প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২১
ফুটবলের বড় ম্যাচের বড় আয়োজনে বদলে যেতে পারে চাঁদপুরের ক্রীড়া অবকাঠামো
বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠকদের ক’জনের অভিমত

দীর্ঘ অপেক্ষার পর চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে এলো বড় সুখবর। দেশের ঘরোয়া ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ চারটি আসরের ম্যাচ আয়োজনের জন্য চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামকে ভেন্যু হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ‘হোম ভেন্যু’ হিসেবেও মাঠটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ মৌসুমে চাঁদপুরের মাঠে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল ক্লাবগুলোর লড়াই দেখার সুযোগ তৈরি হলো।
|আরো খবর
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের পত্রে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কাছে এ অনুমোদনের কথা জানানো হয়। এর আগে ২২ আগস্ট ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত স্টেডিয়ামের মাঠ ও ড্রেসিং রুমসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরের খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
বাফুফের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে স্বাধীনতা কাপ, সুপার কাপ, ফেডারেশন কাপ এবং বাংলাদেশ ফুটবল লিগ (বিএফএল)-এর ম্যাচগুলো চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাফুফে এই ভেন্যু বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে। চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের উদ্যোগ এবং বাফুফে প্রতিনিধি দলের অবকাঠামো পরিদর্শনের পর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে।
একটি জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে মাঠের মান, ড্রেসিং রুম, নিরাপত্তা, মিডিয়া সুবিধা ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন জড়িয়ে থাকে। চাঁদপুরে নিয়মিত খেলা অনুষ্ঠিত হলে জেলার ক্রীড়া অবকাঠামো আরও আধুনিক হয়ে উঠবে।
জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ শুরু হলে স্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দর্শক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে; হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে তৈরি হবে গতিশীলতা। তবে এই সুবিধা ধরে রাখতে ফুটবল ও ক্রিকেটের জন্য পৃথক মৌসুমভিত্তিক মাঠ ব্যবহারের একটি সমন্বিত ক্যালেন্ডার করা জরুরি।
এ ব্যাপারে চাঁদপুরের ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমী ক’জনের অভিমত নিচে তুলে ধরা হলো—
জয়নাল আবেদীন জনু (সদস্য সচিব, চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা) : “চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের ইচ্ছা এবং ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহীনের প্রচেষ্টায় চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামে জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য তাঁদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়াম শুধু ফুটবল মাঠ নয়। ফুটবল মৌসুমে এখানে ফুটবল হবে, আবার ক্রিকেটের মৌসুমে ক্রিকেট খেলার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলে এখান থেকে ভালো ভালো খেলোয়াড় উঠে আসার সুযোগ তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
বড় ম্যাচ চালু হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্টেডিয়ামে এসে খেলা দেখার সংস্কৃতিও তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন খেলোয়াড় ও সংগঠক ম্যাচ শুরুর সময় নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনকে নতুনভাবে সাজানো এবং বিভিন্ন ইনডোর খেলা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আমরা জাতীয় ব্যাডমিন্টন লিগের খেলাও চাঁদপুরে আয়োজনের প্রত্যাশা করি। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে সব ধরনের খেলাকেই গুরুত্ব দিতে হবে।”
ইকবাল বিন বাশার (সাবেক সভাপতি, চাঁদপুর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মোহামেডান ক্লাব, চাঁদপুর) : “চাঁদপুর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করায় দীর্ঘসময় এখানকার খেলাধুলার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পৃক্ততা ছিলো। চাঁদপুরে এ ধরনের জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্ট আয়োজন হলে নতুন নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টি হবে। চাঁদপুরের সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তবে খেয়াল রাখতে হবে—এ ধরনের বড় আয়োজন যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। খেলাধুলার মাধ্যমে চাঁদপুরের সামগ্রিক সুনাম বৃদ্ধি করতে হবে। মাঠে জাতীয় পর্যায়ের খেলা হওয়াটা জেলার জন্য গর্বের বিষয়, কিন্তু এর সুফল দীর্ঘমেয়াদে পেতে হলে পরিকল্পিতভাবে খেলাধুলার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।”
দেওয়ান মো. সফিকুজ্জামান (সাবেক খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও রাজনীতিবিদ) : “চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামে জাতীয় পর্যায়ের খেলা অনুষ্ঠিত হবে—এটি সত্যিই আনন্দের বিষয়। ফুটবলের মৌসুমে ফুটবল এবং ক্রিকেটের মৌসুমে ক্রিকেট—এভাবে মৌসুমভিত্তিক মাঠ ব্যবহারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে, এতে কোনো খেলাকেই বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চাঁদপুর স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত আরও উন্নয়ন দরকার এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলা আয়োজনের মধ্য দিয়েই সেই সুযোগ তৈরি হবে। ফুটবলের জন্য মাঠ ব্যবহৃত হলেও ক্রিকেটারদের জন্যও সমান গুরুত্ব থাকতে হবে। চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে সব খেলাকেই সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া উচিত। আশা করছি খুব শিগগিরই ম্যাচগুলো শুরু হলে চাঁদপুরের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।”
অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশ (সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা যুবদল; প্রতিষ্ঠাতা, ক্লিন চাঁদপুর ক্লাব) : “চাঁদপুরের এই মাঠকে ঘিরে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্রিকেটের জন্য মাঠ ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা আছে। তবে বর্তমানে ফুটবলের মৌসুম হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের সুযোগকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি। মৌসুমভিত্তিক মাঠ ব্যবহারের মাধ্যমে ফুটবল ও ক্রিকেট—দুই খেলাকেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ হলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ফুটবলার তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে, পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতিও গুরুত্ব অব্যাহত রাখতে হবে। চাঁদপুরের ক্রিকেটারদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই; সব খেলাকে সমান গুরুত্ব দিয়েই আমাদের এগোতে হবে।”
চৌধুরী ইয়াসিন ইকরাম (ক্রীড়া সাংবাদিক ও আইনজীবী) : “চাঁদপুরে জাতীয় পর্যায়ের খেলা অনুষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়রা এখানে খেলতে এলে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। খেলোয়াড়দের আবাসন, বিশ্রাম, অনুশীলন, চিকিৎসা এবং স্টেডিয়ামকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নের প্রয়োজন হবে, যা নতুন অবকাঠামো তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে চাঁদপুরের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি নিয়মিত জাতীয় ক্রীড়া ভেন্যুর পরিচিতি তৈরি হওয়া। এই পরিচিতি ধরে রাখতে হলে কেবল এক মৌসুমের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
স্বাধীনতা কাপ, সুপার কাপ, ফেডারেশন কাপ ও বিএফএলের মতো বড় আসরের ম্যাচ আয়োজন চাঁদপুরের ফুটবলের জন্য একটি বড় মাইলফলক। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। আজ যে মাঠে জাতীয় পর্যায়ের তারকারা খেলবেন, কাল হয়তো সেই মাঠ থেকেই উঠে আসবে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী চাঁদপুরেরই কোনো তরুণ ফুটবলার। চাঁদপুর স্টেডিয়ামে বড় ম্যাচের বাঁশি বাজা কেবল একটি খেলার শুরু নয়—এটি চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন অধ্যায়ের শুভসূচনা।







