প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৫
বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম-সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী, সর্বশেষ রাসুল, বিশ্বমানবতার পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সা.) -এর প্রতি এবং তঁার পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি।
ভূমিকা: ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে শিরক, কুসংস্কার, গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায়, সুদ, মদ্যপান, জুয়া, নারী নির্যাতন ও নানা সামাজিক অনাচার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমন এক অন্ধকার সময়ে মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তঁার সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণ করেন।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেনÑ“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” Ñ সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭ অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু কোনো একটি জাতি, ভূখণ্ড বা যুগের জন্য নন; তঁার রিসালাত মানবজাতির জন্য এক মহান রহমত।
জন্ম ও শৈশব: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার সম্মানিত কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তঁার পিতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা আমিনা বিনতে ওহাব।
তঁার জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। তবে সহিহ হাদিসে প্রমাণিত যে তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। (৫৭০ খ্রিস্টাব্দ) শৈশবেই তিনি পিতা ও পরে মাকে হারান। এরপর তঁার দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং দাদার ইন্তেকালের পর চাচা আবু তালিব তঁার লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে লালিত-পালিত হন। তঁার জীবন শুরু থেকেই ছিল আল্লাহর বিশেষ হেফাজত ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
সততা ও বিশ্বস্ততার অনন্য দৃষ্টান্ত:
যৌবনে মহানবী (সা.) ছিলেন অসাধারণ সত্যবাদী, আমানতদার ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মক্কার মানুষ তঁাকে ‘আল-আমিন’Ñবিশ্বস্ত এবং ‘আস-সাদিক’Ñসত্যবাদী বলে জানতো। তঁার চরিত্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এসেছে স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকেÑ “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” Ñ সূরা আল-কলম: ৪
আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন সম্পর্কে আল্লাহ বলেনÑ“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” Ñ সূরা আল-আহযাব: ২১
হযরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ: ২৫ বছর বয়সে মহানবী (সা.) সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন। তঁাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন নবুওয়াতের প্রথম যুগের অন্যতম প্রধান সহায়ক এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) আর কোনো বিবাহ করেননি। পরবর্তীকালে তঁার অন্যান্য বিবাহগুলো বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক ও দাওয়াতি প্রজ্ঞার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।
নবুওয়াত ও প্রথম ওহি: চল্লিশ বছর বয়সে মহানবী (সা.) মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় মগ্ন থেকে সময় কাটাতেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায়, তঁার কাছে প্রথম ওহি আসার পূর্বে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহির সূচনা হয়েছিল। এরপর হেরাগুহায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে তঁাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি পেঁৗছে দেন। প্রথম ওহির সূচনা হয়Ñ“পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” Ñ সূরা আল-আলাক: ১
প্রথম পঁাচ আয়াতে জ্ঞান, সৃষ্টি ও আল্লাহর শিক্ষা সম্পর্কে মানবজাতিকে গভীর বার্তা দেওয়া হয়েছে। এরপর ওহি অব্যাহত থাকে এবং মহানবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য সর্বশেষ ওহি তথা আল-কুরআন মানুষের কাছে পেঁৗছে দিতে থাকেন। প্রথম ওহির ঘটনা সহিহ বুখারিতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামের দাওয়াত : প্রথমে তিনি নিকটজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা (রা.) ঈমান গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), কিশোরদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) প্রথমদিকের ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত।
প্রায় তিন বছর সীমিত পরিসরে দাওয়াত দেওয়ার পর মহানবী (সা.) প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। তিনি মানুষকে আহ্বান জানানÑএক আল্লাহর ইবাদত করো, শিরক বর্জন করো, সত্যবাদী হও, আমানত রক্ষা করো, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো এবং মানুষের অধিকার আদায় করো।
নির্যাতন, ধৈর্য ও তায়েফে গমন: ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। হযরত বিলাল (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), তঁার পিতা ইয়াসির (রা.) ও মাতা সুমাইয়া (রা.)সহ বহু সাহাবি কঠিন নির্যাতন সহ্য করেন।
হযরত সুমাইয়া (রা.) ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহিদ। চাচা আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মহানবী (সা.)-এর ওপর বিপদ আরও বেড়ে যায়। তিনি তায়েফে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে গমন করেন; কিন্তু সেখানেও তঁাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং পাথর নিক্ষেপ করে আহত করা হয়। তবুও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তঁার জীবন আমাদের শেখায়Ñবিপদের মধ্যেও ধৈর্য, দয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয়।
ইসরা ও মিরাজ: আল্লাহ তাআলা তঁার প্রিয় নবী (সা.)-কে এক বিশেষ মু‘জিযার মাধ্যমে সম্মানিত করেন। কুরআনে বলা হয়েছেÑ
“পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি তঁার বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন”Ñ সূরা আল-ইসরা: ১
ইসরা-মিরাজ ছিল মহানবী (সা.)-এর জীবনের এক অনন্য অলৌকিক ঘটনা। এ সফরের সঙ্গে সালাতের বিধানের সম্পর্ক রয়েছে; সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তাই ২৭ রজবকে মিরাজের নিশ্চিত তারিখ হিসেবে উল্লেখ না করে আমরা বলতে পারিÑমিরাজ নবুওয়াতের মক্কি জীবনের এক বিশেষ সম্মানিত ঘটনা।
হিজরত ও মদিনার জীবন : মক্কার কুরাইশরা মহানবী (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহর নির্দেশে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তঁারা সওর গুহায় কিছু সময় অবস্থান করেন। হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা।
মদিনায় পেঁৗছে মহানবী (সা.) প্রথমে মসজিদে কুবা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে মসজিদে নববী নির্মাণ করেন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মদিনায় এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ঈমান, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক অধিকার, শান্তি ও সামাজিক দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের ভিত্তি।
মক্কা বিজয় ও ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত: হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশপক্ষের মিত্ররা চুক্তি ভঙ্গ করলে মহানবী (সা.) মক্কার দিকে অগ্রসর হন। হিজরি অষ্টম সালে মুসলমানরা মক্কা বিজয় করেন। মহানবী (সা.) বিজয়ী হয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেও তঁার অন্তরে প্রতিহিংসা ছিল না। তিনি সাধারণ ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তিনি কাবাঘর থেকে মূর্তিগুলো অপসারণ করেন এবং আল্লাহর বাণী পাঠ করেনÑ“বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে।”Ñসূরা আল-ইসরা: ৮১। মক্কা বিজয় প্রমাণ করেÑসত্যিকারের বিজয় প্রতিশোধে নয়; ন্যায়, ক্ষমা ও আল্লাহর আনুগত্যে।
বিদায় হজ ও ঐতিহাসিক ভাষণ: হিজরি দশম বছরে মহানবী (সা.) বিদায় হজ পালন করেন এবং আরাফার ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা, নারীর অধিকার, আমানতদারি, সুদ বর্জন এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এই সময় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেনÑ“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম”Ñ সূরা আল-মায়িদাহ: ৩
ওফাত: বিদায় হজের পর মহানবী (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার সময়ও তিনি সালাত ও উম্মতের বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। অবশেষে হিজরি ১১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে, সোমবার, ৬৩ বছর বয়সে তিনি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তঁার ইন্তেকালে সাহাবায়ে কেরাম গভীরভাবে শোকাহত হন। কিন্তু তঁার রেখে যাওয়া কুরআন, সুন্নাহ ও মহান আদর্শ আজও মানবজাতির জন্য আলোর পথ।
মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা: মহানবী (সা.)-এর জীবনী শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি আমাদের জীবনের পথনির্দেশ।
আমরা তঁার জীবন থেকে শিখবো: সত্যবাদিতা ও আমানতদারি, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, নামাজ ও ইবাদতের গুরুত্ব, মাতা-পিতার প্রতি সম্মান, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার, মপ্রতিবেশীর হক, ক্ষমা ও সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা,
বিপদে ধৈর্য এবং সকল মানুষের প্রতি দয়া ও সদাচরণ। কারণ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেনÑ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” Ñ সূরা আল-আহযাব: ২১ সআর মহান আল্লাহ তঁার প্রিয় নবী (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেছেনÑ“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” Ñসূরা আল-কলম: ৪
উপসংহার : মহানবী (সা.)-কে সত্যিকারভাবে ভালোবাসার প্রমাণ হলো তঁার সুন্নাহ ও আদর্শকে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা। আসুন, আমরা তঁার শিক্ষা অনুসরণ করে সত্য, ন্যায়, শান্তি, মানবতা ও আল্লাহর আনুগত্যের সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলে মুহাম্মাদ।
হে আল্লাহ! আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দিন, তঁার প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তঁার শাফায়াত নসিব করুন। আমিন, ইয়া রাব্বুল আলামিন।
লেখক পরিচিতি : আলহাজ্ব মোঃ নুর ইসলাম খান অসি। সাবেক পরিচালক (অপারেশন), ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি কর্মসূচি (সিপিপি), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
রাসুল (সা.) এর আদর্শ অনুসরণই ইসলাম
মাওলানা মোশারফ হোসাইন
মহানবী (সা.) কেবল একজন নবী বা ধর্মপুরুষ ছিলেন না বরং তিনি একজন মহান নেতা ও সফল রাষ্ট্রনায়কও ছিলেন। তিনি একটি বৈরী পরিবেশকে পরাভূত একটি আদর্শ ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। নবুওয়াত লাভের পর থেকেই তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু করেন। মক্কার সংকটময় দিনগুলোতেও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। তঁার জীবনী এমন এক মহাসমুদ্র যে, লক্ষ লক্ষ লোকের আলোচনা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এর কোনো কূল-কিনারা পাওয়া যায়নি। তাই এই মহামানবের জীবনের শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে এবং তঁার জীবনের বিভিন্ন দিক ও ঘটনা সম্বন্ধে এত গবেষণা হওয়ার পরও যেন অনেকেরই নতুন কোনো কথা বলার থাকে।
মক্কায় তিন কর্মসূচি
আদর্শ রাষ্ট্রগঠনের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে মক্কায় মহানবী (সা.) তিনটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। তা হলো :
১. মানসিক গঠন : ইসলাম আগমনের পর নবীজি (সা.) মুসলমানদের মানসিক গঠনে মনযোগী হন। তিনি তা সম্পন্ন করেন ঈমানের দৃঢ়, ইবাদত তথা আল্লাহর আনুগত্য এবং রুহানিয়্যাত তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের দীক্ষা দানের মাধ্যমে। তিনি শিরকের বিপরীতে তাওহিদ, প্রবৃত্তির অনুসরণের বিপরীতে আল্লাহর আনুগত্য এবং পার্থিব মোহের বিপরীতে আল্লাহর নৈকট্যের শিক্ষা দেন। তাফসিরবিদরা বলেন, মক্কায় অবতীর্ণ সুরাগুলোতে পূর্ববর্তী জাতি-গোষ্ঠীর বর্ণনা তুলনামূলক বেশি এসেছে। বস্তুত এসব বর্ণনা মক্কায় চলমান অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখে মুসলমানদের মনোবল অটুট রাখতে সাহায্য করেছে এবং তাদেরকে সুন্দর ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী করেছে। কেননা এসব ঘটনায় জালিমদের পতন, মুমিনের বিজয় এবং মুমিনদের প্রতি অত্যাচারের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২. সামাজিক গঠন : মহানবী (সা.) মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের নিয়ে একটি সমাজ (কমিউনিটি অর্থে) গঠন করেন। তিনি মক্কার মুসলিমদের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করেন যে, একই সমাজে বসবাস করলেও মুসলমানরা স্বতন্ত্র সম্প্রদায়। তঁারা ঈমান ও ইসলামের সুতোয় বাধা। বিপরীতে যারা আল্লাহ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না তাদের সঙ্গে মুসলমানরা সম্পর্কহীন। মুসলমানরা পরস্পরের সহযোগী এবং আশ্রয়দাতা। তারা যথাসম্ভব সংঘবদ্ধ থাকবে, তারা পরস্পরকে দ্বিন পালনে সাহায্য করবে এবং মুশরিকদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করবে। গোপন অথচ পৃথক ও স্বতন্ত্র এই সামাজিক মূল্যবোধ জাতি হিসেবে মুসলমানদের আত্মপ্রকাশ সহজ করেছিল।
৩. অস্তিত্বের জানান দেওয়া : মহানবী (সা.) নবুওয়াতের তিন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে মক্কার ভেতরে দাওয়াত দিলেও ধীরে ধীরে দাওয়াতের পরিধি মক্কার বাইরে বিস্তৃত হতে থাকে। তিনি এই সময় হজ মৌসুমে মক্কায় আগমনকারী হাজিদের মাঝে, আরবের বিখ্যাত মেলাগুলোতে এবং তায়েফসহ মক্কার নিকটবর্তী গোত্রগুলোর কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে হাজির হন। এর ফলে মক্কার বাইরে যেমন ইসলামের আহ্বান পেঁৗছে যায়, তেমন স্থানীয় নেতৃত্ব ও শক্তিগুলো ইসলাম ও মুসলমানের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত হয়। যা পরবর্তীতে মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভে সহায়ক হয়েছিল।
মদিনায় ছয় কর্মসূচি :
ইসলামী রাষ্ট্রগঠন ও তার বিকাশে মহানবী (সা.) মদিনায় একাধিক কর্মসূচি হাতে নেন। এর ভেতর মৌলিক ছয়টি কর্মসূচি তুলে ধরা হলো।
১. মসজিদভিত্তিক সমাজ গঠন : রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করার পর সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদই ছিল মুসলমানদের সকল কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। ইবাদত-বন্দেগী, দ্বিনি শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ, সালিশ-বিচারসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মসজিদেই গ্রহণ করা হতো। মসজিদ মূলত মুসলিম সমাজকে একমুখী করেছিল, তাদেরকে একক নেতৃত্ব অধীনে একতাবদ্ধ করেছিল এবং তাদের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলেছিল।
২. ভ্রাতৃত্ব বন্ধন : হিজরতের পর মহানবী (সা.) মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের ভেতর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আগন্তুক মুহাজির সাহাবিদেরকে মদিনায় পুনর্বাসনের পথকে সহজ করেছিল এবং মুহাজির ও আনসারিদের মধ্যে মানসিক মেলবন্ধন তৈরিতে সাহায্য করেছিল। ফলে তারা পরস্পরের ভাই হয়ে দ্বিনি কাজে অংশগ্রহণ করেছিল।
৩. বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তি : মদিনায় হিজরতের পর মহানবী (সা.) স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়সহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এসব চুক্তির ফলে মদিনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে মুসলিমরা একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
৪. মদিনা সনদ : মদিনা সনদ মূলত বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সম্পাদিত চুক্তিগুলোর একটি সম্মিলিত রূপ। এসব লিখিত চুক্তি মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করায় তাকে মদিনা সনদ বলা হয়। মদিনা সনদ একই মদিনা রাষ্ট্রের মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিল।
মদিনা সনদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা হলো :
ক. বনু আওফের ইহুদিরা মুসলিমদের সঙ্গে মিলেমিশে এক উম্মতের মতো বসবাস করবে, কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।
খ. মুসলিম ও ইহুদি উভয় সম্প্রদায়ের লোক নিজ নিজ আয় উপার্জনের দায়িত্বশীল থাকবে।
গ. এ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের লোকেরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি, সদিচ্ছা ও পারস্পরিক উপকারের ভিত্তিতে কাজ করে যাবে, কোনো অন্যায়-অনাচার কিংবা পাপাচারের ভিত্তিতে কাজ করবে না।
ঘ. কেউ কারো ওপর জুলুম করলে মজলুমকে সাহায্য করা হবে।
ঙ. এ চুক্তিভুক্ত সকলের জন্যই মদিনায় কোনো প্রকার হাঙ্গামা সৃষ্টি করা কিংবা রক্তপাত ঘটানো যাবে না।
চ. চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলো কোনো নতুন সমস্যা কিংবা ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে আল্লাহ ও তঁার রাসুল (সা.)-এর মীমাংসা করবেন।
৫. বহির্বিশ্বে চিঠি পাঠানো : হুদাইবিয়ার চুক্তির পর মহানবী (সা.) প্রায় ১০ জন রাজা, বাদশাহ ও শাসকের কাছে ইসলামের আহ্বান জানিয়ে চিঠি লেখেন। তাদের মধ্যে ছিলেন, রোম সম্রাট কায়সার, পারস্য সম্রাট কিসরা, হাবশার বাদশাহ নাজ্জাসি, ইস্কান্দারিয়ার (মিসর) শাসক মুকাওকিস, ইয়ামামার শাসক সুমামা বিন উসাল, শামের শাসক হারিস বিন আবি শামার গাসসানি প্রমুখ। মাধ্যমে পৃথিবীর বেশির ভাগ অঞ্চলে ইষলামের দাওয়াত পেঁৗছে দেন। এর ফলে সভ্য পৃথিবীর সর্বত্র আল্লাহ, তঁার রাসুল ও ইসলামের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বময় ইসলামের আলোচনা শুরু হয়।
৬. সেনাবাহিনী গঠন : মহানবী (সা.) মদিনায় আগমনের পর একটি নিয়মিত ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন। তঁার বাহিনী প্রচলিত বেতনভুক্ত বাহিনীর মতো না হলেও তাদের ভেতর পেশাদারিত্বের কোনো অভাব ছিল না। নবীজি (সা.) তাদেরকে নিয়মিত অনুশীলন ও অভিযানের মাধ্যমে সুদক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। মক্কা বিজয়ের সময় নবীজি (সা.)-এর বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। মক্কা বিজয়ের পর তা সংখ্যায় আরো বৃদ্ধি পায়।
হযরত আয়েশা (রা)-এর একটি ছোট মন্তব্য নবী করীম (সা)-এর জীবনের বিশালতা সম্বন্ধে স্পষ্ট ইঙ্গিত দান করে। নবীচরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে নবীর জীবনসঙ্গিনী হিসেবে তিনি জওয়াব দিলেনÑ কুরআনই তঁার চরিত্র। প্রকৃত কথাও এই যে, কিতাব আকারে আমি কুরআন নামক যে গ্রন্থখানা পাঠ করি এ কিতাবী কুরআন মাত্র। আসল কুরআনই হলো নবীর জীবন। রাসূলপাকের জীবনে কুরআনের যে বাস্তব রূপ পাওয়া যায় তা থেকেই কুরআনের আসল পরিচয় মেলে। সুতরাং নবী জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন দৃষ্টি নিয়ে যদি কেউ কুরআন মজিদকে বুঝবার চেষ্টা করে তাহলে হয় কুরআন তার নিকট এক অর্থহীন গ্রন্থ বলে মনে হবে, আর না হয় পাঠক কুরআনের মনগড়া অর্থই করবে। নবীর জীবনে যারা কুরআনের বাস্তব অর্থ তালাশ করে না, কুরআন বুঝবার সব দুয়ারই তাদের নিকট রুদ্ধ। রাসূলের বাস্তব জীবনের সাহায্যে যেমন কুরআন বুঝতে হবে, তেমনি রাসূলের জীবনকেও কুরআনের আলোতেই দেখতে হবে।
রাসূলূল্লাহ (সা) এর বিশাল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্বন্ধে একটি মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে আমি এখানে আলোচনা করতে চাই। তঁার রাজনৈতিক জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। একটি আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য তঁার আন্দোলনে যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় সে বিষয়ে বহু যোগ্য লেখক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি বিভিন্ন মত ও পথের লোকদের নিয়ে যেরূপ শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে দিকটিও দুনিয়ার মানুষকে চিরদিনই অনুসরণের প্রেরণা দিতে থাকবে। এভাবে তঁার রাজনৈতিক জীবনের অনেক দিকই আলোচনার জন্য নিশ্চয়ই মূল্যবান বলে বিবেচিত হবে।
নবী করীম (সা.) কি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা মাত্র ছিলেন? না তঁার জীবনে রাজনীতিও ছিল, এখানে সে বিষয়েই আমি আলোচনা করব। রাজনীতিকে তিনি জীবনে কতটুকু স্থান দিয়েছিলেন, আল্লাহ পাক তঁাকে রাজনৈতিক কার্যকলাপের নির্দেশ দিয়েছিলেন কি না, সমসাময়িক রাজনীতিকদের সাথে তঁার সংঘর্ষ বাধার কী কারণই বা ছিল। আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্ব রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনে রাজনীতির স্থান সম্বন্ধে আলোচনা করা আজ নানা কারণে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ পরাধীনতার পরিণামে ধার্মিকদের মধ্যে আজ এমন লোক সৃষ্টি হয়েছেন, যারা দীনদার ও পরহেজগার বলে সমাজে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও ‘রাজনীতি’ করাকে নিন্দনীয় মনে করেন, অথবা অন্তত পক্ষে অপছন্দ করে। তঁারা দেশের রাজনীতি থেকে পরহেজ করাকে (নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখাকে) দীনদারি ও তাকওয়ার জন্য জরুরি মনে করেন।
ইসলামের সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকা অবস্থায় সে সব মুসলিম পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও জীবনদর্শনে দীক্ষা গ্রহণ করেছেন, প্রধানত তারাই আজ স্বাধীন মুসলিম দেশগুলোর পরিচালক। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে যে ক’টি ইসলামী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে এর প্রত্যেকটিই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শাসকগোষ্ঠীর গাত্রদাহ সৃষ্টি করেছে। এভাবে কতক ধার্মিক রাসূলের সংগ্রামী জীবনের দিকে লক্ষ্য না করে তঁাকে এমনভাবে চিত্রিত করেন যেন আল্লাহর নবী সংসারত্যাগী কোনো বৈরাগী ছিলেন (নাউজুবিল্লাহ)। এদিকে মুসলিম নামধারী শাসকেরাও রাসূলকে (সা) শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবেই স্বীকার (গ্রহণ নয়) করতে প্রস্তুত। মহানবীর সামগ্রিক জীবনকে একক ও সে পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে গ্রহণ না করার মনোভাবটি উদ্দেশ্যমূলক হলেও সরল মুসলমান এদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে থাকে।
রাজনীতির অর্থ কী?
রাজার নীতিকেই হয়তো একসময় রাজনীতি বলা হতো। আসলে রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিটিই রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি বলে পরিচিত। অবশ্য রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতি পরিভাষা হিসেবে বর্তমানে এক কথা নয়। রাষ্ট্র ও সরকারের যেরূপ পার্থক্য, রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতিতে তেমনি তফাত। অর্থাৎ রাষ্ট্রসংক্রান্ত বিষয়াদি হলো রাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত আর সরকার সম্বন্ধীয় কার্যকলাপকেই বলা হয় রাজনীতি।
রাজনৈতিক কার্যকলাপ
সরকারি ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে তাদেরকে সংশোধন করা, তাদের কার্যাবলির সমালোচনা করা, সরকারি নীতির ভ্রান্তি প্রকাশ করে জনগণকে সচেতন করা এবং এ জাতীয় যাবতীয় কাজকেই রাজনৈতিক কার্যাবলি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাই হলো সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কার্য। ভ্রান্ত নীতি ও আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে দেখে সরকারি কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত করে সঠিক শাসনব্যবস্থা চালু করতে চেষ্টা করাই প্রধান রাজনৈতিক কার্যকলাপ।
বিশ্বনবীর দায়িত্ব
এখন দেখা যাক, আল্লাহ পাক হযরত মুহাম্মদ (সা) কে যে বিরাট দায়িত্বসহ পাঠিয়েছিলেন তা পালন করতে গিয়ে তঁাকে রাজনৈতিক কাজ করতে হয়েছিল কি না। যদি তিনি নবী হিসেবে রাজনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়, তাহলে রাজনীতি করা ইসলামের তাগিদই মনে করতে হবে। নবী বলে ঘোষিত হওয়ার পর থেকে তঁার গোটা জীবনই যদি আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয় তাহলে তঁার রাজনৈতিক কাজগুলো অনুসরণের অযোগ্য হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? হযরতের ওপর কী দায়িত্ব অর্পিত হয়ছিল এবং তিনি কিভাবে তা পালন করেছিলেন তা আলোচনা করলেই বিশ্বনবীর জীবনে রাজনীতি কতোটা ছিল সে কথা স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাবে।
আল্লাহ পাক তঁার রাসূলকে কোন কর্তব্য দিয়ে পাঠিয়েছিলেন কুরআন মজিদের বহু স্থানে বিভিন্নভাবে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তা সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন আল্লাহ বলেন, “তিনিই এ সত্তা যিনি তঁার রাসূলকে হেদায়াত ও দীনে হকসহ পাঠিয়েছেন, যাতে আর সব দীনের ওপর একে (দীনে হককে) বিজয়ী করে তুলেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলার সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট।” (সূরা আল ফাতহ : ২৮)
এ আয়াতের শেষ অংশটুকু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তঁার রাসূলকে প্রধানত কোন কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন সে সম্পর্কে আল্লাহর চেয়ে বেশি কারও পক্ষে জানবার উপায় নেই। সুতরাং সে বিষয়ে অন্য কারও সাক্ষ্যই গ্রাহ্য নয়। আল্লাহর সাক্ষ্যই সেখানে যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনকে বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করে কোন একটি দিক বা বিভাগকে নিজেদের রুচিমত প্রধান দিক বলে সাব্যস্ত করতে গিয়ে অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হয়েছে। সাত অন্ধের হাতি দেখার মতো, কেউ তঁার বিশাল জীবনের এক অংশ থেকে শুধু হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন দিকটিকেই প্রধান বলে গ্রহণ করেছেন। কেউ তঁার নামাজ রোজা, তাসবিহ তেলাওয়াত ও তাহাজ্জুদের দিকটিকেই প্রধান বলে গ্রহণ করেছেন। কেউবা তঁাকে একজন আরব জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবেই দেখেছেন। আবার কেউ শুধু সর্বহারাদের নেতা হিসেবে চিত্রিত করে নিজ নিজ মত ও পথের সমর্থনে রাসূলকে দলিল হিসেবে পেশ করার চেষ্টা করেছেন। এ জাতীয় সবাই রাসূলের গোটা জীবনধারাকে এক সাথে বিবেচনা করে রাসূলের জীবনের মূল লক্ষ্যটুকুকে বুঝতে সক্ষম হননি। তারা অন্ধের মতো হাতিটি যেটুটু দেখতে পেয়েছেন সেটুকুই রাসূলের গোটা জীবন বলে ধারণা করেছেন। এদের অনেকেই হয়ত সাত অন্ধের ন্যায় আন্তরিকতার সাথে নিজ নিজ সিদ্ধান্তে পেঁৗছেছেন। কিন্তু আল্লাহ স্বয়ং রাসূলকে যে উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন তার সাথে এঁদের ধারণার কোনো মিল নেই।
হেরা গুহায় হযরত ধ্যানমগ্ন থাকা, নামাজ রোজায় মশগুল হওয়া, শেষ রাতে তাহাজ্জুদে নিমগ্ন হওয়া এবং সর্বহারাদের দুর্গতি দূর করার চেষ্টা চালানো এ সবই তঁার জীবনে লক্ষ্য করা যায় সত্য। এগুলো তঁার কর্মবহুল জীবনের বিভিন্ন ঘটনা হলেও এর কোনোটাই বিচ্ছিন্ন্ নয়। এ সবই হয়ত জীবনের মূল দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং তঁার মূল লক্ষ্যে পেঁৗছার উপযোগী। কিন্তু ঐ সব কাজের কোনোটাই রাসূূলকে পাঠাবার প্রধান উদ্দেশ্য নয়।
রাসূলের প্রধান দায়িত্ব
পূর্বোল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ পাক তঁার রাসূলকে পাঠাবার যে উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন সেটাই নবীজীবনের প্রধান দায়িত্ব। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূলকে একমাত্র দীনে হক দিয়ে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং মানবরচিত যাবতীয় দীনের ওপর আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করে দেয়ার উদ্দেশ্যে তঁাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এতে স্পষ্টই বোঝা গেল যে, রাসূলকে শুধু একজন প্রচারক অথবা ধর্মনেতার দায়িত্ব দেয়া হয়নি। দীন ইসলামরূপ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানটিকে একটি বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হযরতের প্রধান দায়িত্ব ছিল। দীন ইসলাম মানবসমাজে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা নবীজীবনের মূল লক্ষ্য ছিল। তিনি যখন যা করেছেন একমাত্র সে লক্ষ্য পেঁৗছার জন্যই করেছেন এবং সে চরম লক্ষ্য পেঁৗছবার উদ্দেশ্যে এই একটি বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনা করেছেন।
রাসূলের বিপ্লবী আন্দোলন
মানবসমাজের কোন না কোন ব্যবস্থা কায়েম থাকেই। সামাজিক রীতিনীতি, আইন, শাসন, বিচার, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় প্রথা ইত্যাদি সমাজে প্রচলিত থাকে। যে সমাজব্যবস্থা পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত থাকে তা যেমন আপনিই কায়েম থাকে না তেমনি তা আপনা আপনিই উৎখাত হয় না। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বই প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে কায়েম রাখে। যখনই কেউ এ ব্যবস্থাকে উৎখাত করার আওয়াজ তোলে তখনই সর্বশ্রেণীর নেতৃত্ব একজোট হয়ে এর বিরোধিতা করে। কারণ এসব নেতৃত্বের স্বার্থ প্রচলিত সমাজব্যবস্থায়ই কায়েম থাকা সম্ভব। এগুলোই সমাজের কায়েমি স্বার্থে। প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থাকে উৎখাত করার জন্য যখনই কোন প্রচেষ্টা চলে তখনই কায়েমি নেতৃত্বের সাথে সংঘর্ষ বাধে। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, আইন ও শাসন এবং অর্থনৈতিক কাঠামো মিলে যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকে তাকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে নতুন ধরনের নীতি ও আদর্শে সমাজকে গঠন করার আওয়াজ উঠবার সঙ্গে সঙ্গে কায়েমি নেতৃত্ব চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং এ আওয়াজকে বন্ধ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। সমাজে এ ধরনের ব্যাপক পরিবর্তন আনয়ন করাকে বিপ্লব বলে। সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ব্যতীত সরকারের উত্থান-পতন বা দলবিশেষের নাটকীয় ক্ষমতা দখলকে বিপ্লবী নাম দিলেও তাকে প্রকৃত বিপ্লব বলা চলে না। গোট সমাজের মৌলিক ও ব্যাপক পরিবর্তনকেই বিপ্লব বলে। এ ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য যে আন্দোলন প্রয়োজন তারই নাম বিপ্লবী আন্দোলন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরব ভূমিতে যে ব্যাপক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন তা হঠাৎ সংঘটিত হয়নি। আরবের প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে বদলিয়ে দেয়ার জন্য রাসূলকে কালেমায়ে তাইয়্যেবার ভিত্তিতে এক বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করতে হয়। দীর্ঘ ২৩ বছরে অবিরাম চেষ্টায় সে বিপ্লব সফল হয়। দুনিয়ার ইতিহাসে এরূপ কোন নজির পাওয়া যায় না যে, কায়েমি নেতৃত্ব কোনো বিপ্লবী আওয়াজ শুনে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়বার জন্য খুশি হয়ে নেতৃত্বের আসন ত্যাগ করে সরে দঁাড়িয়েছে। বরং সব সমাজে সব কালেই দেখা গেছে যে, কায়েমি নেতৃত্বের অধিকারীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা অঁাকড়িয়ে থাকারই চেষ্টা করেছে এবং বিপ্লবী আন্দোলন ক্রমে ক্রম শক্তি সঞ্চয় করে তাদেরকে উৎখাত করেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বেলায়ও এ ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলামী আদর্শে সমাজব্যবস্থাকে গড়ে তুলবার যে দায়িত্ব তঁার ওপর ন্যস্ত ছিল তা পালন করার প্রথম পদক্ষেপেই মক্কার নেতৃত্ব অস্থির হয়ে উঠলো। পয়লা লোভ দেখিয়ে তঁাকে এ পথ থেকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করলো। কালেমায়ে তাইয়্যেবার বিপ্লবী দাওয়াত থেকে। সমাজের কায়েমি স্বার্থের অধিকারীরা বুঝতে পারল যে, এ আওয়াজ তাদের বিরুদ্ধেই স্পষ্ট বিদ্রোহ। নেতৃত্বের লোভ, অর্থসম্পদ, নারী লালসা ইত্যাদির (যা তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য) বিনিময়ে তারা হযরতকে এ পথ থেকে ফিরাবার চেষ্টা করলো। হযরত সে প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি হলে তাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকেও মেনে নিতে বাধ্য হতেন। কিন্তু আদর্শভিত্তিক আন্দোলন যারা করেন তাদের পক্ষে এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হওয়া সম্ভবই নয়। তাই এ ধরনের আন্দোলনের সাথে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সংঘর্ষ অনিবার্য। দীর্ঘ ও কঠোর সংগ্রামের পর নবী করীম (সা.) বিজয়ী হন এবং ইসলামী আদর্শে সমাজব্যস্থাকে গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতি
অনৈসলামী সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানবসমাজকে পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নবী যে আন্দোলন পরিচালনা করেন তাই হলো আদর্শ ইসলামী আন্দোলন। এ ধরনের আন্দোলন রাজনৈতিক কার্যকলাপ ব্যতীত কী করে সম্ভব হতে পারে? সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আদর্শবাদী আন্দোলনের ইতিহাস যারা কিছুটা চর্চা করেন এবং মানবসমাজের সমস্যা নিয়ে যারা একটু চিন্তাভাবনা করেন তাদের পক্ষে এ কথা বোঝা অত্যন্ত সহজ। যারা স্থূল দৃষ্টিতে ইসলামকে দেখেন তারা এটাকে একটা ধর্ম মাত্র মনে করে রাজনীতিকে ইসলাম থেকে আলাদা করতে চান। তারা হয় আন্দোলনের অর্থই বুঝেন না, আর না হয় আন্দোলনের সংগ্রামী পথে চলার সাহস রাখেন না। ইসলামকে একটা জীবনবিধান হিসেবে বুঝে যারা রাজনীতি করা পছন্দ করে না, তারা নিশ্চয়ই পার্থিব কোন স্বার্থের খাতিরে অথবা কায়েমি নেতৃত্বের নির্যাতন থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য এরূপ নিষ্ক্রিয় পন্থা অবলম্বন করেন।
নবী করীম (সা.) যে আন্দোলন চালিয়েছিলেন তাতে প্রকৃত পক্ষে চরম রাজনৈতিক কার্যকলাপ অপরিহার্য ছিল। দেশের নেতৃত্ব যদি অনৈসলামিক লোকদের হাতে থাকে, তাহলে ইসলাম একটি বিজয়ী আদর্শ হিসেবে কিছুতেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ এতে পারে না। তাই ইসলামী আদর্শের বিজয় মানেই নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রচেষ্টাই চরম রাজনীতি। রাজনীতি করাকে যারা দীনদারির খেলাপ মনে করেন তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এ চরম রাজনীতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? যারা এ নীতি অবলম্বন করেন তারা কি নিজেদেরকে রাসূলের চেয়েও বিশেষ দীনদার বলে মনে করেন? তারা নিশ্চয়ই তা করেন না। প্রকৃতপক্ষে তারা রাজনীতি অর্থই বুঝেন না এবং দীনের দাবি সম্পর্কে পূর্ণ চেতনা রাখেন না।
রাসূলের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য
আজকাল রাজনীতি করাকে যে কারণে নেক লোকেরা ঘৃণা করেন তা অত্যন্ত স্পষ্ট। পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের অনুকরণে বিভিন্ন মুসলিম দেশে যে রাজনীতির প্রচলন হয়েছে তা কোন ভদ্রলোকের পক্ষেই পছন্দ করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে ক্ষমতা দখলের জঘন্য কোন্দলই এক শ্রেণীর লোকের নিকট রাজনীতি হয়ে দঁাড়িয়েছে। কেউ টাকার জোরে, কেউ ভোটের বলে, আর কেউ অস্ত্রের দাপটে ক্ষমতা দখল করতে সর্বপ্রকার অন্যায় পন্থা অবলম্বন করে রাজনীতি করে থাকেন। এসব লোক জঘন্য রাজনৈতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে গদি দখল করার পর তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার অধিকারটুকুও হরণ করে তাকে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে জাতিগঠনের প্রচেষ্টাকেও এরা রাজনৈতিক কার্যকলাপ বলে দমন করতে চান। শেষ নবীর ইসলামী আন্দোলনকে এ মনোভাব নিয়েই দমন করোর চেষ্টা চলেছিল। শুধু শেষ নবীই নয়, হযরত ইব্রাহিম (আ), হযরত মূসা (আ) ও অন্যান্য নবীর আন্দোলনের সাথেও একই ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা নবীদের আন্দোলনের পরিণতি যে নেতৃত্বের পরিবর্তন সে কথা ক্ষমতাসীনদের বুঝতে বাকি ছিল না।
কিন্তু নবীদের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তঁাদের চারিত্রিক ও নৈতিক শক্তি। বিপ্লবী আন্দোলন শুরু করার পূর্বে নবীদের নিষ্কলঙ্ক দীর্ঘজীবন যে নিঃস্বার্থপরতার পরিচয় বহন করে তা ইসলাম ব্যতীত আর কোন আদর্শবাদী আন্দোলনে সমপরিমাণে পাওয়া যায় না। সমাজে এ নৈতিক প্রতিষ্ঠাই তঁাদের আন্দোলনের প্রধান মূলধন। শেষ নবী রাজনীতিতে এ নিঃস্বার্থপরতা ও নৈতিকতার বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল ছিল। এ জন্যই তঁার বিরুদ্ধে কোন সস্তা শ্লোগান কার্যকরী হয়নি। তঁার নিঃস্বার্থ চরিত্রের প্রভাবকে শুধু রাজনৈতিক কার্যকলাপের দোহাই দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না।
হযরতের রাজনীতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, উপায় উপকরণের পবিত্রতা। তিনি কোন অন্যায় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী পন্থা অবলম্বন করে রাজনীতি করেননি। তঁার রাজনৈতিক দুশমনদের সাথে তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশও পোষণ করতেন না। কঠিন রাজনৈতিক শত্রুও যদি ইসলামের আদর্শ গ্রহণ করে তঁার নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজি হতো তাহলে তিন পূর্বের সব দোষ মাফ করে দিতেন। তঁার রাজনীতির তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো উদ্দেশ্যের পবিত্রতা। ইসলামের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই তঁার কাম্য ছিল। ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা যদি তঁার উদ্দেশ্য হতো তাহলে আন্দোলনের শুরুতেই তিনি মক্কার নেতৃত্বের প্রস্তাব মেনে নিয়ে বাদশাহ হতে পারতেন। চারিত্রিক পবিত্রতা, উপায় ও পন্থার পবিত্রতা এবং উদ্দেশ্যের পবিত্রতা এ তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রাসূলের রাজনীতিকে স্বার্থপর ও দুনিয়াদারদের রাজনীতি থেকে পৃথক মর্যাদা দান করেছে। যদি কেউ ইসলামী রাজনীতি করতে চায় তাহলে তাকে মহানবীর এ তিনটি রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যকে মূলধন হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। যাদের চরিত্র, কর্মপন্থা ও উদ্দেশ্য অপবিত্র বলে বোঝা যায়, তারাও যদি ইসলামের নামে রাজনীতি করে তা হলে ইসলামের উপকারের চাইতে অপকারই বেশি হয়। এদের রাজনীতির সাথে রাসূলের রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এদের রাজনীতি অন্যান্য স্বার্থবাদী রাজনীতির চেয়েও জঘন্য।
এ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে নবীজীবন কুরআনের মতই ব্যাপক ও বিশাল। কুরআন পাককে যেমন ব্যাখ্যা করে শেষ করার উপায় নেই, রাসূলের জীবনী আলোচনা করার ব্যাপারেও কারও পক্ষে চূড়ান্ত কথা বলার ক্ষমতা নেই। চিরদিনই মানুষ এ মহামানবের জীবনসমুদ্র থেকে প্রয়োজন পরিমাণ শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করবে। এমনকি তঁার এক একটি কথা ও ঘটনা থেকে অগণিত আলো বিচ্ছুরিত হবে। কোন দিনই মহাসাগরের অথৈ পানি নিঃশেষ হবে না।
আলোচ্য বিষয়
শেষ কথা
বিশ্বনবীর দায়িত্ব পালন করার জন্য রাজনৈতিক কার্যকলাপ যে অপরিহার্য ছিল তা ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রমাণিত। রাজনৈতিক চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত না পেঁৗছতে পারলে তিনি ইসলামকে বিজয়ী দীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষমই হতেন না। আজ যদি কেউ দীন ইসলামকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাহলে রাজনীতির পথে অগ্রসর হওয়া ছাড়া তার আর কোনো বিজ্ঞানসম্মত পন্থা নেই। কিন্তু স্বার্থপর, পদলোভী ও দুনিয়া পূজারীদের রাজনীতি ইসলামের জন্য কোনো দিক দিয়েই সাহায্যকারী নয়। ইসলামের নামে যারা এককালে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে নবীর নীতি ও কার্যক্রম অনুসরণ করেননি বলেই পাকিস্তানে ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। স্বার্থপর ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি যেমন ইসলামবিরোধী, নবী অবলম্বিত রাজনীতি থেকে পরাক্সমুখ হওয়াও তেমনি অনৈসলামী। বরং রাসূল যে ধরনের রাজনীতি করেছেন তা মুসলমানদের জন্য প্রধানতম ফরজ। এ ফরজটির নাম হচ্ছে জিহাদ। জিহাদ মানেই ইসলামী আন্দোলন এবং রাজনীতিই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। সুতরাং কতক লোক পরহেজগারির দোহাই দিয়ে রাজনীতি করা অপছন্দ করলেও রাসূলের খঁাটি অনুসারীদের পক্ষে তা পছন্দ না করে কোনো উপায়ই নেই।
লেখক পরিচিতি : [মুহাদ্দিস, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা, খতীব কালেক্টরেট জামে মসজিদ, চঁাদপুর, পিএইচডি গবেষক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।








