সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২০

বাবার শেষ কথা: অশ্রুর ভাষণে ফিরে আসা এক অমলিন স্মৃতি

​রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বাবার শেষ কথা: অশ্রুর ভাষণে ফিরে আসা এক অমলিন স্মৃতি
ছবি :সংগৃহীত

কিছু কথা সময়ের শোভাযাত্রায় হারিয়ে যায়, কিছু কথা বাতাসে মিলিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কথা থাকে, যা একবার কানে প্রবেশ করলে হৃদয়ের গহীনে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়—যার রঙ কোনোদিন ধূসর হয় না। প্রিয়জনের শেষ বাণী তেমনই; মৃত্যুর কঠিন সীমানা পেরিয়েও যা সন্তানের সমগ্র জীবনকে নীরবে পরিচালনা করে।

ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক যখন চশমাটি খুলে চোখ মুছছিলেন, তখন স্টুডিওর তীব্র আলোয় এক পরাক্রান্ত রাজনীতিকের অবয়ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। চাঁদপুর-৩ আসনের এই জনপ্রতিনিধি রাজনীতির দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছেন, অর্জন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কিন্তু বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই রাজনীতিকের শক্ত আবরণটি খসে পড়ে; সামনে উঠে আসেন এক ব্যাকুল সন্তান—যার কানে আজও প্রতিধ্বনিত হয় পিতার শেষ আদেশ।

১৯৯২ সালের কথা। প্রস্থানলগ্নে পিতা তাঁর সন্তানকে বলে গিয়েছিলেন—

‘যাও, তোমার ভাইবোনদের দেখে রেখো।’

মাত্র কয়েকটি শব্দ! আপাতদৃষ্টে একটি অতি সাধারণ পারিবারিক নির্দেশনা। অথচ এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের জঠরে লুকিয়ে ছিল স্নেহ, বিশ্বাস আর এক সুবিশাল গুরুদায়িত্বের মহীরূহ। সময়ের পরিক্রমায় সেই অন্তিম বাক্যই হয়ে উঠেছে স্মৃতি, দায়িত্ববোধ আর গভীর অনুশোচনার এক অবিনাশী দলিল।

পিতা চেয়েছিলেন সন্তান সুশিক্ষিত হোক, শিক্ষক কিংবা চাকুরিজীবী হয়ে সাধারণ ও সৎ জীবনযাপন করুক। কিন্তু চাঁদপুরের হাটেরনল স্কুলের সেই বালকটির ভাগ্যে লেখা ছিল রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গ। কারাবরণ, দীর্ঘ আত্মগোপন, মামলা ও জীবনসংগ্রামের নানা ঘাট পেরিয়ে তিনি আজ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি। কিন্তু একজন পিতার স্বপ্নের পরিমাপক দিয়ে কি এই জাগতিক অর্জনকে মাপা সম্ভব?

ক্যাপশন : ভিডিও সংগৃহীত

সাক্ষাৎকারে যখন প্রশ্ন করা হলো—‘বাবা যে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, আপনি কি তা হতে পেরেছেন?’ তিনি দীর্ঘ যুক্তি সাজাননি; কেবল চোখের কোণে জল জমিয়ে বলেছিলেন, ‘দেখতে পারেন।’

এই অশ্রুবিন্দুর কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হয় না। এটি কোনো নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা নয়; এটি এক সন্তানের হৃদয় নিংড়ানো আকুতি। মানুষের জীবনে এমন কিছু পরম সত্য মুহূর্ত আসে, যেখানে বাচালতা স্তব্ধ হয়ে যায়, আর চোখের জলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বলিষ্ঠ উত্তর।

স্মৃতি হারায়, অন্তিম বাক্য হারায় না

১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াই, পুলিশের তাড়া, দরজার আড়ালে আতঙ্কে কাটানো রাত, আর জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ—মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিকে ক্ষয় করার জন্য যথেষ্ট। শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, শৈশবের অনেক আনন্দময় দৃশ্য আজ আর তাঁর মনে পড়ে না। ভয় আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা মানুষের শৈশবের বহু রঙ মুছে দেয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে পিতার শেষ বাক্যটি তাঁর হৃদয়পটে বিন্দুমাত্র আবছা হয়নি। বরং দিন যত গড়িয়েছে, ‘তোমার ভাইবোনদের দেখে রেখো’—বাক্যটি ততই আলোকোজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে।

এটি শুধু পারিবারিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান ছিল না; এর ভেতরে নিহিত ছিল পিতার অগাধ আস্থা। জীবনের প্রতিটি কঠিন মোড়ে এই বাক্যটিই হয়তো তাঁকে অদৃশ্য এক নৈতিক শক্তি হিসেবে পথ দেখিয়েছে।

শাসনের আড়ালে পরম স্নেহচ্ছায়া

শৈশবের স্মৃতি রোন্থন করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন পিতা-মাতার কঠোর শাসনের কথা। স্কুল থেকে সোজা বাড়ি; আড্ডা বা অলস ঘোরাঘুরির সুযোগ ছিল না। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিকে কঠোরতা মনে হতে পারে, কিন্তু সেই আমলের পারিবারিক অনুশাসনে এর পেছনে ছিল সন্তানের সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের অপরিসীম উদ্বেগ। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ তিনি তরুণদের বার্তা দেন। শিক্ষা সমাপ্ত না করে অলস ঘুরে বেড়ানো ছেলেদের দেখলেই বলেন—

‘বাসায় যাও, মা-বাবার কোল আঁকড়ে থাকো।’

যে পিতা তাঁকে ঘরের বাইরে যেতে দিতেন না, সেই পিতার অনুশাসন আজ তাঁর জীবন দর্শনে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক লড়াই তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে, হয়তো কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু; কিন্তু শৈশবের সেই নিরাপদ গৃহকোণ আর বাবা-মায়ের স্নেহের অনুশাসন হারিয়ে যায়নি।

সংগ্রাম, কারাগার ও আত্ম উপলব্ধি

১৯৭৮ সালে বন্যাপীড়িত চাঁদপুরে জিয়াউর রহমানের আগমন কিশোর মানিকের মনে রাজনৈতিক চেতনার স্ফুরণ ঘটিয়েছিল। এরপর শুরু হয় রাজনীতির ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ পথচলা। চাঁদপুর জেলা কারাগারে ৬০০ জনের জায়গায় ৮০০ বন্দির গাদাগাদি জীবনের বাস্তবতায় তিনি স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য ও স্বজন হারানোর বেদনা চিনেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাঁর আস্থা তাঁর লড়াইয়ের পথকে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু রাজনীতির এই উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে দিনশেষে তাঁর আত্মিক আশ্রয় সেই একটি জায়গাতেই—পিতার স্মৃতিতে।

জীবনের দীর্ঘ হিসাব-নিকাশের শেষে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল বা আফসোস কী হতে পারে? কোনো রাজনৈতিক পরাজয়? না। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তি—ব্যক্তিগত জীবনে মাঝে মাঝে সালাত আদায়ে অবহেলা হওয়া। আর ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে আকুল আকুতি—পিতার চরণে।

পিতা বেঁচে থাকলে হয়তো সামনে বসে বলা যেত—‘আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ কিন্তু নিয়তি সেই সুযোগ দেয় না। তখন ক্ষমা চাওয়ার ভাষা হয়ে ওঠে দোয়ার মুনাজাত, আর চোখের পানি হয়ে ওঠে পরম স্বীকারোক্তি।

জীবিত অবস্থায় পিতা-মাতাকে উপলব্ধি করার আহ্বান

মানবজীবনের এক নির্মম ট্র্যাজেডি হলো—বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও উদ্বেগের গভীরতা আমরা তখন অনুধাবন করি, যখন তাঁরা আর এই ধূলির ধরায় থাকেন না। পিতার অনুশাসনকে আমরা একসময় স্বাধীনতা হরণ মনে করি, তাঁর উপদেশকে বিরক্তিকর মনে করি। অথচ পিতা যখন চলে যান, তখন বোঝা যায়—সেই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার এক নিঃস্বার্থ মহাকাব্য।

রাজনীতিবিদদের আমরা দলীয় চশমা দিয়ে মাপি। কিন্তু তাঁদের ভেতরের মানুষটি, সন্তানটি বহু সময় অলক্ষ্যেই থেকে যায়। চশমা খুলে চোখ মোছা শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের অবয়বে কোনো ক্ষমতার অহংকার ছিল না; ছিল কেবল পিতৃহারা সন্তানের চিরন্তন হাহাকার।

যাঁদের বাবা-মা এখনও বেঁচে আছেন, এই সাক্ষাৎকার তাঁদের জন্য এক আকুল আহ্বান—সময় থাকতে মা-বাবার পাশে বসুন, তাঁদের হাতে হাত রেখে কুশল জানুন। মৃত্যুর পর সুদৃশ্য পুষ্পস্তবক কিংবা বড় আয়োজনের চেয়ে জীবিত অবস্থায় একটু অমায়িক হাসিমুখ বা এক ফোঁটা যত্ন হাজার গুণ বেশি মূল্যবান।

অন্তিম বাক্য কখনো শেষ হয় না

মৃত্যু মানুষের দেহকে স্তব্ধ করে, হাঁটার শব্দ থামিয়ে দেয়, ঘরের কোণের প্রিয় চেয়ারটিকে শূন্য করে দেয়। কিন্তু পিতার মুখনিঃসৃত নৈতিক সত্য কখনো মরে না।

‘যাও, তোমার ভাইবোনদের দেখে রেখো’—এই বাক্যটি কোনো সাময়িক নির্দেশ ছিল না; এটি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের সমগ্র জীবনের এক অলিখিত নৈতিক কম্পাস।

সংসদ সদস্যের পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক পদ পরিবর্তনশীল; ক্ষমতার আলোও একদিন নিভে যাবে। কিন্তু একজন সন্তানের কাছে পিতার শেষ কথাটি ধমনীর রক্তের মধ্যেই চিরপ্রবাহমান থাকবে। পিতার শেষ কথা আসলে কখনো শেষ হয় না—মানুষ চলে যায়, শব্দ নীরব হয়, কিন্তু পৈতৃক স্নেহ আর ভালোবাসা বেঁচে থাকে অশ্রুর অবিনাশী ভাষায়।

রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক

রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর ও কলামিস্ট

দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়