প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৯
বিধবা নাছরুমের পাশে কারো না কারো দাঁড়ানো উচিত

স্বামীর মৃত্যুর পর একজন নারীর জীবনে নেমে আসা শোককে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আর সেই শোকের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় ঋণের বোঝা, নিরাপত্তাহীনতা, স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আপনজনদের বিরূপ আচরণ-তখন জীবন যেন একসঙ্গে সব দরজা বন্ধ করে দেয়। ফরিদগঞ্জের গুপ্টি পশ্চিম ইউনিয়নের হোগলী গ্রামের নাছরুম আক্তারের গল্পটি তাই শুধু একজন বিধবার ব্যক্তিগত দুর্দশার গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজ, মানবিকতা ও ন্যায়বোধের জন্যেও এক গভীর প্রশ্ন।
নাছরুমের অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামী সাইফুল ইসলাম মাসুম প্রবাসে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়লে তাকে সহায়তা করতে তিনি শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সমিতি থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। নিজের ও বোনের স্বর্ণালংকারও বিক্রি ও বন্ধক রেখে স্বামীকে অর্থ দিয়েছেন। অর্থাৎ স্বামীর দুর্দিনে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নিজের সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত। কিন্তু সেই স্বামী যখন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন, তখনই নাছরুমের জীবনে শুরু হলো আরেক দুর্যোগ। আজ তিনি একদিকে ঋণের দায়ে বিপর্যস্ত, অন্যদিকে স্বামীর ওয়ারিশ হিসেবে নিজের অধিকার নিয়েও লড়ছেন। তার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বাড়ি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন এবং তার বিয়ের কাবিননামা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। এমনকি কাবিননামা পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু অভিযোগগুলো এতোটাই গুরুতর যে, এগুলোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্নটি হলো-স্বামী জীবিত থাকাবস্থায় যে নারী একটি পরিবারের সদস্য ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর হঠাৎ তিনি কীভাবে সেই পরিবারের কাছে পর হয়ে গেলেন? মৃত্যু কি একজন স্ত্রীর বৈবাহিক পরিচয় মুছে দেয়? স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে কি তার ভালোবাসা, ত্যাগ, সংসারজীবন এবং আইনগত অধিকারও মৃত্যুবরণ করে?-অবশ্যই নয়। একজন বিধবা নারী করুণা চান না; তিনি তার ন্যায্য অধিকার চান। তিনি কারো দয়া নিয়ে বাঁচতে চান না; তিনি চান আইন ও ন্যায়বিচার তার পাশে দাঁড়াক। নাছরুমের ক্ষেত্রেও সেটিই হওয়া উচিত।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর বক্তব্যে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে নাছরুমের ওয়ারিশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ঋণের বিষয়টি সমাধানের কথা বলা হয়েছিলো। যদি সত্যিই এমন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে তা বাস্তবায়িত হলো না কেন এই প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে-বিয়ের কাবিননামা। একটি নারীর বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আইনগত দলিল নিয়ে যদি কারও পক্ষ থেকে পরিবর্তন বা কারসাজির চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট কাজী, নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা জরুরি। সত্য যা-ই হোক, সত্যকে যেন কোনো প্রভাব, চাপ বা কৌশলের আড়ালে চাপা দেওয়া না যায়।
আমরা বিশ্বাস করি, নাছরুমের মামলার নিষ্পত্তি আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তার নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একজন অসহায় নারী আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন-এটিকে তার দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং আইনের প্রতি তার আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত। সমাজের কাছেও নাছরুমের ঘটনা একটি আয়না। স্বামী হারানো একজন নারীকে আমরা কীভাবে দেখি? তাকে কি উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা একজন ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখি, নাকি একজন মানুষ হিসেবে দেখি-যিনি স্বামীর জীবনের দুর্দিনে নিজের সম্পদ, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে পাশে ছিলেন?
যে নারী স্বামীর ঋণ শোধে নিজের গয়না পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তার নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে সমাজ কি তার পাশে দাঁড়াতে পারে না?-পারে। অবশ্যই পারে। তবে সেই পাশে দাঁড়ানো হতে হবে পক্ষপাতহীন। কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, কারও প্রতি অন্ধ সমর্থনও নয়। সত্য উদঘাটন, আইন মেনে অধিকার নিশ্চিত করা এবং একজন বিধবার মর্যাদা রক্ষা করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
নাছরুম আজ একা আদালতে লড়ছেন। কিন্তু তার এই লড়াই যেন শেষ পর্যন্ত শুধু তার একার লড়াই না হয়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনগত সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক বিবেকসম্পন্ন মানুষ-কেউ না কেউ তার পাশে দাঁড়াক। তার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হোক, বৈধ কাগজপত্র যাচাই হোক এবং প্রকৃত ওয়ারিশের অধিকার নিশ্চিত হোক। কারণ একজন নারীর স্বামী মারা যেতে পারেন, কিন্তু তার অধিকার মারা যায় না। একটি সংসার ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। নাছরুমের পাশে তাই কারো না কারো দাঁড়ানো উচিত-দয়া নিয়ে নয়, ন্যায় নিয়ে; আবেগ দিয়ে নয়, সত্য ও আইনের পক্ষে।







