সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০২:২১

আইসিইউতে চাঁদপুর-চট্টগ্রামের লাইফলাইন: ‘মেঘনা’র কান্না থামবে কবে?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
আইসিইউতে চাঁদপুর-চট্টগ্রামের লাইফলাইন: ‘মেঘনা’র কান্না থামবে কবে?
ছবি : প্রতীকী

যোগাযোগের ব্যাকবোন বা মেরুদণ্ড বলা হয় রেলপথকে—যা গণমানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তিনিরাপদ যাতায়াতর অবিসংবাদিত প্রতীক। কিন্তু চাঁদপুরবাসীর ললাটে এই ‘নিরাপত্তা’ ও ‘স্বস্তি’ শব্দ দুটি আজ চরম এক উপহাসে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৭ সালে যখন চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে ‘আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস’ তার প্রথম যাত্রা শুরু করে, তখন তা স্রেফ একটি যান্ত্রিক যান ছিল না; ছিল এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি ও কোটি মানুষের আবেগ-যোগাযোগের এক মহিমান্বিত লাইফলাইন। ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয়, যাত্রী সমাগম আর রাজস্ব আয়ের দিক থেকে একসময় দেশের সমস্ত আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে দ্বিতীয় শীর্ষ গৌরবময় অবস্থানে ছিল এই মেঘনা এক্সপ্রেস। দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা রাজস্ব এনে দেওয়া এই ‘লক্ষ্মী’ ট্রেনটি চার দশক পর আজ এক জরাজীর্ণ কঙ্কাল, এক অন্তহীন নরকযাতনার জীবন্ত প্রতীক!

সম্প্রতি দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত দুটি অনুসন্ধানী ও সরেজমিন প্রতিবেদন আমাদের বিবেককে তীব্রভাবে তাড়িত করেছে। “আন্তঃনগর মেঘনায় চরম ভোগান্তি : ইঞ্জিন বিকল, বিলম্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় অতিষ্ঠ চাঁদপুরের যাত্রীরা” শীর্ষক প্রথম প্রতিবেদনটির প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছে সাধারণ যাত্রীদের প্রাত্যহিক দীর্ঘশ্বাস, অন্তহীন বিলম্ব আর নিরাপত্তাহীনতার অবর্ণনীয় চিত্র। অন্যদিকে, “নামেই আন্তঃনগর ট্রেন! সমস্যার পাহাড়ে বিপর্যয়ের মুখে ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’” শীর্ষক দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি যেন এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ; যেখানে উন্মোচিত হয়েছে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ চরম উদাসীনতা, তীব্র ইঞ্জিন সংকট এবং একটি অতি লাভজনক রুটকে তিলে তিলে রাষ্ট্রীয় অবহেলায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার নেপথ্য চালচিত্র।

রেলওয়ের বর্তমান সময়সূচি বলছে, ভোর ৫টায় চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে এবং বিকেল ৫টায় ফিরতি অভিমুখে ৪-৫ ঘণ্টার একটি স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ উপহার দেওয়ার কথা মেঘনার। কিন্তু নিয়তি এখন ভিন্ন ও নিষ্ঠুর। ইঞ্জিন বিকল হওয়াটা এখন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এই ট্রেনের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, গত ২০ জুন ট্রেনটিতে যাতায়াত করা এক ব্যাংক কর্মকর্তা ক্ষোভের সাথে জানান, ফেরার পথে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা!

দ্বিতীয় প্রতিবেদনের বিবরণী আরও হাহাকারময়। তীব্র দাবদাহের মধ্যে ভাঙা দরজা-জানালা, পুরানো অচল সিলিং ফ্যান আর ওয়াশ রুমের অবর্ণনীয় নোংরা-দুর্গন্ধময় পরিবেশের ভেতরে শত শত নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীকে যে নারকীয় কষ্টর মুখোমুখি হতে হচ্ছে—তা কোনো সভ্য দেশে ভাবা যায় না? ওই ট্রেনের নিয়মিত হকার সাগর হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, সপ্তাহে অন্তত ৪ থেকে ৫ দিনই ঘটছে এই ইঞ্জিন বিকলর ঘটনা। অতি সম্প্রতি শুক্র ও শনিবারের ঘটনাই এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ; পথিমধ্যে ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় বিকল্প ইঞ্জিন এনে রাত সাড়ে ৯টার ট্রেন যখন গভীর রাত দেড়টায় চাঁদপুরে এসে পৌঁছায়, তখন যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তা ভাবার অবকাশ কি রেল প্রশাসনের আছে?

ভোগান্তির পরিধি এখানেই শেষ নয়; মেঘনা এক্সপ্রেস এখন এক মূর্ত আতঙ্কের নাম। প্রথম প্রতিবেদনের গুরুতর অভিযোগ—চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক, যা ইতিপূর্বেই এক হতভাগ্য যাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রেনের ভেতরে ও জানালায় ওত পেতে থাকা দুর্ধর্ষ চুরি-ছিনতাইর মহোৎসব। জানালার পাশে বসা যাত্রীটি এখন প্রকৃতির দৃশ্য দেখে না, বরং কখন একখণ্ড ইট এসে মাথাটা থেঁতলে দেবে কিংবা মোবাইল-ব্যাগটি ছিনতাই হয়ে যাবে—সেই দ্বিমুখী মরণ-আতঙ্ক বুকে নিয়ে তাকে পথ চলতে হয়। নামেই এটি ‘আন্তঃনগর’, অথচ এর ভেতর-বাহির আজ জর্জরিত সমস্যার হিমালয়ে।

এই অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত যাত্রীদের। বরিশাল, ভোলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজারো মানুষ চাঁদপুর হয়ে এই মেঘনা এক্সপ্রেসে চড়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে যাতায়াত করেন। কিন্তু ট্রেনের এই কালান্তক বিলম্বের কারণে তারা নদীর সংযোগকারী লঞ্চগুলো মিস করছেন। ফলে মাঝপথের ঘাটে এসে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ও সময়ের চরম অপচয় করতে হচ্ছে। অথচ, চাঁদপুর কণ্ঠের দ্বিতীয় প্রতিবেদনের গভীর অনুসন্ধান বলছে, এক অদৃশ্য ইশারায় এই লাইনের লাভজনক লোকাল ট্রেনগুলো একের পর এক বন্ধ করা হয়েছে, চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা আলোর মুখ দেখেনি চার দশকেও, আর নতুন কোনো কোচ বা ট্রেন দেওয়ার সদিচ্ছা তো সুদূরপরাহত।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রিক সড়কপথের যাতায়াত বাড়লেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে চাঁদপুর রুটটির কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। যেখানে দেশের সামগ্রিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে চাঁদপুর থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত আধুনিক রেল সংযোগের জোরালো দাবি সময়ের অপরিহার্য দাবি, সেখানে বিদ্যমান একমাত্র রাষ্ট্রীয় ট্রেনটিকেও লাইফ সাপোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীন অবশ্য চাঁদপুর কণ্ঠের কাছে ইঞ্জিন সংকটের চিরাচরিত অজুহাত দিয়ে ‘ভালো কোচ দেওয়ার’ আশ্বাস বাণী শুনিয়েছেন এবং ‘ধৈর্য ধরতে’ বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চার দশকের এই পুঞ্জীভূত অবহেলার পর জনমানুষের ধৈর্যের বাঁধ কি আর অক্ষত আছে?

চাঁদপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যসহ সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের প্রতি সচেতন মহলের আকুল আবেদন—চাঁদপুরবাসী আজ কোনো আকাশকুসুম বিলাসের দাবি জানাচ্ছে না। এই অঞ্চলের বঞ্চিত মানুষের

করজোড়ে একটাই শাণিত ও শেষ আকুতি:

“নতুন কিছু যদি নাই দিতে পারেন, তবে যেটুকু আছে, সেটুকু যেন অন্তত ঠিকভাবে চলে!”

মেঘনা এক্সপ্রেসের এই ভাঙা চাকা জোড়াতালি দিয়ে আর কতকাল টেনে হিঁচড়ে চালানো হবে? রেল কর্তৃপক্ষ কি এই রুটের হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে একে একটি নিরাপদ, সময়ানুবর্তী ও নির্ভরযোগ্য গণসেবায় রূপান্তর করবে, নাকি কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত উদাসীনতায় ধুঁকে ধুঁকে একদিন একে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে রেলের মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া হবে? চাঁদপুরবাসী এখন আর কোনো চর্বিতচর্বণ আশ্বাসের গল্প শুনতে চায় না, তারা অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান ও স্থায়ী প্রতিকার চায়।

লেখক: সিনিয়র সাব-এডিটর, বিশেষ সংবাদদাতা ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়