাটা শুকিয়ে গেলো। কোনোমতে হেঁটে মেসে এসে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর আবারো চিঠি পড়লাম। চিঠিটি শতবার পড়লাম। এক সময়ে চিঠিটি আমার মুখস্থ হয়ে গেলো। সারারাত জেগে দশ পৃষ্ঠার চিঠি লিখলাম। কলেজে চিঠি নিয়ে অপেক্ষা করছি, কিন্তু জ্যোৎস্নার দেখা পেলাম না। বিকেলে কালী বাড়ি মোড়ে মহিলা কলেজের হোস্টেলের সামনে উপস্থিত হলাম। অনেক চেষ্টা করে জ্যোৎস্নার হাতে চিঠি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলাম। দুদিন পর চিঠির উত্তর পেলাম ছয় লাইনের। বিষয়বস্তু হলো, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, দীর্ঘ চিঠি সেজন্যে লেখা হয়নি। এভাবে চিঠি চালাচালি হচ্ছিলে। আমার চিঠি দীর্ঘ আর ওর চিঠি সর্বোচ্চ দশ লাইনের। একদিন চিঠির শেষে লিখলো, ‘আমার চুমু নিও’। আমার মাথায় ঝড় উঠলো, রাতে ঘুমাতে পারলাম না। দিন দশেক পর আমরা এই প্রথম ছায়াবাণীতে দুজন ম্যাটিনি শোতে ছবি দেখতে ঢুকলাম। সিনেমা হল অন্ধকার হলে জ্যোৎস্না আমার হাতখানি টেনে নিজের হাতের মধ্যে নিলো। আমার সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠলো। সিনেমা শেষে রিকশায় ওকে হোস্টেলে পৌঁছে দিতে দুজন একই রিকশায় উঠলাম। হুড তোলা রিকশায় বই দিয়ে মুখ আড়াল করে জ্যোৎস্না আমাকে চুমু খেলো। উত্তেজনায় আমার দম বন্ধ হবার উপক্রম হলো। হোস্টেলের সামনে ওকে নামিয়ে দিয়ে ‘ওয়ান মিনিটে’ ঢুকলাম। একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে চুপ হয়ে বসে রইলাম। সম্পদ দা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মুখে লিপস্টিকের লাল দাগ কেন?’ আমি দ্রুত উঠে গিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললাম। বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা শেষ জ্যোৎস্না বাড়ি চলে গেলো। যাবার দিন চোখের পানি মুছে ওয়াদা করলো, গিয়েই চিঠি লিখবে। আমি চিঠির জন্যে অপেক্ষা করছি। দিন যায় মাস যায় চিঠি আর আসে না। অবশেষে চিঠি আসলো। চিঠি খুলে দেখি বিয়ের

আমন্ত্রণপত্র। আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। বন্ধুরা আমাকে ঠাট্টা করে কবিতায় শোনায়, আমার ভালোবাসা আজ হয়ে গেছে ঘাস/খেয়ে গেছে গরু, দিয়ে গেছে বাঁশ। তওবা করেছি আর কোনো দিন প্রেম করবো না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়