প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৫
মেঘনা এক্সপ্রেসে যান্ত্রিক ত্রুটি।। যাত্রী ভোগান্তি চরমে
চার ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লাগছে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা

চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী একমাত্র আন্তঃনগর ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস (৭২৯ আপ/৭৩০ ডাউন)। ১৯৮৬ সাল থেকে এ রুটের যাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনটি চলাচল করলেও সম্প্রতি ঘন ঘন ইঞ্জিন বিকল ও বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছানো এখন অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
|আরো খবর
চাঁদপুর থেকে ভোর ৫টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় মেঘনা এক্সপ্রেস। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে বিকেল ৫টায় চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ট্রেনটি ছেড়ে আসে। প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে স্বাভাবিকভাবে যাত্রা সম্পন্ন করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় নির্ধারিত থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অনেক সময় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ।
যাত্রীদের ভাষ্য, ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়া, ইঞ্জিন পরিবর্তন এবং উদ্ধারকারী ইঞ্জিনের জন্য অপেক্ষা করাসহ নানা কারণে মাঝপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকছে। এতে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বিভিন্ন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী ও বিভিন্ন সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এক সপ্তাহে একাধিকবার ইঞ্জিন বিকলের অভিযোগ
যাত্রীদের। গত এক সপ্তাহে মেঘনা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়বার দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরে মেঘনা এক্সপ্রেস রাত ১০টার দিকে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সেটি রাত প্রায় ৩টার দিকে চাঁদপুর পৌঁছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই ভোর ৫টার দিকে আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। আরেকদিন বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেও মেঘনা এক্সপ্রেস সীতাকুণ্ড এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। পরে একটি ইঞ্জিন এনে ট্রেনটিকে সীতাকুণ্ড স্টেশন পর্যন্ত নেয়া হয়। এরপর চট্টগ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন না থাকায় লাকসাম থেকে উদ্ধারকারী ইঞ্জিন আনার ব্যবস্থা করা হয়। পরে চট্টগ্রাম থেকে সাগরিকা ট্রেনের ইঞ্জিনও সেখানে আসে বলে জানান ওই যাত্রী।
ওই যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেঘনা এক্সপ্রেস সীতাকুণ্ডে দাঁড়িয়েছিলো। অথচ এই সময়ে ট্রেনটির চাঁদপুরে পৌঁছে যাওয়ার কথা। একটি ট্রেনের ইঞ্জিন প্রতিদিন নষ্ট হবে, যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে, এটা কোনোভাবেই একটা আন্তঃনগর ট্রেনের সার্ভিস হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে মানুষ এখন রেল যোগাযোগের ওপর বেশি নির্ভর করছে। কিন্তু আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনের এমন সেবা হলে যাত্রীরা যাবে কোথায়? মানুষের সময়েরও মূল্য আছে। এভাবে সেবা দেয়ার চেয়ে ট্রেন বন্ধ করে দেয়াই ভালো।
ব্যবসায়ীদেরও পড়তে হচ্ছে ক্ষতির মুখে :
মেঘনা এক্সপ্রেসের সময়সূচি বিপর্যয়ের প্রভাব পড়ছে চাঁদপুরের মাছ ব্যবসায়ও। চাঁদপুর মাছঘাটের ব্যবসায়ীদের অনেকেই দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রেলপথের ওপর নির্ভর করেন।
মাছঘাটের এক ব্যবসায়ী বলেন, চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামে মাছ পাঠানোর ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেনে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হলে মাছের সঙ্গে দেয়া বরফ গলে পানি হয়ে যায়। এতে মাছের মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, মাছের ব্যবসা এমনিতেই নানা সমস্যার মধ্যে চলছে। তার মধ্যে সময়মতো মাছ পাঠাতে না পারলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি আরও বাড়ে। চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে মেঘনা এক্সপ্রেস গুরুত্বপূর্ণ। তাই ট্রেনটির যান্ত্রিক সমস্যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিয়মিত এ ধরনের বিলম্ব চলতে থাকলে চাঁদপুরের মাছ ব্যবসার সঙ্গে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলার বাণিজ্যিক যোগাযোগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিলম্বে বাড়ছে মৃত্যু ও নিরাপত্তা ঝুঁকি :
শুধু যাত্রী ভোগান্তি কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতিই নয়, ট্রেনের নির্ধারিত সময়ের বড় ধরনের পরিবর্তন রেললাইনের আশপাশে বসবাসরত মানুষের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা।
রেলস্টেশনের কয়েকজন যাত্রী ও রেললাইনের পাশের স্থানীয়রা জানান, নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল করলে রেললাইনের পাশে থাকা মানুষজন এবং রেললাইন পারাপারকারীরা ট্রেন আসার বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকেন। সব জায়গায় তো আর লাইনম্যান বা গেটে লোক থাকে না, আর এটা সম্ভবও না, বড় বড় সড়কে সীমাবদ্ধ। একটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চার-পাঁচ ঘণ্টা পর চলাচল করলে অনেকের মধ্যে সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী সতর্কতা থাকে না।
স্থানীয়রা বলেন, রেললাইনের পাশে বিভিন্ন দোকানপাট ও বসতবাড়ি রয়েছে। অনেক মানুষ নিয়মিত রেললাইন পারাপারও করেন। নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে ট্রেনের চলাচলের সময়ের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হলে অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেকেই রেললাইনের পাশে গরু ছাগল বাঁধে, এটা ঠিক না। কিন্তু পরিস্থিতি শিকার হয়ে করে তাদেরও মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।
যাত্রীদের সময়ের মূল্য যেমন রয়েছে, তেমনি রেললাইনের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মেঘনা এক্সপ্রেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রেলসেবা। শুধু চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম নয়, ফেনী ও কুমিল্লাসহ এ রুটের বিভিন্ন এলাকার মানুষও এই ট্রেনের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। এছাড়া মেঘনা নদীর ওপারে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং শরীয়তপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষও চাঁদপুর হয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ট্রেনের ওপর নির্ভর করেন।
দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই রেলসেবায় নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটি ও সময়সূচি বিপর্যয়ের অভিযোগ ওঠায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, সাময়িকভাবে ইঞ্জিন পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান না করে মেঘনা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়ে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
চাঁদপুরের মানুষের ও যাত্রীদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ রেলওয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মেঘনা এক্সপ্রেসের নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ খুঁজে বের করবে এবং সময়সূচি অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য রেলসেবা নিশ্চিত করবে।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








