প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩
পাসপোর্ট জব্দের অভিযোগ সাব-কন্ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে
মিশরে ২২০ বাংলাদেশি শ্রমিকের টানা ৩ মাস বেতন বন্ধ

মিশরের বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত প্রায় ২২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। টানা তিন মাস ধরে তাদের বেতন বন্ধ থাকার পাশাপাশি অন্তত ১৬০ জনের বেশি শ্রমিকের পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে এক বাংলাদেশি সাব-কন্ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ (পাসপোর্ট নম্বর: A20851591) নামে ওই সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে তারা ‘শাইনলার ইজিপ্ট’ নামের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। দীর্ঘদিন বেতন না দেওয়া, অবৈধভাবে পাসপোর্ট আটকে রাখা, ওয়ার্ক পারমিট করে দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস এবং পাওনা চাইলে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পাওনা টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত চাইতে গেলে কয়েকজনকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটক করানোর ঘটনাও ঘটেছে।কারখানাটির অপারেটর শুভ নামের এক শ্রমিক জানান, আব্দুল্লাহর কন্ট্রাক্ট লাইনে সাত মাস কাজ করলেও শেষ তিন মাসের বেতন তিনি পাননি। শুভ বলেন, “বেতন ও পাসপোর্ট ফেরত চাইলে আব্দুল্লাহ গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখায়। পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেওয়ায় আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
তিনি আরও জানান, তাদের প্রায় ১৬০ জন শ্রমিকের পাসপোর্ট সাব-কন্ট্রাক্টর আব্দুল্লাহর কাছে রয়েছে। তিন মাস ধরে উপার্জন বন্ধ থাকায় তারা যেমন দেশে পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারছেন না, তেমনি মিশরে নিজেদের বাসস্থান ও খাবারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান, গত সপ্তাহে ২৫-৩০ জন শ্রমিক একসঙ্গে কারখানার অফিসে গিয়ে কোয়ালিটি ম্যানেজার মোহাম্মদ সালাহের সঙ্গে কথা বলেন। তখন কারখানার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অফিসে ৭৫টি পাসপোর্ট রয়েছে এবং তাদের নামে ভিসা প্রস্তুত। তবে সেই ভিসা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এছাড়া তিন মাসের বকেয়া বেতনের বিষয়ে সালাহ জানান, কারখানার পক্ষ থেকে সাব-কন্ট্রাক্টর আব্দুল্লাহকে সব পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই কারখানার কাছে শ্রমিকদের কোনো দাবি বকেয়া নেই।
কুমিল্লার বাসিন্দা আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয় বলে জানান রাদোয়ন উল্লাহ নামের আরেক শ্রমিক। তিনি বলেন, “আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের দিয়ে কাজ করিয়ে পরে ৫০ থেকে ১০০ জনের বেতন আটকে দেয়। আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। পরে দূতাবাসে অভিযোগ ও সাংবাদিকের মধ্যস্থতায় আমি ও আমার তিন বন্ধু পাসপোর্ট ফেরত পাই। শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলেই ঘরে আটকে রাখা, মারধর ও পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।”
সাহেব খান নামের অপর এক শ্রমিক বলেন, “আমরা ২২০ জন নাইট শিফটে কাজ করি। নতুন হওয়ায় এবং ভয়ভীতির কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছি না। বেতন ও পাসপোর্ট চাইলে আব্দুল্লাহ তার স্থানীয় মিশরীয় আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে মারধরের হুমকি দেন।”
দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা। আটকে থাকা পাসপোর্ট উদ্ধার, তিন মাসের বকেয়া বেতন আদায়, আটক কর্মীদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দূতাবাসের বক্তব্য অভিযোগের বিষয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, তারা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। অভিযুক্ত আব্দুল্লাহকে একাধিকবার তলব করা হলেও তিনি দূতাবাসে উপস্থিত হননি।তিনি বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় আব্দুল্লাহকে এনে পাসপোর্ট উদ্ধারসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কর্মীদের আবেদনগুলো মিশরের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অভিযুক্তের সাড়া পাওয়া যায়নিঅভিযোগের বিষয়ে সাব-কন্ট্রাক্টর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
প্রেক্ষাপট ও সার্বিক পরিস্থিতি উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের কারও কারও বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও স্থানীয় বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণে মিশরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নবায়ন হয়নি। ফলে বাংলাদেশিদের জন্য সরাসরি ওয়ার্ক পারমিট বর্তমানে সীমিত। তবে চাহিদা থাকায় অনেকে ভিজিট ভিসায় মিশরে এসে পরবর্তীতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশ দূতাবাসের ‘নোট ভারবাল’-এর মাধ্যমে আবেদন করে শর্তসাপেক্ষে ওয়ার্ক পারমিট বা বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে থাকেন।






